অপেক্ষায় আছে ৮৫ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়
অপেক্ষায় আছে ৮৫ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়
২০১৬-০১-২৬ ১৪:৩০:২০
প্রিন্টঅ-অ+


আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত দুই বিচারপতির কাছে লেখার অপেক্ষায় আছে ৮৫ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়। একইভাবে হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতির হাতেও অপেক্ষমাণ আছে বেশ কিছু মামলার রায় লেখার কাজ। এসব মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে অনেক আগে। বিচারপতি সংক্ষিপ্ত আদেশও দিয়েছেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা হয়নি। এর আগেই তারা অবসরে চলে গেছেন।

জানা গেছে, সর্বোচ্চ আদালতের দুই বিভাগের মধ্যে ৫ বছর আগে রায় হয়েছে কিন্তু রায়ের কপি প্রকাশ হয়নি এমন মামলাও আছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের কাছে ৯টি মামলা রায় লেখা বাকি আছে। তিনি অবসরে গেছেন ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের হাতে আছে ৭৬ মামলার রায় লেখার কাজ। তিনি অবসরে গেছেন গত বছরের পহেলা অক্টোবর। এখন পর্যন্ত তাদের রায় লেখা শেষ না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাননি বিচারপ্রার্থীরা। এতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষেও তারা ওই রায়ের ফল ভোগ করতে পারছে না। এছাড়া সুপ্রিমকোর্টের অনেক মামলার রায়ের কপি পেতে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের।

এ পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ১৭ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বাণীতে অবসরের পরে রায় লেখাকে সংবিধানপরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন সময় ধরে রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী।’ অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি এর ব্যাখ্যায় বিচারপতি সিনহা তার বাণীতে বলেন, ‘কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না।

প্রধান বিচারপতির এ ধরনের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার ঝড় বইছে নানা মহলে। অনেক আইনজীবী তার বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি পক্ষ তার বক্তব্যকে লুফে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি তুলেছেন। কারণ এ ব্যবস্থা বাতিল করে ঘোষিত রায়টি অবসরে যাওয়ার দীর্ঘ ১৬ মাস পরে লেখেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। আবার কেউ কেউ প্রধান বিচারপতির বিপক্ষে মতামত দিয়ে বলেছেন, অবসরে যাওয়ার পরে রায় লেখা সংবিধানপরিপন্থী হবে না। এছাড়া কেউ কেউ মনে করেন, অনেক বিচারপতির কাছে দীর্ঘদিন ধরে রায় অপেক্ষমাণ থাকে। দু-তিন বছরেও রায় না পেয়ে বিচারপ্রার্থীরা দুর্ভোগের শিকার হন। আর এ কারণে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে হয়তো প্রধান বিচারপতি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, আগে যেসব বিচারপতি অবসরে গিয়ে রায় লিখেছেন ওই মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কি হবে।

সম্প্রতি অবসরে গেছেন কিন্তু এখনও তাদের রায় লেখা বাকি আছে এ ধরনের মামলার কি পরিণতি হবে। এ ব্যাপারে সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখা অসাংবিধানিক হবে বলে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই। সংবিধানের কোথাও এটা বলা হয়নি। যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে এবং এর কোনো বিকল্পও নেই। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন এটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। এটা কোনো রায় নয়। ওই বক্তব্য মানা কারও জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

সাবেক এই বিচারপতি জাতীয় সংসদেও ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘একজন বিচারপতি যেদিন অবসরে যাবেন, সেদিনও চার-পাঁচটি রায় দিলে সেগুলো কখন লিখবেন?’ তবে এটা করতে হলে অবসরে যাওয়ার কয়েক মাস আগেই একজন বিচারপতিকে কোর্টে বসা বন্ধ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের রায় লেখা প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, এখন আর তাদের ওইসব রায় লেখা ঠিক হবে না। তারা লিখলে তা অবৈধ হয়ে যাবে। তাহলে সমাধানটা কী হবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, একটি মামলা হয়তো চারজন বিচারপতি শুনেছেন। তাদের মধ্যে একজন অবসরে গেছেন। বাকি তিনজন দায়িত্ব পালন (ইন সার্ভিসে আছেন) করছেন। যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কাউকে দিয়ে ওই রায় লেখাতে হবে। এটা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। খন্দকার মাহবুব বলেন, দায়িত্বে থাকার সময় বিচারপতিরা রায় লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় উচ্চ আদালতের অবকাশ চলে। তারা ইচ্ছা করলেই অবসরে যাওয়ার আগেই রায় লেখার কাজ শেষ করতে পারেন।

জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে) অধস্তন আদালতের বিচারকদের অবস্থান কোথায় হবে- সে বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি। সংক্ষিপ্ত আদেশে ওই দিন আপিল বিভাগ বলেন, ‘আপিল ডিসপোজসড অব উইথ মোডিফিকেশন, অবজারভেশন অ্যান্ড ফাইন্ডিংস।’ এ সংক্ষিপ্ত রায়টি ঘোষণার পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রায় (বিস্তারিত বিবরণ) লেখা শেষ হয়নি। আর এ কারণে দীর্ঘ ১০ বছর আগে উচ্চ আদালতে আসা বিচারকরা তাদের রায়ের ফল ভোগ করতে পারছেন না। বিচারকরা বিচারপ্রার্থী হয়েও পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

বর্তমানে এ পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। তিনি গতবছরের ১৪ জানুয়ারি অবসরে গেছেন। কিন্তু তার ওই রায় লেখা আজও শেষ হয়নি। শুধু এ রায়টিই নয়, অবসরে যাওয়ার এক বছর পরও ওই বিচারপতির হাতে আরও ৮টি জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় লেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে রায় হয়েছে এমন রায় লেখার কাজ এখনও বাকি আছে।

এছাড়া গত বছরের ১ অক্টোবর অবসরে গেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি এখনও ৭৬টি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় লেখার কাজ শেষ করেননি। এসব রায়ের জন্য বিচারপ্রার্থীরা অধীর আগ্রহে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একইভাবে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির হাতে একাধিক রায় লেখার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদের মতে, পূর্ণাঙ্গ রায় না হলে সেটি কোনো রায় হতে পারে না। আর এ পূর্ণাঙ্গ রায় একজন বিচারপতির দায়িত্বে থাকাকালেই কেবল দিতে পারেন। কারণ, পূর্ণাঙ্গ রায় লেখার সময় কোনো পরিবর্তনেরও প্রয়োজন হলে, তা আদালতে বসে ওই বিচারপতি পরিবর্তন করতে পারবেন। কিন্তু অবসরে গেলে সেই সুযোগ আর থাকে না। তিনি আরও বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের হাতে যেসব রায় লেখা অপেক্ষমাণ রয়েছে, সেগুলো আর তাদের দিয়ে লেখানো ঠিক হবে না। কারণ, উনারা তো কোর্টে বসতে পারছেন না। উনারা তো আর বিচারক নন।’

এ অবস্থায় কি করণীয় সে ব্যাপারে মহসিন রশিদ বলেন, একটি রায় যদি চারজন বিচারপতি দিয়ে থাকেন, আর সংক্ষিপ্ত আদেশে চারজন বিচারপতিই যদি স্বাক্ষর করে থাকেন, সেক্ষেত্রে যারা চাকরিতে আছেন, তাদের দিয়ে ওই রায়গুলো লেখানো যেতে পারে। আর ভবিষ্যতের জন্য তিনি প্রধান বিচারপতিকে এ ব্যাপারে রুলস তৈরির পরামর্শ দেন।

বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের কাছে যেসব মামলার রায় অপেক্ষমাণ : ক্রিমিনাল পিটিশন নং-৩৮৪/২০১০। এ পিটিশনটি ২০১০ সালের ২৬ অক্টোবর খারিজ হয়েছে। কিন্তু আজও রায় প্রকাশিত হয়নি। এ ছাড়াও সিভিল রিভিউ পিটিশন নং-১৭-১৮/২০১১, সিভিল পিটিশন ১৪০৮/২০০৯, সিভিল পিটিশন ১০৪৬/১১ ও ৮২১/১১, সিভিল পিটিশন নং-৭৩৪-৩৫/২০১৩, ক্রিমিনাল আপিল ৩৫/২০১০, কনটেম্পট পিটিশন ২৮/২০১৪ এবং সিভিল আপিল নং-৪১/২০১১।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের কাছে যেসব মামলার রায় অপেক্ষমাণ : সিভিল পিটিশন নং-৯৯৫/২০০৯, ১২৫৩/২০১০, ১৫৪৮/২০১১, ১২৭৫/২০০৯,১২৭৬/২০০৯, ১২৭৭/২০০৯, ১৭২৯/২০১৩,১৬৫৮/২০১৩,, ১৯/২০১৩, ১৫০০/২০০৯,১৫১১/২০০৯,১৫৫৬/২০১২, ১০২/২০১৩, ৫৪৫/২০১৩, ০১/২০১৪, ৮৫১/২০১২, ৩০৭৮/২০১৩, ১১৩২/২০১২, ১৪৬৪/২০১১, ৯৭০/২০১, ২৫৫২/২০১২, ১৭০৯/২০১১৫৮-৬০/২০০২, ২৫০৫/২০১০, ২২৬/২০১৪, ১৭০৮/২০০৯, ১৭৬৬/২০১২, ২৪১৪/২০১২, ১৭৪৯/২০১০,২৪৮৮/২০০৯, ৩৯৪/২০১০, ৭৭-৭৮/২০১০,২২৪৪/২০১২, ৬৭০/২০১৪, ৩০৫/২০১১,২১৩/২০১০,, ২২৭/২০১০, ৩১৪৯/২০১২, ১৩৯৭/২০০৯, ৯৪৬/২০১৪, ২৫০০-২৫০১/২০০৯,, ১৪১৮/২০১৪,১৪০৯/২০১০, ৩৯১/২০১৪, ৪৩৮-৪৩৯/২০১৩, ২০৭১ ও ২০১০-২৯/২০১৩,, ২২৯৬/২০০৯, ২১৫৭/২০১৪, ১১৮/২০১৪ ্র ৩০৯/২০১১। এছাড়া ক্রিমিনাল পিটিশন নং-৭৩৮/২০১২, ২৮৮/২০১১, ৪০/২০১১, ৮৯/২০১০, ৫৭/২০১০, ৩০০/২০১২, ৪৯/২০১২, ১৫৪/২০১১, ৬৭/২০১১, ২৫০/২০১০, ৪৮৮/২০১৩, ১৯৩-৯৪/২০১১, ৯৬-৯৭/২০১০, ১৯৯-২০৪/২০১১, ২১৪/২০১১, ২৯৩/২০১১, ৩১২/২০১১, ৬৮/২০১২। এছাড়া ক্রিমিনাল রিভিউ পিটিশন নং-১৫১১/২০০৯, ১৭৪-১৭৫/২০১০ ও ১২০-১২১/২০১০ জেল পিটিশন নং-০৬/২০১১, ক্রিমিনাল আপিল নং-০২/২০০৫, সিভিল আপিল নং-১৪৫/২০০৬, ৩২৭-৩৫২/২০০২।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

আইন ও অধিকার এর অারো খবর