প্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নির্ভর করছে কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর
প্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নির্ভর করছে কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর
সংগীতা ঘোষ
২০১৫-১২-২৯ ০৬:০৮:৪৭
প্রিন্টঅ-অ+


প্রশাসনে অন্য রকম মেরুকরণ শুরু হয়েছে। নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে এখন আর দলীয়করণ নয়। এখন অনেক সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর। তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দেই নির্ধারণ হচ্ছে কর্মকর্তাদের ভাগ্য। কর্মকর্তার গোপন বইয়ে যাই থাকুক না কেন, ওইসব কর্মকর্তার মন জয় করতে পারলেই পাচ্ছেন ভালো পদায়ন ও পদোন্নতি। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিমালা, নীতিমালাও যেন তুচ্ছ। ভারপ্রাপ্ত সচিবের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে পূর্ণ সচিবকে। প্রশাসনের অনেক স্তরেই জুনিয়রদের অধীনে সিনিয়র কর্মকর্তার কাজ করতে হচ্ছে। এসব তথ্য জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের প্রভাবশালী কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে যেসব চতুর কর্মকর্তা গোপন সখ্য গড়ে তুলছেন, তারা সরকারের মতাদর্শের অনুযায়ী না হলেও পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পাচ্ছেন। কাজ করছেন একই মন্ত্রণালয়ে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তাদের অতীত জীবন ও এসিআর মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক মেধাবী ও সরকার সমর্থক কর্মকর্তা।

তবে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় কাউকে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে না। সরকারি কাজকর্ম পরিচালনায় যাদের যোগ্য মনে হচ্ছে, তাদেরই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো অস্বচ্ছতা নেই।

প্রশাসন পরিচালনায় এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় একটি আইন অনুমোদন হলেও তা কবে আলোর মুখ দেখবে তা কেউ বলতে পারেন না। কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হলেও তা প্রায় বছরখানেক ঝুলে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনপ্রশাসন গতিশীল করতে ওই মন্ত্রণালয়ে একজন সিনিয়র মন্ত্রী নিয়োগ দিলেও তা কোনো কাজে আসেনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ার পর ফাইল নিষ্পত্তিতে বেশি সময় লাগছে। কাজের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর অনুপস্থিতি।

সম্প্রতি প্রশাসনে অন্য ক্যাডার থেকে (প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে) একসঙ্গে চার কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দিয়ে নতুন নজির স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে অতীতের সচিব নিয়োগের নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে। বর্তমান সচিবের ডিউটি পদ ৭০টি। এর মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কোটায় ১০ শতাংশ হিসেবে অন্য ক্যাডার থেকে সর্বোচ্চ সাতজন সচিব নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি নিয়োগের ফলে অন্য ক্যাডারের সচিবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিবকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সংস্থার দায়িত্বে রয়েছেন একজন পূর্ণ মর্যাদার সচিব। ওই নিয়োগের ফলে অতিরিক্ত সচিবের অধীনে কাজ করতে হবে একজন সচিবকে।

কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন ঘটনা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একজন অতিরিক্ত সচিব সিন্ডিকেটের সুনজরে না থাকায় তাকে এক মাসে ছয়বার বদলি করা হয়েছে। অথচ তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার ব্যাচে তিনি মেধাক্রমের তালিকায় প্রথম দিকে রয়েছেন। আবার এমন হয়েছে, সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ পাওয়ায় একজন সচিবকে মাত্র ছয় মাসের মাথায় দুটো ভালো মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ এ সচিব এর আগে তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কোনো জায়গায়ই তিনি সফলতা দেখাতে পারেননি। উল্টো মন্ত্রীদের সঙ্গে বিবাদের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ-পদোন্নতিতে বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। দুষ্ট লোকেরা বলছেন, কোটি টাকার বিনিময়ে গত দুই বছরে প্রায় ১০-১৫ জন কর্মকর্তাকে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু সচিব পদে নয়, ডিসি পদে নিয়োগেও লাগছে সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ। ডিসি ফিটলিস্টের নামমাত্র পরীক্ষা নেওয়া হলেও ওই কর্মকর্তারা যাদের তালিকা দিচ্ছেন তাদেরই ডিসি করা হচ্ছে। এর ফলে এমন কর্মকর্তা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যারা ছাত্রজীবনে সরাসরি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সম্প্রতি তিন স্তরে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পদোন্নতি বিধিমালা না মেনে বাদ পড়া কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। অনেকে ভেবে অবাক, কয়েক মাস আগে যেসব কারণে কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, তারা কোন গুণে এবার পদোন্নতি পেলেন। তাহলে কি বিগত সময়ে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বাদ দেওয়া এসএসবির ওই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল? আর এখন সে ভুল শোধরানো হচ্ছে?

সূত্র জানায়, বিগত দুই বছরে বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় এক হাজার কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের পদায়নও করা হয়েছে। এসব কাজের নিয়ন্ত্রণ করেছে ওই সিন্ডিকেট। পদোন্নতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) সুপারিশ না করলেও চূড়ান্ত তালিকায় এমন লোক স্থান পেয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সে ব্যাপারে অন্ধকারে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিবিধ এর অারো খবর