কোটালীপাড়া:ফরিদপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজধানী
কোটালীপাড়া:ফরিদপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজধানী
স্টাফ রিপোর্টার
২০১৭-১২-১৫ ২০:৩৭:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+


জনপদের নাম কোটালীপাড়া। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, চার জন রাজা এখানে রাজত্ব করেছেন। ‘কোট’ শব্দের অর্থ দূর্গ। এই দূর্গের পাশেই বসত করতো কোটোয়াল বা নগর রক্ষকরা। সেই কোটোয়াল থেকেই কোটালীপাড়া। খাল-বিল অধ্যূষিত এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখন পর্যন্ত গোপালগঞ্জ জেলার অন্যান্য এলাকার থেকে আলাদা। এখানে যেটা ঘাঘর নদী এটা মধুমতীর শাখা নদী। এই নদী আড়িয়ালখাঁ’র সঙ্গে গিয়ে মিসেছে মাদারীপুরের টেকের হাটে।

ঘাঘর নদীর একটি ইতিহাস আছে। হিন্দু মিথলজিতে দক্ষ যজ্ঞে দূর্গাকে যখন কোলে নিয়ে মহাদেব প্রলয় নাচন শুরু করে, বিশ্ব তখন যায় যায়। দেবতারা এই সংকট কাটাতে বিষ্ণুর সুদর্শন অস্ত্র দিয়ে দূর্গাকে কেটে কেটে চার দিকে তাঁর দেহের অংশ ছুড়ে ফেলতে থাকে। দেহের এই এক-একটি অংশ যেখানে গিয়ে পড়েছে সেখানেই একটি তীর্থ ক্ষেত্র হয়েছে। সেই অনুযায়ী বলা হয়, ঘাঘর নদীতে দূর্গার পায়ের ঘাগড়া পড়েছিল। সেই ঘাগড়া থেকেই এ নদীর নাম ঘাঘর নদী।

কোটালীপাড়ার প্রথম জনবসতি শুরু হয় ঘুঘরাহাটি গ্রামে। ঘাঘর বন্দর তখন একটি সমুদ্র বন্দর। এই ইতিহাসে আজ না যাই। এখন যেখানে টিএনও সাহেবের বাসভবন ওখানে বাস করতেন বাংলা রাগ সংগীতের প্রবাদ পুরুষ তারাপদ চক্রবর্তী। তার শিল্পী চরিত্রের একটি বিশেষ ঘটনা আছে। তিনি যখন অর্থাভাবে ছিলেন, রাষ্ট্রের কাছে তিনি সাহায্য চেয়ে ছিলেন। রাষ্ট্র সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে নি। এক সময় তার গুণে মহিমান্বিত ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধি দিতে চাইলে তিনি নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর কাছেই নিবাস ছিল হরিদাস সিদ্ধান্ত মহামহোপাধ্যায়ের বাড়ি। যিনি মহাভারতের অসমাপ্ত টিকা গুলো সমাপ্ত করেছিলেন। আছে উনশিয়া গ্রাম। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাস্তুভিটা। এখন সেখানে তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিবসে সুকান্ত মেলা হয়। এর অদূরেই আছে ভট্টের বাগান। এই ভট্টের বাগানের সাথে আর্য ভট্টের ইতিহাস যুক্ত। যিনি গণিত শাস্ত্রে ‌শূন্য(০) আবিস্কার করে সারা বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিয়ে ছিলেন। দক্ষিণ ভারত থেকে তাঁর মা এখানে পূজা দিতে এসে ছিলেন। সেই থেকে এটি ভট্টের বাগান নামে পরিচিত। এমন অনেক ঘটনাই আছে। যা পরে বলা যাবে।

এখানে চৈত্র সংক্রান্তিতে এখনো পূণ্য-স্নান হয়। হাজার হাজার মানুষ আসে স্নান করতে। এই নদী নৌকা-বাইচের জন্যও বিখ্যাত ছিল।

বিল অধ্যূষিত এ অঞ্চল বন্যায় ভেসে যেত। নারীরাও জানতো নৌকা চালাতে। বিলে শাপলা ফুটতো, ধান হতো বহু প্রজাতির। মানুষের ভেতরে আনন্দ ছিল। এখানে যাত্রা গানের একটি দল গড়ে উঠেছিল। তারো আগে কীর্তণ গানের একটি দল ছিল। কীর্তণ দলের কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী ছিলেন খগেশ গৌতম। তাঁর মতো কণ্ঠ শোনা যায় নি আর। কথিত আছে কলকাতার আকাশ বাণী-তে একবার তাঁকে গান গাইতে ডাকা হয়েছিল। তখন রেকর্ডারও এতো উন্নত ছিল না। তাঁর কণ্ঠের স্পিড এতো বেশি ছিল যে, রেকর্ডিংয়ের সময় খোদ রেকর্ডারই ফেটে গিয়েছিল। এই কীর্তণ গানের দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গাইতেন। কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। খগেশ গৌতমের সাথে যাঁরা গান গাইতেন তাঁরা ছিলেন প্রয়াত কানাই লাল গৌতম, ননী সাহা, মাখন কর্মকার, কার্তিক কর্মকার, ননী কর্মকার, নগেন কর্মকার, খগেন গাইন, বসন্ত সাহা, লক্ষ্মীদাস ভট্টাচার্য, নাম না আরো অনেকেই। এদের অনেকেই ভারতে চলে গেলে যে সাংস্কৃতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা পূরনে তখন সক্রীয় হয় স্থানীয় তরুণরা। গঠিত হয় সাঁঝের আসর শিল্পী গোষ্ঠী। এদের অনুষ্ঠানের মান আজ চিন্তা করাই কঠিন। সাঁঝের আসর শিল্পী গোষ্ঠীর সবাই ছিলেন সৌখিন শিল্পী। ফলে গাঁটের টাকা দিয়ে এরা যাত্রা করতেন। ঐ কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কানাই লাল গৌতম, সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিসুর রহমান, জয়নাল আবেদিন, আবুল হোসেন, গফুর পাইক, অমল সাহা, রোকনুদ্দিন শেখ, ননী দাস, দেবেন পান্ডে, ঠাকুর কর্মকার, গৌরাঙ্গ কর্মকার, কার্তিক কর্মকার, যতীন শীল, প্রদীপ চ্যাটার্জি মিন্টু। পরবর্তীতে এ ধারা ধরে রাখে গৌরাঙ্গ লাল চৌধুরী, মুজিবুল হক, গোবিন্দ গৌতম, টুকু ভাই, আবুল হোসেন, কবীর হোসেন, সাখাওয়াত হোসেন, দুলাল মিয়া, হালিম মোল্লা, অশোক কর্মকার, শীতল বালা প্রমুখ। (সবার নাম মনে আসছে না। এরপরে পূর্ণাঙ্গ নামসহ তালিকা প্রকাশ করা হবে। ইদ্রিসুর রহমান ছিলেন জাত শিল্পী। যাত্রা তিনি করেছেন জীবন দিয়ে। এলাকার সবার বড় ভাই- এত মেধাবী শিল্পী ছিলেন যে, খগেশ গৌতমের মতো নটরাজ তাকে শৈশব থেকেই সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন । কিছু দিন আগেও নাম করে পঞ্চাষোর্ধ শামসু মিয়ার হা-ডু-ডু খেলার দল। বাইচের জন্য এ এলাকা বিখ্যাত ছিল। কালীগঞ্জ, বাঘিয়া, ঘাঘর নদীর বাইচে আসতো জয়নগর, চিলে কাঠা, ঝুপড়ি নাও, ট্যাবা নৌকা, লক্ষ লক্ষ মানুষ দুই পাড়ে ভিড় করে দেখতো বাইচ। এখানের বাইচে সাধারণত উত্তরাঞ্চলের নমশূদ্র শ্রেণীর ধানীপানি আমুদে গৃহস্থরা বাইচের নৌকা নিয়ে আসতো। সদর কোটালীপাড়ায় কারো বাইচের নৌকা ছিল এমন জানা যায় না। তবে আশির দশকে উত্তরপাড়ার আইউব আলী সিকদার ও সদরের অমর রত্নের বাইচের নৌকা ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। মেলা দেখতো, শীতের মৌসুমে দেখতো যাত্রা, কীর্তণ, সিন্ধান্ত বাড়ির মেলা, পাড়কোনার মেলা, জাঠিয়ার মেলা ইত্যাদি। এখনো এ অঞ্চল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অন্য কোনো এলাকার চেয়ে পিছিয়ে নেই। কবি গান, রামায়ন, কীর্তন থেকে শুরু করে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠন ছাড়াও অঞ্চল ভেদে রয়েছে বৈঠকী, পালা গানের দল। যারা নিয়মিত গান চর্চা করে। এ অঞ্চলে কার্তিক সাধুর গান ব্যাপক প্রসিদ্ধ। সিদ্ধান্ত বাড়ির মেলা এখনো ঐতিহ্যবাহী। লক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটে এখানে। চড়ক মেলা, অষ্টক গান, খেজুর ভাঙা, বান ফোঁড়া, বরশি ফোঁড়ার প্রচলন এখনো এ অঞ্চলে রয়েছে। এসব মেলা জাতি ধর্মের উর্ধ্বে অবস্থান করে। সিদ্ধান্ত বাড়ির সঙ্গে একটি ইতিহাস জড়িত। জানা যায়, ১৭৫৭ সনে সিরাজ-উদ্দৌল্লার পতনের পর জগৎ শেঠের বিক্রমপুরের গোলাঘরের নিযুক্ত সরকার পালিয়ে কোটালীপাড়ায় চলে যায়। এবং সিদ্ধান্ত বাড়িতে আশ্রয় নেন জগৎ শেঠের শিবলিঙ্গ সহ। মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে তিনি এই মেলা এবং ঘাঘর নদীতে স্নানের আয়োজন করেছিলেন। সেই মেলা এখনো হয়। এক সময় এলাকায় অবস্থিত শিব মন্দিরটি ছিল জনশূন্য। পূজার সময় শুধু এখানে পূজা করতেন শ্যামল ব্রহ্মচারী। ইতিমধ্যে মন্দিরের অনেক জায়গা দখল হয়ে যায়। পরে সন্তোষ কুমার দাস(সন্তোষ চৌকিদার) এই মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। এবং অল্প দিনে এটি হয়ে ওঠে তীর্থ ক্ষেত্রের মতো। মেলার পরিসরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এর জায়গা দখলের চক্রান্ত আজো থামে নি। সন্তোষ সাধু নেই। তাঁর স্ত্রী, ছেলে এলাকাবাসীর সহায়তায় মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন জায়গা টিকিয়ে রেখেছে। তবু মনোজ মিত্রের বাঞ্ছারামের বাগান-এর মতো এর থেকে জনৈক কমিশনারের দৃষ্টি কোনো মতেই সরছে না। মন্দির টিকে রক্ষা না করলে বিখ্যাত সিন্ধান্ত বাড়ির মেলা তার রূপ জৌলুস হারাবে। তাই এটিকে রক্ষায় সোচ্চার হওয়া উচিত সবার।

সব কিছু মিলিয়ে এখানকার মানুষ অন্যান্য এলাকার থেকে অনেক সহজ সরল ও সংস্কৃতি মনা। কোটালীপাড়া ফরিদপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজধানী হয়ে এখনো আছে, থাকবে। এখনো এ অঞ্চল খাল-বিল অধ্যূষিত। কৈ-শিং-মাগুড় মাছসহ জিওল মাছের আধিক্য এখনো এখানে আছে। এখনো পালা-পার্বন-উৎসব ঘটা করে পালিত হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য এখানে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। একবার ঘুরে আসতে পারেন অতিথিপরায়ণ মানুষের নান্দনিক জনপদ কোটালীপাড়া।

লেখকঃ দীপংকর গৌতম, Freelancer at The Wave

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিশেষ প্রতিবেদন এর অারো খবর