যন্ত্রে তৈরি জাজিমের বাজার বড় হচ্ছে
যন্ত্রে তৈরি জাজিমের বাজার বড় হচ্ছে
২০১৭-১১-২০ ০১:৪৩:৩৮
প্রিন্টঅ-অ+


একজন মানুষ দিনে যদি আট ঘণ্টা ঘুমায়, তাহলে তাঁর জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় কাটে বিছানায়। সেই বিছানাকে আরামদায়ক করার পেছনে ব্যয় করতেও মানুষ পিছপা হয় না। বাংলাদেশের মানুষ একসময় ধুনকরদের দিয়ে জাজিম-তোশক তৈরি করে বিছানা সাজাত। এখন জাজিম-তোশকের বাজার দখল করছে আধুনিক কারখানায় যন্ত্রে তৈরি জাজিম বা ম্যাট্রেস।

দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হচ্ছে যন্ত্রে তৈরি ম্যাট্রেসের বাজার। শুধু রাজধানী ঢাকার উচ্চ আয়ের মানুষেরা নয়, জেলা-উপজেলা শহরের বাসিন্দারাও এখন ম্যাট্রেস কিনছেন। এ বাজারে আধিপত্যের পুরোটুকুই দেশি কোম্পানির। অভিজাত আবাসিক হোটেল বাদে দেশে যত ম্যাট্রেস বিক্রি হয়, তার পুরোটাই দেশীয় উৎপাদকেরা সরবরাহ করেন।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে এখন ২০টির মতো কোম্পানি ম্যাট্রেস উৎপাদন করছে। বছরে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় দেড় শ কোটি টাকা। এ বাজার বছরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। মানুষের আয় যত বাড়বে, বাজারের আকার তত বাড়বে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ম্যাট্রেস উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আখতার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এম রিফাতুজ্জামান বলেন, একসময় ম্যাট্রেস শুধু অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা ব্যবহার করতেন। এখন দাম কমে সাধারণ মানুষের নাগালে এসেছে। তাই এটি এখন আর অভিজাত পণ্য নেই। তিনি বলেন, এখন জাজিমের পরিবর্তে ম্যাট্রেসের ব্যবহার খুব বেড়েছে। পরিবর্তনটি এসেছে গত পাঁচ বছরে। এ সময় মূলত ম্যাট্রেসের দাম কমেছে, বাজার বেড়েছে।

দেশীয় বাজারে আধিপত্য থাকলেও দেশি কোম্পানিগুলো রপ্তানি বাজারে নেই। ম্যাট্রেস রপ্তানিতে ঝক্কি অনেক বেশি। একটি কনটেইনারে খুব কম পরিমাণ ম্যাট্রেস ধরে। এতে জাহাজভাড়া অনেক বেশি পড়ে যায়। তাই কোম্পানিগুলো রপ্তানি বাজারে সুবিধা করতে পারছে না বলে জানান এ খাতের উদ্যোক্তারা। তবে আসবাবপত্রের সঙ্গে সামান্য কিছু ম্যাট্রেস বিদেশে যায় বলে জানান তাঁরা।

অবশ্য ম্যাট্রেসের বৈশ্বিক বাজার বেশ বড়। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চমজের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ম্যাট্রেসের বৈশ্বিক বাজারের আকার দাঁড়াবে ৪ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের এখনকার মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে ৯০০ কোটি ডলার বেশি। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ডলার।

বাংলাদেশে ম্যাট্রেসের বাজার নিয়ে হালনাগাদ কোনো সমীক্ষা পাওয়া যায়নি। উদ্যোক্তারা জানান, ম্যাট্রেসের বাজারের সিংহভাগ দখলে আছে আখতার, ইউরোশিয়া ও সোয়ান ব্র্যান্ডের ম্যাট্রেস। এ ছাড়া বেশ কিছু কোম্পানি বাজারে ভালো করছে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারের কারণে ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে ম্যাট্রেস কিনতে পারছেন।

দেশে তিনটি বিদেশি কোম্পানির ম্যাট্রেসের ব্যবসা আছে। পরিবেশকের মাধ্যমে তারা এ ব্যবসা করছে। মূলত প্রতিষ্ঠানগুলো অভিজাত হোটেলে ম্যাট্রেস সরবরাহ করে। দেশি বাজারে তাদের কোনো হিস্যা নেই বলে জানায় দেশীয় কোম্পানিগুলো।

রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় বিউটি ফেব্রিকস নামের একটি ম্যাট্রেসের দোকানের বিক্রয়কর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, ম্যাট্রেসের দাম ঠিক হয় এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের ভিত্তিতে। সাত ফুট দৈর্ঘ্য ও পাঁচ ফুট প্রস্থের একটি খাটের জন্য মাঝারি পুরুত্বের একটি ম্যাট্রেস কিনতে ক্রেতাকে ছয় থেকে আট হাজার টাকা দিতে হবে। তবে একই আকারের ভালো মানের ম্যাট্রেস কিনতে ব্যয় হবে কমপক্ষে নয় হাজার টাকা। ওই বিক্রেতা আরও বলেন, ক্রেতারা সাধারণত দামের বিষয়টাই মাথায় রাখেন। এ কারণে তাঁর দোকানে কমদামি ম্যাট্রেস বেশি বিক্রি হয়।

দেশীয় কাঁচামাল

দেশি কোম্পানিগুলো এখন ছয় থেকে সাত ধরনের ম্যাট্রেস তৈরি করে। ধরনভেদে কাঁচামালের ব্যবহারও ভিন্ন। তবে বাংলাদেশে যেসব ম্যাট্রেস বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগের কাঁচামাল দেশি। অবশ্য কোম্পানিভেদেও দেশি-বিদেশি কাঁচামাল ব্যবহারের ভিন্নতা রয়েছে।

আখতার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিফাতুজ্জামান বলেন, সাধারণ ম্যাট্রেসে নারকেলের ছোবড়া রাবার দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বোর্ডের মতো তৈরি করা হয়। শক্ত ম্যাট্রেস তৈরিতে ‘ফেল্ট’ ব্যবহার করা হয়। এ ফেল্ট তৈরিতে তারা ব্যবহার করেন পোশাক কারখানার ঝুট কাপড়। এ কাপড়কে ‘ক্র্যাশ’ করে তুলা বানানো হয়। এ তুলায় রাসায়নিক ব্যবহার করে তাপ ও চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতে এটি শক্ত বোর্ড হয়ে যায়। রি-বন্ডেড নামে এ ধরনের ম্যাট্রেস তৈরি করা হয় ফোম ‘ক্র্যাশ’ করে বানানো বোর্ড দিয়ে। এ ছাড়া ফোমের ম্যাট্রেস ও স্প্রিং ম্যাট্রেসও দেশে তৈরি হয়। স্প্রিং ম্যাট্রেস তৈরিতে লোহা আমদানি করে স্প্রিং দেশেই তৈরি হয়। ম্যাট্রেসের কাপড় দেশি-বিদেশি দুই ধরনের হয়।

বাজারে একটি ম্যাট্রেসের দাম যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে এর কত অংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, এ প্রশ্নের জবাবে রিফাতুজ্জামান বলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মোট বিক্রয়মূল্যের ২০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়।

অ্যাপেক্স ফোম ইন্ডাস্ট্রির মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন একই কথা বলেন। তিনি বলেন, নারকেলের ছোবড়া, ঝুট কাপড় ও পুরোনো ফোম ব্যবহার করেই তাদের কারখানায় ম্যাট্রেস তৈরি হয়।

অবশ্য সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান খবীর উদ্দিন খান বলেন, তাঁদের কাঁচামালের ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয়। ফলে একটি ম্যাট্রেসের মোট দামের ৩০-৩৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন বাংলাদেশে হয়।

লাভ কত

উৎপাদকেরা বলছেন, মাঝারি ও দামি ম্যাট্রেসের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশের মতো লাভ করা যায়। তবে কম দামি ম্যাট্রেসে লাভের পরিমাণ গড়ে ৫০০ টাকার বেশি নয়। অনেক সময় প্রতিযোগিতার কারণে উৎপাদন খরচেই তা বিক্রি হয়।

সোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান খবীর উদ্দিন খান বলেন, ম্যাট্রেসের চাহিদার চেয়ে উৎপাদনক্ষমতা বেশি। জেলা-উপজেলায় এর বাজার বাড়তে আরেকটু সময় লাগবে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফিচার এর অারো খবর