কোন পথে যাচ্ছে সৌদি আরব?
কোন পথে যাচ্ছে সৌদি আরব?
২০১৭-১১-০৮ ০১:৪৩:৩২
প্রিন্টঅ-অ+


কী হচ্ছে সৌদি অারবে? দেশটির রাজপরিবারের অন্দরমহল ঠিকঠাক আছে তো? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের নতুন একটি ক্ষণ স্বমহিমায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে?

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এ রাষ্ট্রে গত কয়েক দিনে ঘটে গেছে কয়েকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিটি গঠন করে কয়েক ঘণ্টার মাথায় ১১ প্রিন্স ও ৪ মন্ত্রীসহ কয়েক ডজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রখ্যাত ব্যবসায়ীকে আচমকা গ্রেপ্তার, পরদিন ইয়েমেন সীমান্তের কাছে অনুসন্ধান কাজ শেষে ফেরার পথে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় দলবলসহ প্রিন্স মনসুর বিন মুকরিনেররহস্যজনক মৃত্যু এবং তার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গ্রেপ্তার অভিযানে আরেক প্রিন্সের মৃত্যুর খবরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে সৌদি আরবে আর কী কী নতুন দেখতে হতে পারে এ নিয়ে চিন্তিত বিশ্লেষকরা। তবে অনেকেরই ধারনা, এখন পর্যন্ত যা যা ঘটেছে সেখান থেকে ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক না কেন, এ সবকিছুই ক্ষমতাসীন একটি পরিবারের মাঝে ক্ষমতার বৃত্তকে আরও ছোট করে আনার ইঙ্গিত বহন করছে।

পরিস্থিতির পরিবর্তন
যুগের পর যুগ ধরে সৌদি আরবের শাসনে ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অসামান্য ক্ষমতা। উচ্চ পর্যায়ের ধর্মীয় নেতারা জনগণের আচরণ ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নিয়ম নির্ধারণ করতেন। সম্পদশালী ক্ষমতাধর শেখরা বলে দিতেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। শুধু তাই নয়, দেশটির ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি সাম্রাজ্যের তেল-সম্পদের সদ্ব্যবহার করত বিশ্বজুড়ে ইসলামের কট্টরপন্থি ব্যাখ্যা ছড়াতে।

কিন্তু বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ ঘোষিত হওয়ার পর থেকে পুরো আরব সাম্রাজ্য জুড়ে নিজের ক্ষমতা আরোপে মাঠে নেমেছেন। এমনকি সৌদি আরবে ‘মধ্যপন্থি’ ইসলামের বিস্তৃতি ঘটাতেও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি রদবদল করছেন এবং চাপ দিচ্ছেন। এর ফলে কমে আসছে সেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা।

দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তারের ঘটনার আগেই কিন্তু মোহাম্মদ আইন করে সৌদির ধর্মীয় পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন। তারপর রোববার অন্য অনেকের সঙ্গে আটক করা হয় কট্টরপন্থি বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতাকেও।

এমনকি চরম রক্ষণশীল ইসলামি রাষ্ট্র সৌদি আরবকে সব দেশের সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ। বলেছেন, ‘আমরা তো শুধু সেই মধ্যপন্থি ইসলাম ব্যবস্থায় ফিরে যাচ্ছি যা আগে ছিলাম, যা ছিল পুরো বিশ্বের সব ধর্মের জন্য উন্মুক্ত। আমরা আমাদের জীবনের ৩০ বছর কোনো ধরণের উগ্রবাদী চিন্তাধারা সামলানোর পেছনে অপচয় করব না। আমরা চরমপন্থা নির্মূল করব।’

মোহাম্মদ বিন সালমান মাত্র ৩২ বছর বয়সে একই সঙ্গে সৌদি আরবের উপ-প্রধানমন্ত্রী (বাদশাহ সালমান নিজে প্রধানমন্ত্রী) এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইতোমধ্যে ‘এমবিএস’ সংক্ষিপ্ত নামে পরিচিতি পাওয়া এই তরুণ যুবরাজ সৌদি বিশাল তরুণ সমাজের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয়। কট্টরপন্থি থেকে তুলনামূলক উদারপন্থি সমাজব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতের কারণে অনেকের সমালোচনার মুখে পড়লেও সৌদির সবচেয়ে বড় যে জনগোষ্ঠী, সেই তরুণদের কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছেন তিনি।

রক্ষণশীলতা শিথিল করার পদক্ষেপ হিসেবে নারীদের ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে, গাড়ি চালানোর অনুমতিও দেয়া হচ্ছে। মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগও এখন থেকে পেতে যাচ্ছেন নারীরা। এ বছরই প্রথমবারের মতো রাজধানী রিয়াদের একটি বড় রেস্টুরেন্টে প্রধান শেফ হিসেবে নিয়োগ পান এক নারী। আর এসব লক্ষণীয় পরিবর্তন আসতে শুরু করে মোহাম্মদকে যুবরাজ নির্বাচনের পর থেকেই।

উত্তরাধিকার ও অসন্তুষ্টি…অতঃপর বলপ্রয়োগ
চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে সৌদির সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে দৃঢ় ভূমিকা রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা অভিজ্ঞ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নাইফকে সরিয়ে উপ-যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি আরবের যুবরাজ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পুরনো যুবরাজ ছিলেন বাদশাহ সালমানের ভাতিজা।

‘যুবরাজ’ পদটি দেশটির রাজতন্ত্রের সর্বোচ্চ শাসক ‘বাদশাহ’র উত্তরসূরী হওয়ায় অভিজ্ঞতার আগে বাদশাহর সঙ্গে সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

ছেলেকে যুবরাজ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার নির্বাচনের পথটি পরিষ্কার করে দেন বাদশাহ সালমান। ডজনের বেশি উত্তরাধিকারীকে পেছনে ফেলে তাকে ‘ক্রাউন প্রিন্স’ এর মর্যাদা দেয়া হয়।

সৌদি সাম্রাজ্যের উত্তরসূরী নির্বাচক কমিটির ৪৩ সদস্যের মধ্যে ৩১ জনের ভোটে যুবরাজ হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি শাসনব্যবস্থার এতদিনের ধারা অনুসারে, রাজপরিবারের যে সদস্য যে পদ দখল করে আছেন, তার অবসর বা মৃত্যুর পর তার সন্তান বা ঠিক করে দেয়া ব্যক্তিই সেই পদের উত্তরসূরী হন। কিন্তু যুবরাজ হয়েই তিনি একে একে দূর সম্পর্কের আত্মীয় বা পরিচিতদের সরিয়ে অতি নিকট আত্মীয়দের বসাতে শুরু করেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাদশাহর হয়ে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের কাজও করছেন তিনি।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তাকে যুবরাজ করায় নাখোশ ছিলেন উচ্চপদস্থদের অনেকেই। তার ওপর যুবরাজের ধীরে ধীরে সবগুলো এলাকায় ক্ষমতা ছড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় রাজপরিবার আর রাজশাসনের মধ্য থেকেই বাদশাহ সালমান ও তার ছেলে মোহাম্মদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সেই অসন্তোষ দমাতে আর নিজের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যেই দুর্নীতির নামে নিকটাত্মীয়সহ বড় বড় ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা এবং পদচ্যুত করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কেননা দুর্নীতি দমন কমিটির প্রধান যুবরাজ নিজেই এবং কমিটি গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। তার ধারাবাহিকতায় ‘আপাতদৃষ্টিতে’ বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় প্রিন্স মনসুর বিন মুকরিন এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টার সময় গুলিতে প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন ফাহাদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আরও অনেক কিছু বাকি আছে বলেও জানানো হয়েছে।

২০১৭ সাল সৌদি আরবের জন্য খুবই ঘটনাবহুল একটি বছর। বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়া, নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়ার পাশাপাশি জুনের শুরুতেই কাতারের সঙ্গে সৌদির নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্কচ্ছেদ, আবার জুনের শেষ দিকে মোহাম্মদের যুবরাজ হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যাওয়া, সেখানে আবার একদিকে যুবরাজের মধ্যপন্থার দিকে আগ্রহী পদক্ষেপ, অন্যদিকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সিংহাসন সুনিশ্চিত করা… সব মিলিয়ে সৌদি আরব ভবিষ্যতে ঠিক কী রূপ নেবে, তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে সেই পথটি যে অনেক জটিলতায় ভরা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
(তানজীমা এলহাম বৃষ্টি)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিদেশ এর অারো খবর