প্রশাসন ক্যাডারের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নীতি নির্ধারকরা
প্রশাসন ক্যাডারের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নীতি নির্ধারকরা
২০১৫-১১-০১ ১২:২৩:৪৯
প্রিন্টঅ-অ+


সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের (আমলা) দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন নীতি নির্ধারকরা। যে নথি তিন চার দিনে অনুমোদন হওয়ার কথা কর্মকর্তাদের দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাবে তা অনুমোদন পেতে অনেক ক্ষেত্রে তিন-চার মাসও লেগে যায়। এতে সেবা প্রার্থীদের ভোগান্তি যেমন হয়, তেমনি সরকারের কাজের গতিও মন্থর হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিলম্ব ঘটে। ফাইল যথা সময়ে নিষ্পত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সভা আহ্বান, নতুন প্রকল্প গ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তিরা প্রায়ই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন।

কয়েকজন অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপ-সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত প্রশাসনের দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদোন্নতি এবং পদায়নের কারণেই আমলাতন্ত্রের মেধা ও যোগ্যতায় ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রভাবশালী, দলবাজ ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তারাই ধারাবাহিক পদোন্নতি পাচ্ছেন। লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও দফতরে পদায়নও পাচ্ছেন।

কিন্তু মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাদের খুঁটির জোর কম তারাই অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন পাচ্ছেন। মেধা ও সততা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে অনেক কর্মকর্তাকে বছরের পর ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) থাকতে হয়। আবার নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা যথা সময়ে পদোন্নতিও পায় না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আমলাতন্ত্রের উপরের স্থরের পদোন্নতির প্রতিটি স্থরেই দলীয় বিবেচনা পিরামিড আকৃতিতে বাড়তে থাকে।

সম্প্রতি শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের কাছে টেলিফোনে একটি বিষয়ের সামারি অনুমোদনে কেন বিলম্ব হচ্ছে সে সম্পর্কে জানতে চান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে শিক্ষা সচিব বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এখানে অথর্ব কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তার দক্ষতা ও কাজের মান খুবই খারাপ। অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবরা সিনিয়র সহকারী সচিব হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। অনেক কর্মকর্তা কাজ বুঝেন না, শুদ্ধভাবে ফাইল ফুট আপ দিতে পারে না। এসব কারণেই বিভিন্ন কাজে লেইট হয়।

সচিবালয়ের ফাইলের মান খুবই নিচে নেমে গেছে। শুদ্ধ ফাইল খুব কমই পাওয়া যায়- এমন মন্তব্য করে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১৬ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বলেন, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের পড়ালেখা ও দক্ষতার মান অনেক নিচে নেমে গেছে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এখনই নজর দেয়া দরকার।

একই অনুষ্ঠানে যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে প্রায় একই রকম অভিমত পোষণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, কিছু কিছু জুনিয়র কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

আমলাতন্ত্রর কাজের মান নিয়ে যোগাযোগমন্ত্রীর প্রশ্ন তোলার পরদিন গত ১৭ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসনমন্ত্রীর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাভারে লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৫৯তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সনদ বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেন, সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) কর্মকর্তাদের আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার হার্ভার্ড, ক্যামব্রিজ ও অঙ্ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া ও প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। আমরা দেশের সিভিল সার্ভিসকে আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই।

একই অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায়পরায়ণ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে দেশ থেকে দুর্নীতিকে চিরতরে বিদায় জানানোর আহবান জানিয়ে বলেন, সরকারের লক্ষ্য অর্জনে এবং উন্নয়ন ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য দরকার দক্ষ ও উদ্যোগী গণকর্মচারী। আমরা সুশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলে দ্রুত ও দক্ষতার সাথে জনগণকে সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে চাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব সংবাদকে বলেন, শুধুমাত্র প্রশিক্ষণেই কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, মেধা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় না। এর জন্য বেশি প্রয়োজন পদোন্নতি ও পদায়নে সৎ, যোগ্য ও মেধাবি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া। কারণ একজন উপসচিব বা যুগ্ম সচিব চাকরি জীবনে ১০ থেকে ১৫টি দেশে প্রশিক্ষণ কিংবা ভ্রমণের সুযোগ পায়। অতি প্রভাবশালী কর্মকর্তারা এই সুযোগ আরো বেশিও পেয়ে থাকে। দলবাজ ও নীতিহীন কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে গিয়ে ভ্রমণে ব্যস্ত থাকেন। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপব্যয় ঘটলেও তাদের মেধার বিকাশ খুব একটা হয় না।

প্রশাসন ক্যাডার বিশ্লেষকরা জানায়, প্রশাসন ক্যাডারকে বলা হয় সুপার ক্যাডার। মূলত ১৯৯১ সালে জনতার মঞ্চর মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামার পর থেকেই প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের অধিকার হারিয়ে ফেলে। পর্যায়ক্রমে এই ক্যাডারে রাজনীতিকরণ বাড়তে থাকে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারই প্রশাসন ক্যাডারকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। পদ, পদোন্নতি ও ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের স্বার্থে আমলারাও নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছে সরকারের মধ্যে। এতে আমলাতন্ত্রের বিচক্ষণতা, মেধা ও দক্ষতা কমছে।

এছাড়া কর্মকর্তাদের একাডেমিক ক্যারিয়ার, কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের ওপর ভিত্তি করে পদায়ন না করার কারণেও প্রশাসন ক্যাডার মেধা সংকটে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

প্রশাসন ক্যাডার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ একজন অতিরিক্ত সচিব সংবাদকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেটও প্রায় একই অঙ্কের। অন্যদিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট হয়তো ৩০০ কোটি টাকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিংবা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বাজেটও প্রায় একই অংকের কাছাকাছি। এতে স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া যায়- যে কর্মকর্তা সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া বা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি অনুবিভাগ বা ডেস্কের দায়িত্বপালনে হিমশিম খাবে, তার পক্ষে শিক্ষা বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ডেস্কের দায়িত্বপালন খুবই কষ্টসাধ্য হবে। কিন্তু কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আমলে নেয়া হয় না বললেই চলে।

নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্প এবং কর্মরত থাকাকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব কিংবা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্বজনপ্রীতির কারণে কৃষি সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পায় মৎস্য বিষয়ে, মৎস্য বিষয়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নেয় মাধ্যমিক শিক্ষা সর্ম্পকে, কারিগরি শিক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নেয় কলেজের গণিত সর্ম্পকে, গণিতের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নেয় সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে ইত্যাদি।

প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সাভারের বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা বিপিএটিসি, রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, সাভারের অফিসার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন বিয়াম ফাউন্ডেশনসহ বিভাগীয় পর্যায়ে বেশকিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পদোন্নতি ও নতুন পদায়নের পরও কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ পায়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৯ সেপ্টেম্বরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী জনপ্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডারে কর্মকর্তা আছেন প্রায় পাচঁ হাজার ছয়শ জন। এর মধ্যে সচিব রয়েছেন ৭২ জন, অতিরিক্ত সচিব ৪২২ জন, যুগ্ম সচিব ৯১৩ জন, এক হাজার ২৯৮ জন, সিনিয়র সহকারি সচিব এক হাজার ৩৮৯ জন, সহকারি সচিব এক হাজার ৪২৯ জন। এছাড়াও সাতজন বিভাগীয় কমিশনার (যুগ্ম বা অতিরিক্ত সচিব), ৬৪ জন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ও ৩২৯ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রয়েছেন।
(রাকিব উদ্দিন)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর