ফরহাদ মজহার-এর অপহরণ ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন
ফরহাদ মজহার-এর অপহরণ ঘটনা নিয়ে নানা প্রশ্ন
২০১৭-০৭-০৫ ০২:৫৬:৪৩
প্রিন্টঅ-অ+


প্রায় ১৯ ঘণ্টা ‘নিখোঁজ’ থাকার পর যশোরের অভয়নগর থেকে উদ্ধার হওয়া কবি-প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার মঙ্গলবার ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। কীভাবে তাকে অপহরণ করা হয়, আবার ছেড়ে দেওয়া হয়- তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। তবে তার অপহরণের ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কারণ তাকে ছেড়ে দেওয়ার পরও তাত্ক্ষণিক তিনি বাসায় অথবা পুলিশকে বিষয়টি জানাননি। আবার তিনি খুলনা থেকে ভিন্ন নামে বাসের টিকিট কেটেছিলেন। এছাড়া তাকে যখন পুলিশ উদ্ধার করে তখন তার কাছে একটি ব্যাগ ও সাড়ে ১২ হাজার টাকা পাওয়া গেছে।

বেলা পৌনে ৩টার দিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহা. আহ্সান হাবীব ভিকটিম হিসেবে ফরহাদ মজহারের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর একই আদালতে শুনানি শেষে ১০ হাজার টাকার মুচলেকায় স্বাক্ষর নিয়ে তাকে নিজের জিম্মায় বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন বিচারক।

জবানবন্দিতে ফরহাদ মজহার বলেন, গত সোমবার ভোরে তিনি ওষুধ কেনার জন্য বাসা থেকে বের হন। এর পরপরই একদল দুর্বৃত্ত তাকে ধরে চোখ বেঁধে একটি গাড়িতে করে তাকে অপহরণ করে। অপহরণকারীরা তাকে দিয়ে বাসায় ফোন করিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। তবে সন্ধ্যায় অপহরণকারীরা তাকে একটি বাসের টিকিট ধরিয়ে দিয়ে একটি স্থানে নামিয়ে দেয়। পরে তিনি এক রিকশাওয়ালার কাছ থেকে জানতে পারেন যে ওই এলাকাটি খুলনা। এরপর তিনি শহরের একটি হোটেলে ৫শ’ টাকা ভাঙিয়ে রাতের খাবার খান। পরে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বাসে ওঠার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। অপহরণের ব্যপারে তিনি বলেছেন, ধারনা করছি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সরকার বিরোধী একটি চক্র আমাকে অপহরণ করেছিল।

এদিকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত সোমবার ভোরে তিনি ওষুধ কেনার জন্য বাসা থেকে বের হন। তাকে কেউ ফোন করে ডেকে নিয়ে যাননি। বাসা থেকে বের হওয়ার পরই একদল দুর্বৃত্ত তাকে ধরে চোখ বেঁধে একটি সাদা মাইক্রোতে তুলে নিয়ে যায়।’

স্ত্রীর দায়ের করা ‘অপহরণ’ মামলা প্রসঙ্গে আব্দুল বাতেন বলেন, মামলার বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি। তাছাড়া তার নিখোঁজের পর থেকে উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টি আদালতে জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। এরপর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত শুরু হবে। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সোমবার ভোরে তিনি বাসা থেকে বের হবার সময় হাতে মোবাইল ও একটি ব্যাগ নিয়ে বের হন। তার ব্যাগে মোবাইল ফোনের চার্জার ও একটি পোষাক ছিল। বাসা থেকে বের হবার সময় তার কাছে সাড়ে ১২ হাজার টাকাও ছিল। এ থেকে অনুমান করা যায় তার বাসা থেকে বের হওয়ার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এছাড়া ‘নিখোঁজ’ হবার পর ফরহাদ মজহার তার স্ত্রীকে মোবাইলে ফোনে জানান, কে বা কারা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে মেরেও ফেলা হতে পারে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬ বার ফোন করে তিনি মুক্তিপণের টাকার কথা বলেন। অথচ মুক্তির পর তিনি এ ঘটনাটি স্থানীয় থানায় বা তার পরিবারের লোকজনকে জানাননি। নিজের মত করে খুলনার একটি হোটেলে রাতে খাবার খেয়েছেন। এমনকি বাসের টিকিট কেটে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। বাসে উঠেও তিনি তার পরিবারকে মুক্তি পাবার কথা জানাননি। তিনি সচেতন একজন মানুষ হয়েও পুলিশ বা তার পরিবারকে মুক্তির কথা না জানানোর বিষয়টি রহস্যময়। এছাড়া পারিবারিক একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার আগে গত দুই মাস ফরহাদ মজহার ভোরে বাসা থেকে বের হন না। সেদিনই তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।

এর আগে গত সোমবার রাতে যশোরের অভয়নগরের একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধারের পর মঙ্গলবার সকালে তাকে নেওয়া হয় রাজধানীর আদাবর থানায়। সেখান থেকে তেজগাঁওয়ের ডিসি কার্যালয়ে নেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাকে নেওয়া হয় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার জবানবন্দি নেওয়ার জন্য সিএমএম আদালতে পাঠানো হয়।

উল্লেখ্য, গত সোমবার ভোর ৫টার দিকে বাসার সামনে থেকে ‘নিখোঁজ’ হন ফরহাদ মজহার। এরপর তিনি মোবাইলে বেশ কয়েকবার স্ত্রীকে ফোন করে ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার কথা বলেন। এ ঘটনায় রাতে তার স্ত্রী ফরিদা আক্তার বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন।

‘গফুর’ নামে বাসের টিকিট কেটেছিলেন!
----------------------------------

ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টায় যশোরের নওয়াপাড়া রেলক্রসিং সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে পুলিশের একটি টিম ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করে। রাত দেড়টায় খুলনার ফুলতলা থানায় এ বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি দিদার আহম্মেদ ও র্যাব-৬ খুলনার পরিচালক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। প্রেস ব্রিফিংয়ে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি দাবি করেন, অপহরণ নয়, স্বেচ্ছায় ভ্রমণে ছিলেন ফরহাদ মজহার। তবে এ সময় ফরহাদ মজহারের কাছে সাংবাদিকরা তার অপহরণের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি ‘এখন আমি কোন কথা বলবো না’ বাক্যটি ছাড়া কোন কথা বলেননি। বারবার প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের দিকে হাতজোড় করে কোন প্রশ্ন না করতে অনুরোধ করেন। সেখান থেকে রাত ২টার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রতিনিধি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়। রাতেই তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।

হানিফ পরিবহনের ওই বাসের (৫০৫ নম্বর এসি কোচ) সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান জানান, ফরহাদ মজহার খুলনার শিববাড়ি কাউন্টার থেকে বাসে ওঠেন। বাসে উঠেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। যশোরের শিল্পশহর নওয়াপাড়ার কাছাকাছি স্থানে তিনি ফরহাদ মজহারের টিকিট চেক করেন। তার টিকেটে নাম লেখা ছিল ‘মিস্টার গফুর’। নওয়াপাড়ায় পৌঁছানোর পর পুলিশ গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেয়। পরে অভয়নগর থানা পুলিশ ফরহাদ মজহারকে বাস থেকে নামিয়ে নেয়।

হানিফ পরিবহনের খুলনার শিববাড়ি কাউন্টার ইনচার্জ মো. সাদিক জানান, ফরহাদ মজহার নিজেই নিজেকে ‘গফুর’ নাম বলে তার কাছ থেকে টিকিট নেন। এরপর রাত সোয়া ৯টায় বাসটি কাউন্টার ত্যাগ করে। এ সময় তিনি একাই ছিলেন।

এদিকে বাসে ওঠার আগে সোমবার খুলনা নিউমার্কেটের সামনে গ্রিল হাউজ রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান ফরহাদ মজহার। রেস্টুরেন্টের মালিক আব্দুল মান্নান জানান, রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে একটি সাদা মাইক্রোবাসে ফরহাদ মজহার গ্রিল হাউজ রেস্টুরেন্টে আসেন। রেস্টুরেন্টে তিনি একাই প্রবেশ করেন। এ সময় তার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পরনে লুঙ্গি ও মাথায় সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। ফরহাদ মজহার রেস্টুরেন্টে এসে সাদা ভাত, ভর্তা, সবজি ও ডাল খেয়েছেন। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় ধরে তিনি খেয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে একাই বেরিয়ে যান। তখন তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।

হোটেলের ক্যাশিয়ার ইব্রাহিম জানান, তার (ফরহাদ মজহার) খাবারের বিল হয়েছিল ১৭০ টাকা। তিনি নিজে বিল পরিশোধ করে হোটেল থেকে বের হয়ে যান।

এর আগে ফরহাদ মজহারের কাছে থাকা মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে র্যাব-৬ এর সদস্যরা নিশ্চিত হন তিনি নগরীর নিউমার্কেট সংলগ্ন একটি টাওয়ারের আওতাধীন কোন এক স্থানে রয়েছেন। তার সন্ধানে র্যাব সদস্যরা নিউমার্কেট ও শিববাড়ি মোড় সংলগ্ন কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোড, মজিদ সরণী ও ইবরাহিম মিয়া সড়কের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে।

এদিকে ফরহাদ মজহারকে যশোরের নওয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে উদ্ধারের পর পুলিশ তাকে অভয়নগর থানায় এবং র্যাব খুলনাস্থ সদর দপ্তরে আনার চেষ্টা করে। বিষয়টি নিয়ে র্যাব-পুলিশের মধ্যে মৃদু উত্তেজনাও তৈরি হয়। সবশেষ পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তাকে ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়।
(আমীর মুহাম্মদ ও এনামুল হক, ইত্তেফাক)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর