প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানে মানুষের সৌরজগৎ ভাবনা
প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানে মানুষের সৌরজগৎ ভাবনা
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০৫-০৩ ০১:৫২:৩৮
প্রিন্টঅ-অ+


জার্মান জ্যোতির্বিদ কেপলার এর প্রসিদ্ধ তিনটি সূত্রই সম্ভবত সবচেয়ে প্রবলভাবে সৌরজগতের জ্যামিতিক কাঠামো নিয়ে পূর্বের মানুষদের দীর্ঘ ভাবনার অবসান ঘটাতে পেরেছিল।

কেপলার তার এই তিনটি সূত্রে প্রমাণ করে দেখান, ‘গ্রহের গতিপথ বৃত্তাকার নয়, উপবৃত্তাকার’, ‘সৌরজগতের প্রত্যেক গ্রহ সূর্যের চারিদিকে এমনভাবে ঘোরে যে সেই গ্রহ ও সূর্যের যোগরেখা সমান সময়ের মধ্যে সমান আয়তন অতিক্রম করে’ এবং ‘সূর্যের চারিপাশে একবার সম্পূর্ণ আবর্তিত হয়ে আসতে একটি গ্রহের যে সময় লাগে তার বর্গ ও সূর্য থেকে ঐ গ্রহের গড় দূরত্বের ঘনফলের অনুপাত প্রতিটি গ্রহের ক্ষেত্রে সমান।’

সৌরজগৎ সম্পর্কে কেপলারের সূত্রাবলী আবিষ্কারের ঘটনা যেমন আনন্দদায়ক তেমনি সৌরজগতের আজকের ধারণায় মানুষের পৌঁছাতে যে সকল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হয়েছে সে সকল পথের বিভিন্ন ঘটনাও কম রোমাঞ্চকর নয়। সূর্যের চারিদিকে অন্য গ্রহ ঘুরছে নাকি পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সকলে ঘুরছে এই বিতর্ক সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসছিল।

আমাদের আকাশে আমরা সূর্যকেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে দেখি, পৃথিবীর পথ চলার গতি কিন্তু শারীরিকভাবে মোটেও অনুভব করতে পারিনা। যে কারণে প্রাচীনকাল থেকে এই ধারণা মানুষকে দৃঢ়মূল করে রেখেছিল যে, পৃথিবীর চারিদিকেই সূর্য ঘোরে। এই ধারণার বিপক্ষে যারা কথা বলেছে তাদের সবাইকেই লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। মাত্র সাড়ে তিনশ বছর আগে সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের কথা বলার অপরাধে সত্তর বছর বয়সে ইতালির বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে রোমান ক্যাথোলিক গির্জার বিচারকমণ্ডলীর বিচারালয়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। যার কারণে বাকি জীবন কাটাতে হয়েছে রোমের কারাগার এবং ফ্লোরেন্সের কাছে এক বাড়িতে নজরবন্দী অবস্থায়।

প্রকৃতপক্ষে সতেরো শতকের শুরু পর্যন্ত মানুষদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবীর সৌরজগতের কেন্দ্র এবং সে স্থির। বাকিরা তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। শুধু চোখের দেখার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতার মানুষ মহাবিশ্বের একটি রূপ ও কাঠামোর আঁকার চেষ্টা করতো।

ব্যাবিলনীয়রা ভাবতো, এই বিশ্ব একটি শামুকের মতো কঠিন মোড়কে ঢাকা। এর ওপরে ও নিচে রয়েছে কেবল পানি। আর এই গোল শামুকটির কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের পৃথিবী। এটি প্রায় একটি ফাঁপা পর্বতের মতো। পৃথিবী পানিতে ভাসছে এবং পৃথিবীর নিচের পানি ফোয়ারা ও ঝর্ণা হয়ে উঠে আসে। আর পৃথিবীর ওপরের পানি গোলকের ভেতর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। পৃথিবীর ওপরের কঠিন গোলকটির আছে দুটি দরজা। একটি পূর্বে অন্যটি পশ্চিমে। সূর্য চন্দ্র ও তারা পূর্বের দরজা দিয়ে ঢোকে আর পশ্চিমের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

মিশরীয়রা ভাবতো, এই বিশ্ব একটি চৌকোনা বাক্সের মতো। পৃথিবীর হচ্ছে, বাক্সটির মেঝে আর আকাশ হচ্ছে পৃথিবীর চার কোণে চারটি পা রেখে দাঁড়ানো একটি গরু বা দুটি কনুই বা দুটি হাটু রেখে উবু হয়ে থাকা একটি নারী বা লোহার পাতের একটি গোল ঢাকনা। আর নক্ষত্রগুলো হচ্ছে, এক ধরনের গোলক বা বাতি যা আকাশে থাকা একেকজন দেবতার হাতে ধরা।

ভারতবর্ষের হিন্দুরা ভাবতো, বাসুকি নামে একটি সাপ তার ফনার ওপর পৃথিবীকে ধরে আছে। চন্দ্রগ্রহণ হয় রাহু মানে একটি রাক্ষসের গ্রাসে। চন্দ্রের কলা হচ্ছে প্রজাপতি দক্ষের অভিশাপে চন্দ্রের ক্ষয়রোগগ্রস্ত হওয়ার ফল।

চীনাদের ধারণা ছিল হিংস্র একটি ড্রাগন সূর্যকে গ্রাস করে বলেই সূর্যগ্রহণ ঘটে। আর সূর্যগ্রহণের সময় তারা সকলে সমচ্চরে চিৎকার জুড়ে দিয়ে একটি আচার পালন করতো এবং বিশ্বাস করতো তার ফলেই ড্রাগনটি উড়ে যায়। সূর্যগ্রহণের সময় তারা এই আচার পালন করতো।

বিশ্বসম্পর্কিত প্রাচীন মানুষের এইসব কল্পনা অর্থহীন হলেও বিশ্বপ্রকৃতির ওপর তাদের যে পর্যবেক্ষণ ছিল সেটাকে বিভিন্ন ব্যাখ্যায় দাঁড় করাতে তারা এসব ব্যবহার করতো।

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কিত প্রথম ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন বিজ্ঞানী থেলিস। তিনি সূর্যগ্রহণ ঘটার কারণও ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আকাশের চাঁদ যখন সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে তখন পৃথিবীর কোনো কোনো স্থানে সূর্যকে আর দেখা যায়না, তখন এই ঘটনাকে সূর্যগ্রহণ বলে। বর্তমান বিজ্ঞানে থেলিসের এই মতবাদ প্রমাণিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত।

এছাড়া চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবীর সবাই যে বৃত্তাকার এই ধারণা প্রথম দেন পিথাগোরাস। তার মতে, বৃত্ত হল একটি নিখুদ আঁকার যার আকৃতি আধ্যাত্মিক অনুভবের সঙ্গে তুলনীয়। আধ্যাত্মিকভাবে নির্মিত সকল মহাবস্তুই গোলাকার। তবে পিথাগোরাসের এই বৃত্তাকার মতবাতকে আরো বেশি জৌলুশ এবং প্রতিষ্ঠা এনে দেন তার ছাত্র ফিলোলাউস। পৃথিবী যে গোল শুধু তাই নয়, তার মতে পৃথিবীর গতি রয়েছে এবং ধ্রুবভাবে এটি গতিশীল, যে কারণে ঋতু পরিবর্তিত হয়।

ফিলোলাউস বিশ্বের যে রূপরেখা অঙ্কন করেছিলেন তা ছিল বেশ অদ্ভুত। তিনি ভাবতেন একটি বিশাল অগ্নিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে সূর্য, চন্দ্র পৃথিবী। আর পৃথিবীর পর রয়েছে পাঁচটি গ্রহ তারপর রয়েছে স্থির নক্ষত্রমন্ডল। এটি সত্য যে ফিলোলাউসের এই রূপরেখা মোটেও ঠিক না থাকলেও তিনিই প্রথম আহ্নিক গতির ধারণা প্রবর্তন করেন। যা পরবর্তীতে প্রমাণ করেছিলেন গ্রিক জ্যোতির্বিদ হেরাক্লিডাস। তিনি বলেন পৃথিবীর লাটিমের মতো ঘুরছে বলে এর আকাশ পরিবর্তিত হয় তিনি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বেশকিছুকাল প্লেটোর ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি অ্যারিস্টেটলের কাছ থেকেও শিক্ষালাভ করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন যে চন্দ্র পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে থাকে এবং বুধ ও শুক্রনামের দুইটি গ্রহ ও পৃথিবীর সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে থাকে। যদিও সে সময় আরিস্টেটলের মতবাদ ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত।

অ্যারিস্টেটলের মতবাদে মনে করা হতো পৃথিবী স্থির এবং সবাই তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আরিস্টেটলের এই মতবাদ পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণের পাশাপাশি ‘সূর্যকে কেন্দ্র করে সৌরজগতের সকল কিছু আবর্তিত’ এই মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন অ্যারিস্টাকার্স। পিথাগোরাস প্রাচীন গ্রিসে বিজ্ঞানচর্চায় যে যুক্তিবাদী গাণিতিক ধারার প্রবর্তন করেছিলেন সেই ধারার সর্বশেষ বিজ্ঞানী হলেন অ্যারিস্টাকার্স। তাকে গ্রিক যুগের কোপার্নিকাস নামে অভিহিত করা হতো। তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল অতি প্রখর। দূরবীন আবিষ্কারের প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেও তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলেন যে, সূর্যের আয়তন পৃথিবীর থেকে অনেক বড় এবং চাঁদের আয়তন পৃথিবী থেকে ছোট। যা তার আগে কেউ ভাবতেও পারেনি।

সে সময় তিনি একাই পৃথিবী সম্পর্কিত প্লেটো ও অ্যারিস্টেটলের মতবাদের বিপরীতে দাড়াতে পেয়েছিলেন। কিন্তু অ্যারিস্টেটল এবং প্লেটোর প্রভাব সে সময়ে এতোই ছিল যে তাদের ভুল মতবাদ থেকে সাধারণ মানুষদের বের করে আনতে পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসের আগমন পর্যন্ত তারপর আরও সতেরশো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

প্লেটো বলতেন এই পৃথিবীর আঁকার নিখুদ গোলাকার এবং মহাবিশ্বের বাকি সকল বস্তুর আয়তন ও কাঠামো পৃথিবীর মতো একই। আর এই বদ্ধমূল ধারণাকে আরো প্রতিষ্ঠিত করে অ্যারিস্টেটল বলেন বিশ্বের কেন্দ্র হচ্ছে পৃথিবী যাকে কেন্দ্র করে সূর্য সহ নয়টি গোলাকার বস্তু ঘূর্ণ্যমান। দূরত্ব অনুসারে এদেরকে বড় ছোট দেখা যায়। পরবর্তীতে ঠিক একই ধরনের কাঠামো দাঁড় করেন টলেমী। তার তের খন্ডে রচিত ‘আলম্যাজেস্ট’ গ্রন্থে তিনি সৌরজগতের বিভিন্ন কাঠামো দাঁড় করান।

এভাবে দিনের পর দিন বিভিন্ন বিজ্ঞানীর আগমন তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে একেক সময়ে আবিষ্কৃত হয়েছে একেক বিষয়। প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আজও সৌরজগৎ সম্পর্কে নতুন নতুন আবিষ্কারের ঘটনা ঘটে চলেছে। তবে সেকালের বিজ্ঞান থেকে আধুনিক বিজ্ঞান অনেক উন্নত হওয়ায় নতুন আবিষ্কারের জন্য যেমন সময় কম লাগছে তেমনি সেগুলো পরিক্ষালব্ধভাবে প্রমাণ হতে পারছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, পৃথিবী এবং সৌরজগৎ সম্পর্কে প্রায় একটি সত্য এবং স্বচ্ছ ধারণা বর্তমান মানুষের রয়েছে। যার জন্য মানুষজাতিকে বহু সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তথ্য সহায়তা : সৌরজগৎ- সুব্রত বড়ুয়া, মিসতেরিয়াম কসমোগ্রাফিকাম- জোহানেস কেপলার, দ্য রুটস অব সিভিলাইজেশন- অ্যালেকজান্ডার মারশাক।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিজ্ঞান প্রযুক্তি এর অারো খবর