রানা প্লাজা ধসের ৪ বছর: আজও শঙ্কা কাটেনি আহত শ্রমিকদের
রানা প্লাজা ধসের ৪ বছর: আজও শঙ্কা কাটেনি আহত শ্রমিকদের
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০৪-২৪ ২৩:১২:৫৪
প্রিন্টঅ-অ+


চার বছর আগের এইদিনে সাভারে রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের জীবনে আজও হাসি ফোটেনি। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের পরও ওই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা আহত শ্রমিকদের মন থেকে ভয়, শঙ্কা কাটেনি। আহত শ্রমিকরা বলছেন, চারবছরের একটি রাতও নেই, যে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে তারা জেগে ওঠেন না। আর গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যে শ্রমিকরা ওই পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ক্ষতিপূরণের নামে যে থোক-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাও ন্যায্য নয় বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

এদিকে চার বছর পার হলেও ভবন নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হত্যা মামলার কোনোটিরই বিচার শেষ হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি দুই মামলার আসামিরা কেউ রিট, কেউ রিভিশন করায় কারণে কোনও অগ্রগতি নেই। এ মামলায় এখনও কারাগারে রয়েছে ভবন মালিক সোহেল রানা। ৪১ আসামির ২৯ জনই জামিনে। হত্যা মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর খন্দকার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘হত্যা মামলাটিতে চার্জ গঠনের পর উচ্চআদলত থেকে সাক্ষী স্থগিত রাখা আছে।’ দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা খুবই কমন ঘটনা।’

আজ ২৪ এপ্রিল। ২০১৩ সালের এইদিনে সাভারের রানা প্লাজা নামের ভবন ধসের ঘটনায় পাঁচটি পোশাক কারখানার শ্রমিকসহ এক হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক-কর্মচারী নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার। তাদের অনেকেই সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। গত চার বছরে কারও শারীরিক অক্ষমতায় ঘর ভেঙেছে, কেউ কেউ ভবন ধসের আতঙ্কজনিত কারণে আর দোতলা ভবনেও ওঠেননি।

চার বছর আগের এইদিন

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। সাভারের নয়তলা ভবন রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানার শ্রমিকরা দল বেঁধে প্রবেশ করছেন। তখনও তারা জানতেন না, কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। সকাল ৮ টা ৪৭ মিনিটে একযোগে চালু করা হয় ডজন খানেক জেনারেটর। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ধসে পড়ে ভবনটি। প্রায় এক হাজার শ্রমিক প্রাণ হারান ঘটনাস্থলেই। ভবনে আটকেপড়া ও হাসপাতালে মারা যাওয়া শ্রমিক মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৮ জনে। ঘটনায় আহত হন আরও কয়েক হাজার।

এই ঘটনা বিষয়ে প্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সাংবাদিক নাজমুল হুদা বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন ২৩ এপ্রিল সকালে ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ার খবর শুনে সেখানে পৌঁছাই। রানা প্লাজার ফাটলের সংবাদ সংগ্রহ ও চিত্রধারণের সময় মালিক ও সাভার যুবলীগের নেতা সোহেল রানার সঙ্গীরা বার বারই বাধা দিতে থাকেন। এরপর দিন প্রাণের ভয়ে শ্রমিকরা প্রথমে কাজে যোগ দিতে চাননি বলে আমি জানি। কিন্তু ভবন মালিক সোহেল রানা জোর করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন।’

সংখ্যা নয় প্রাণ

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৮ জনের লাশ পাওয়া গেলেও নিখোঁজ ছিলেন অনেকে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে দেওয়া তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা বলা ছিল ৩৭৯ জন। উদ্ধারকারীদের নেতৃত্ব দেওয়া সেনাবাহিনীর নিখোঁজ তালিকায় বলা হয়েছে ২৬১ জন। এর মধ্যে প্রথম দফায় ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পাওয়া যায় ১৫৭ জনের খোঁজ। দ্বিতীয় দফায় পরিচয় মেলে আরও ৪২ শ্রমিকের। শ্রম মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্তদের মধ্যে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৬২জন। এদিকে ১৩ মে পর্যন্ত চলা উদ্ধার অভিযানে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ২৫১৫জনকে।

এখনও বেকার ৪২ শতাংশ!

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের সর্বশেষ গবেষণা বলছে, রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকদের শতকরা ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ এখনও বেকার। এই বেকারত্বের প্রধান কারণ হিসেবে শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘এখনও ট্রমাটাইজড শ্রমিকেরা কাজে যেত ভরসা পান না। তারা কাউন্সিলিংয়ের সময় চিকিৎসকদের নানা সময় বলেছেন, কিভাবে কাজে গেলে জেনারেটর ও মেশিনের শব্দ তাদের আবারও সেইসব স্মৃতিতে নিয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের যেভাবে আর্থিক সহয়তা দেওয়া হয়েছে সেখানে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। শ্রমিকরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে সেই অর্থ ব্যয়ে সক্ষম হননি।’

শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাননি!

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, ‘আমরা নিহত ও আহত সকল শ্রমিকদের আজীবন আয়ের পরিমাণই ক্ষতিপূরণ হিসেবে চেয়ে আসছি। যেটা কখনোই ২২ লাখ টাকার কম হবে না। কিন্তু তা মেলেনি। ফলে থোক বরাদ্দ পাওয়া গেছে বলা যেতে পারে। হতাহতদের ক্ষতিপূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে মিলে আইলও’র নেতৃত্বে ৩০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয় (৩২০ কোটি টাকা)। শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টি সত্য বলে অভিহিত করে মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কে কিসের ভিত্তিতে কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন, তার কোনও মাপকাঠি না থাকায় মালিক ও সরকার, উভয় পক্ষই শ্রমিককে ঠকাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্ট থেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা কোথায় গিয়ে যেন আটকে আছে।’

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর