রাডার দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন এরশাদ
রাডার দুর্নীতি মামলায় খালাস পেলেন এরশাদ
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০৪-১৯ ২৩:৫০:১১
প্রিন্টঅ-অ+


বিমানের রাডার ক্রয়ে দুর্নীতি মামলায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ তিনজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বুধবার বিকেলে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. কামরুল হোসেন মোল্লা খালাসের রায় প্রদান করেন।

খালাস পাওয়া অন্যরা হলেন- বিমান বাহিনীর প্রাক্তন প্রধান সুলতান মাহমুদ ও প্রাক্তন সহকারী প্রধান মমতাজ উদ্দীন আহমেদ। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম না হওয়ায় খালাসের রায় প্রদান করেন আদালত।

অপর আসামি ইউনাইটেড ট্রের্ডাস লিমিটেডের পরিচালক একেএম মুসা পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন।

রায় ঘোষণার সময় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ ৩ আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। খালাসের রায় শুনে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি মিডিয়ার সাথে কোনো কথা না বলেই চলে যান।

এরশাদের আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। দীর্ঘদিন পর হলেও ন্যায় বিচার পেয়েছেন তিনি (এরশাদ)। প্রকৃতপক্ষে মামলাটি ছিল রাজনৈতিক মামলা। তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ায় তার (এরশাদ) বিরুদ্ধে এ মামলাসহ অন্যান্য মামলা দায়ের করা হয়।

অন্যদিকে এ মামলার দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুস সালাম বলেন, রায়ে আমরা খুশি নই। তবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর পর্যালোচনা করে আপিল করা হবে কি না এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিব।

এই মামলায় দুদকের আইনজীবীদের গাফিলতি ছিল-আদালতের মন্তব্যের জবাবে আবদুস সালাম বলেন, এই মামলায় মোট ৩৮ জন সাক্ষী ছিল। মাত্র ১২ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের আদেশের পর মামলাটি যখন স্থগিত হয়ে যায় পরবর্তী সময়ে আর সাক্ষীদের আনা সম্ভব হয়নি। অন্য সাক্ষীদের হাজির করা গেলে মামলার অবস্থান আরো দৃঢ় হতো। রায় পর্যালোচনা করে এই বিষয়ে আপিলের সিদ্ধান্ত নেব নিবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, মামলার ৩৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জন সাক্ষীকে দুদকের পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। মামলায় অব্যাহতি পাওয়া এক আসামি, স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ৪ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিল যাদের দুদক আদালতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন নাই। অন্যদিকে আদালতে যে সকল সাক্ষী দুদক উপস্থাপন করেছেন তারা ক্রয়কৃত রাডারের মান নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেন নাই। বরং ক্রয়ের পর থেকে রাডার ভালোভাবে সেবা দিয়ে আসছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ফ্রান্সের থমসন কোম্পানির রাডারের তুলনায় ক্রয়কৃত যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টিং কোম্পানির রাডার তুলনামূলক ভাল বলেই প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া আসামি এরশাদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শুধুমাত্র রাডার ক্রয়ের বিষয়টি ফরমাল অনুমোদন করেছেন। অন্যদিকে আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর সহযোগিতায় সরকারের ৬৪ কোটি ৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৯১৮ টাকা আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন অভিযোগ করা গেলেও কে কত টাকা আত্মসাৎ করেছেন, কিভাবে করেছেন তা বলা হয়নি। বা কোন সাক্ষী তা আদালতেও বলেননি। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করা হইল।

এরশাদ এদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আদালতে প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর পৌনে ৪টার দিকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে সঙ্গে নিয়ে বিচার কক্ষে প্রবেশ করেন। তার সাথে জাতীয় পার্টির কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের, প্রেসিডিয়াম পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, কাজী ফিরোজ রশীদ সেখানে হাজির ছিলেন।

মামলায় খালাস পাওয়া আসামি মমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক একটি মামলাতে এতদিন অভিযুক্ত ছিলাম। রায়ে খালাস পাওয়ার পর মনে হচ্ছে, এত বছর পর মাথা থেকে একটি ভারি বোঝা নেমে গেছে।’

খালাস পাওয়া আরেক আসামি সুলতান মাহমুদের আইনজীবী শামসুদ্দীন বাবুল বলেন, ‘এ মামলার কারণে সুলতান মাহমুদ পেনশনসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেবল রাজনৈতিকভাবে তাকে ঘায়েল করার জন্য মামলাটি দায়ের করা হয়। শেষ পর্যন্ত এ মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তি পেলেন তিনি।’

এদিকে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আরো ৩টি মামলায় তিনি খালাস পান। মামলাগুলো হলো, বিটিভির ইএনজি ক্যামেরা ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা, শিল্প ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ সংক্রান্ত দুর্নীতি ও বহুল আলোচিত স্বর্ণচোরাচালান সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা। এরপর বর্তমান সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি খালাস পান এরশাদ। দেশের ৮৯টি উপজেলায় টেলিফোন লাইন স্থাপনে দুর্নীতি মামলায় খালাস পান। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের অর্থপাচারের অভিযোগের দায়ের করা মামলায় তিনি ও তার বান্ধবী মরিয়ম মমতাজ মেরীকে অব্যাহতি দেয় দুদক। পরে ২০১১ সালের ১৯ জুন আদালত তা অনুমোদন করেন।

এদিকে এরশাদের আরেক আইনজীবী সামসুদ্দিন বাবুল জানান, এ মামলায় খালাস পাওয়ায় এখন তার (এরশাদ) বিরুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা বিচারাধীন থাকলো। তবে রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার মামলায় আগামি ৯ মে হাইকোর্ট আপিলের রায় ঘোষণা করবেন।

এর আগে গত ১২ এপ্রিল দুদক ও আসামিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর রায় ঘোষণার জন্য ১৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেন বিচারক।

১৯৯২ সালের ৪ মে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দায়ের করা এ মামলায় ১৯৯৪ সালের ২৭ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে ব্যুরো। ১৯৯৫ সালের ১২ আগস্ট এরশাদসহ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মামলার সুপ্রিম কোর্টের আদেশে স্থগিত ছিল। পরে মামলার ১৮ বছর পর ২০১০ সালের ১৯ আগস্ট শুরু হয় বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ। ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল চার্জশিটের ৩৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই বছর ১১ জুন তৎকালীন ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আব্দুর রশিদ মামলাটির যুক্তিতর্কের শুনানির শেষপর্যায়ে এসে মামলাটি পরিচালনায় বিব্রতবোধ করেন। এরপর মামলাটির নথি রায় ঘোষণাকারী আদালতে আসে। এই আদালতে পুনরায় শুরু হয় যুক্তিতর্ক। রায় ঘোষণাকারী আদালতে একাধিক ধার্য তারিখে যুক্তিতর্কের শুনানির পর দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে আর কিছু সাক্ষী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আবেদন করা হয়। ২০১৬ সালের ৭ নভেম্বর ওই আবেদন নাকচ করেন বিচারক। ফলে ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করে দুদক। ওই আবেদন নিষ্পত্তি করে ২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর হাইকোর্ট সাক্ষ্য গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ৩১ মার্চের মধ্যে বিচার শেষ করতেও নির্দেশ দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে আসামি সুলতান মাহমুদ আপলি বিভাগে আবেদন করেন এবং আপিল বিভাগ পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের আদেশ বাতিল করেন। এরপরই বিচারিক আদালত যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৮০ সালে বিমান বাহিনীর জন্য একটি হাই-পাওয়ার এবং দুটি লো-লুকিং লেভেল র‌্যাডার ক্রয়ের প্রস্তাব করে। ফ্রান্সের থমসন কোম্পানি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম মূল্যে ২০ দশমিক ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে তা সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। কিস্ত আসামিরা পরবর্তীকে পরস্পর যোগসাজসে সরকারি অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টিং কোম্পারি সঙ্গে তা ক্রয়ের জন্য ৪ কোটি ৯ লাখ ৬২ হাজার মার্কিন ডলারে চুক্তি করে। এর মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের ৬৪ কোটি ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯১৮ টাকার ক্ষতি করেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রায় তিন ডজন মামলা হয়। এর মধ্যে বহুল আলোচিত জনতা টাওয়ার মামলাসহ তিনটি মামলায় তার সাজার আদেশ হয় এবং জনতা টাওয়ার মামলায় তিনি ৫ বছর সাজাও ভোগ করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এরশাদ নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা দেন, তাতে তখনও আটটি মামলা বিচারাধীন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। বাকি মামলাগুলো থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন অথবা মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ওই আট মামলার মধ্যে চারটির কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলাসহ তিনটি মামলা চালু রয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

আইন ও অধিকার এর অারো খবর