গানের তথ্যবিভ্রাট নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া: রফিকউজ্জামান বনাম লীনা তাপসী
গানের তথ্যবিভ্রাট নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া: রফিকউজ্জামান বনাম লীনা তাপসী
সংগীতা ঘোষ
২০১৫-১২-০৮ ০৫:৫১:৫৮
প্রিন্টঅ-অ+


গানের তথ্যবিভ্রাট নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বনামধন্য গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। অভিযোগের আঙুল তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান নজরুল সংগীত শিল্পী লীনা তাপসী খানের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন তুলেছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা এবং সংগীত বিভাগের যোগ্যতা নিয়ে। এদিকে এমন গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে আত্মপক্ষ সমর্থনে লীনা তাপসী খানও নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন।

গত ১৭-১৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ‘সংগীত উৎসব–২০১৫’। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান (১৯৫৬–২০১০) শীর্ষক এই উৎসবে চলচ্চিত্র সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন গুণী ব্যক্তিত্বকে (মৃত ও জীবিত) সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রকাশ করা হয় তথ্যসমৃদ্ধ একটি স্মরণিকা। যেখানে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মহসিনা আক্তার খানম (লীনা তাপসী খান)। আর এই নিবন্ধ নিয়েই মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান গুরুতর আপত্তি তুলেছেন। রাখঢাক না করেই বললেন, ‘ঢাবি সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যানের জ্ঞান কতটা! কী শেখাচ্ছেন তার সংগীত বিভাগে!’

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের ক্ষোভের কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, লীনা তাপসী খান ওই নিবন্ধে বেশকিছু কালজয়ী গানের গীতিকার-সুরকারের নাম সম্পূর্ণ ভুল দিয়েছেন। যাতে তিনি লিখেছেন, ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ এবং সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘মিছে হলো সবই যে মোর’ গান দুটির সুরকার ছিলেন সত্য সাহা এবং গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

আসলে কি তাই? তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে জানা গেছে মোটেই নয়। কালজয়ী গান দুটিসহ এই ছবির সব গানই লিখেছেন প্রয়াত নন্দিত গীতিকবি ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। শুধু তাই নয়, সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যানের লেখা ওই নিবন্ধে আরও বেশকিছু গানের সুরকার, গীতিকারের পরিচয়ে তথ্যবিভ্রাট রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের লেখা ‘সুরের গলায় লটকে আছে শিরোনামের একটি গানকে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের লেখা বলেও উল্লেখ করেছেন নিবন্ধকার।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বলেন, ‘চারপাশে এখন সংগীতের তথ্যবিভ্রাট চলছে। এসব দেখার কেউ নেই। সবচেয়ে দুঃখ লাগে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও যখন একই ভুল আরও গভীরভাবে করে। আমি মনে করি এসব বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করা উচিত। কেউ আমার পাশে থাকুক না থাকুক, সমস্যা নেই। প্রতিবাদ আমি করবই।’

একই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘‘গত ১৮ নভেম্বর একটি টেলিফোন এলো। ধরতেই ওই প্রান্ত থেকে প্রশ্ন এলো, ‘স্যার- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি নিঃস্ববিদ্যালয় হয়ে গেলো?’ তারপর যে ঘটনা বললো তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। এ ফোন রাখতেই আরেকটি ফোন- প্রশ্ন: ‘স্যার, তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়- গানটি গাজী মাজহারুল আনোয়ার কবে লিখলেন? আমরা তো ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি যে এটা ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যারের লেখা।’ এরপর ফোন করলেন কবি আবিদ আনোয়ার, ড. তপন বাগচীসহ অনেক গুণীজন। সবার একই প্রশ্ন। ২০ নভেম্বর পর্যন্ত একই বিষয়ে ফোন পেলাম ৩০০-এর বেশি। ফেসবুক বন্ধ, প্রতিবাদও করতে পারছি না।’’

এদিকে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের বয়ানে অভিযুক্ত লীনা তাপসীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানালেন ভিন্ন কথা। স্মরণিকায় তার লেখা নিবন্ধে ‘কিছু তথ্য ভুল আছে’ স্বীকার করলেও পাল্টা অভিযোগ করেছেন রফিকউজ্জামানের বিরুদ্ধে! তিনি বললেন, ‘এই বিষয়ে উনি (মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান) আমাকে গত সপ্তাহে ফোন দিয়েছেন। আমি ভুলের বিষয়টি মেনে নিয়েছি এবং খুবই মার্জিত ভাষায় সম্মানের সঙ্গে উনাকে বুঝিয়ে বলেছি যে, এই তথ্যগুলো আমি নিজে বানিয়ে লিখিনি। এগুলো এশিয়াটিক সোসাইটির চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি তথ্যভাণ্ডার থেকে নিয়েছি। ভুলটা তাদেরই। সেদিন উনার সঙ্গে এ বিষয়ে আরও অনেক কথা হয়েছে। সব কথা বলতেও খারাপ লাগছে। তবে আমি উনাকে এটুকু বলেছি- সামনে এমন উৎসবে উনাকেও ডাকা হবে সম্মানিত করার জন্য। এর পরেও উনি যদি এই বিষয়টিকে জটিল করতে চান, তবে বলার কিছু নেই।’

পাল্টা জিজ্ঞাসা ছিল- ঐতিহাসিক গানের ভুল তথ্য প্রকাশের বিপরীতে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানকে সম্মানিত করার কি সম্পর্ক থাকতে পারে! তিনি বললেন, ‘এখানে অনেক ব্যাপার আছে। যা বলতে চাই না এখন। এটুকুই বলছি, সেদিন উনি আমাকে ফোন দিয়ে প্রথমেই জানতে চেয়েছেন- উনাকে এবার সম্মাননার জন্য ডাকা হয়নি কেন? প্রশ্নটা হুবহু এমন না হলেও- মূল বক্তব্য ছিল এমনই। তখন আমি বলেছি, আপনাকে আমরা সম্মানিত করতে চাই। আপনি অবশ্যই যোগ্য। সামনে নিশ্চয়ই ডাকব। এরপরই তিনি আমাকে নিবন্ধে তথ্যবিভ্রাটের বিষয়টি বললেন। আমিও তাকে ভুল স্বীকার করে বুঝিয়ে বলেছি।’

লীনা তাপসী খান ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘৯০ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর ২২ বছরের সংগীত বিভাগ কেউ কখনও এই উদ্যোগ নেয়নি। আমি সেই উদ্যোগটি নিয়ে এভাবে বিব্রত হচ্ছি। সংগীতের মানুষদের সম্মানিত করতে গিয়ে নিজেই অসম্মানিত হচ্ছি। এটাতো একটা স্মরণিকা, কোনও বই নয়, গবেষণাও নয়। তাহলে কেন বিষয়টিকে নিয়ে এত জলঘোলা করা হচ্ছে? হাজার হাজার মানুষ টিভি রেডিওতে প্রতিনিয়ত এসব গান গেয়ে যাচ্ছে। কই কেউতো কখনও গীতিকার-সুরকারের নামটাও মুখে আনে না। তখন এই প্রতিবাদ থাকে কোথায়?’

এদিকে স্মরণিকায় প্রকাশিত আসল ভুলটি এশিয়াটিক সোসাটির তৈরি সংগীত ও চলচ্চিত্র তথ্যভাণ্ডার থেকে নেওয়া- লীনা তাপসীর এমন যুক্তির বিপরীতে মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের স্পষ্ট প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও গানের বিষয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি কে? আগে তার জবাব দিন।’

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিনোদন এর অারো খবর