রাতে বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে: মেঘ
রাতে বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে: মেঘ
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০২-১১ ১৪:৩৩:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+


বাসায় প্রবেশ করতেই যে ছেলেটির চলাফেরা সবার নজর কাড়বে, সে মেঘ। ১০ বছরের ছেলেটির পুরো নাম মাহির সরওয়ার মেঘ। মাথায় ঘন কালো চুল, ফর্সা চেহারা, বয়সের হিসেবে লম্বা, স্বাস্থ্য ভালো। আলাপ শুরু হলে তার সাথে বন্ধুত্ব হবেই। দেখলে মনে হবে না এই ছেলের ভেতর রয়েছে রাজ্যের সব যন্ত্রণা।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাদেরই একমাত্র ছেলে মেঘ। বাবা-মা হারানোর ৫ বছর পূর্ণ হবে ১১ ফেব্রুয়ারি। বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত জীবনে এরই মধ্যে মেঘের জীবনে এসেছে নানা পরিবর্তন। ডানপিটে স্বভাবের ছেলেটি তার বাবার মতো ‘অলরাউন্ডার’। লেখাপড়া করছে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালের (বিআইটি) ক্লাস ফোরে।

বাবা-মা সাংবাদিক হলেও তার ভালোলাগা খেলাধুলায়। বিশেষ করে, ক্রিকেট। এখন থেকেই স্বপ্ন দেখে নামকরা ক্রিকেটার হওয়ার।

বৃহস্পতিবার পশ্চিম রাজাবাজারের ৬৬/১২ নম্বর বাসায় চার তলায় মেঘের মামার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শিশুসুলভ সব দুষ্টুমিতে ব্যস্ত সে। এ প্রতিবেদককে দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না, সাংবাদিক এসেছে। কয়েক বছর ধরে মেঘ সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী এলে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন সেখানে। বাসার বসার ঘরে বসতে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে গেল সে। এরপর যখন ফিরে এল তখন ঘরটিতে শুরু হলো মেঘের রাজত্ব।

বাসার ঘরের একটি দেয়ালে ছোট্ট মেঘকে নিয়ে সাগর-রুনির তিনটি ছবি সাঁটানো। অন্য দেয়ালে একটি ছবি আছে, যেটি সাগর-রুনির বিয়ের দিন তোলা। তিনটি ছবির দিকে তাকিয়ে মেঘের আলাপ, প্রথম ছবিতে বাবা-মায়ের মাঝে আমি (মেঘ), দ্বিতীয় ছবিতে আমি তাদের নিচে আর শেষ ছবিতে বাঁয়ে।

মেঘ জানায়, ‘প্রায় রাতেই তার বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। যখন শুয়ে পড়ি তখনই তাদের কথা মনে পড়ে। তাদের সাথে যেসব জায়গায় গিয়েছিলাম সেসব জায়গার কথা। ভাবতে থাকি যদি তারা থাকতেন।’

মেঘের আপন বলতে শুধু তার ফুফু, দুই মামা ও নানি রয়েছেন। তবে প্রায় বছর খানেক হলো- দাদি ও ফুফুদের সঙ্গে তার দেখা হয়নি তার। মেঘ বলে, পড়ালেখার চাপে দাদির বাসায় যেতে পারি না। অনেক দিন অাগে দাদিকে দেখেছিলাম। তাও এক বছর হবে। এরপর আর দেখা হয়নি।

সারা দিন কী করো? জানতে চাইলে মেঘের সহজ উত্তর, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করি, নাশতা করি, স্কুলের জন্য রেডি হই। পরে রূপা (ফারজানা রূপা, ৭১ টিভি) আন্টির বাসায় যাই। সেখান থেকে গাড়িতে করে স্কুলে যাই।’

বাসায় মেঘকে সবচেয়ে বেশি আদর করেন তার বড় মামা নওশের রোমান (ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে কর্মরত), এমনটাই দাবি মেঘের। আর ছোট মামা তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, যার সাথে মারামারি, খেলাধুলা, গল্পগুজব সবকিছু করতে পারে সে।

মেঘের স্বপ্ন একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। এ জন্য তার বড় মামা ক্রিকেট ব্যাট, বল কিনে দিয়েছেন। তবে তার পড়ালেখার এত চাপ যে, নিয়মিত অনুশীলনই করা হয় না।

‘ক্রিকেট খেলতে আমার খুব ভালো লাগে। বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চাই। সময় পেলে বাসার ছাদে খেলি। তবে কক্সবাজার স্টেডিয়ামে আমি আমার প্রথম সেঞ্চুরি করতে চাই,’ মেঘ তার ইচ্ছার কথা বলল।

বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সবাইকে ভালো লাগে তার। এদের মধ্যে তার সবচেয়ে ভালো লাগে সাকিব আল হাসানকে। এরপর সাকিবকে ভালো লাগার কয়েকটি কারণের কথা বলে সে। এসব কারণের মধ্যে প্রথমেই বলে সে, সাকিব আল হাসান ও তার স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশির মেঘের সাথে একবার সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। সে সময় মেঘ অনেক ছোট ছিল। সেখান থেকে সাকিবের প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাউকে না জানিয়ে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলতে যান সাকিব। এই অপরাধে সাত মাসের জন্য সাকিবের বিদেশি লিগ খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিসিবি। ওই সময় বেসরকারি টেলিভিশন ইন্ডিপেন্ডেন্টের একটি অনুষ্ঠানে মেঘ বিসিবির তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্টের প্রতি সাকিবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে। মেঘের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পরে সাকিবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

মেঘ জানায়, ‘সাকিবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর সেই আমাকে ফোন করে কথা বলেছিল। আমাকে ধন্যবাদও জানিয়েছে।’

ক্রিকেটের প্রতি মেঘের আগ্রহের ব্যাপারে তার বড় মামা নওশের রোমান বলেন, ‘সে (মেঘ) ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করে। কিন্তু এখন তার ওপর লেখাপড়ার যে চাপ তাতে সময়মতো প্র্যাকটিস করতে পারে না। কোনো ক্লাবও তাকে ভর্তি করে নিচ্ছে না। তবে লেখাপড়াটা একটু গুছিয়ে নিলেই আমি তাকে কোনো একটা ক্লাবে ভর্তি করে দেব।’

তিনি বলেন, মেঘ ছোট হলেও অন্যান্য শিশুর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। লেখাপড়ায় অনেক ভালো। সবকিছু বোঝে। নিজেই নিজের কাজ করতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। সাগর তখন মাছরাঙা টিভি আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর