ফিরে দেখা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
ফিরে দেখা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০২-০৬ ১৩:৫৫:২৫
প্রিন্টঅ-অ+


সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। প্রথম জীবনে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে নাম লেখান। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং এই দল থেকেই শেষ নিশ্বাঃস ত্যাগ করেন।

রোববার রাজধানীতে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ভোর রাত ৪টা ১০ মিনিটে তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭১। এর আগে গত বছর মে মাসে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সুরঞ্জিত। পরে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। গত শুক্রবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করা হয়।

অবস্থার অবনতি হলে শনিবার রাত ৮টার দিকে তাকে হাসপাতালের সিসিইউতে নেয়া হয়। এরপর লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর জন্ম ১৯৪৫ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারাপুর গ্রামে। তিনি মোট সাতবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে চারবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে ন্যাপ থেকে প্রথমবারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে একতা পার্টি ও ১৯৭৯ সালে গণতন্ত্রী পার্টি থেকে সাংসদ হন। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে হেরে গেলেও পরে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে আসেন তিনি।

১৯৭০ সালে নির্বাচন করে প্রায় সবকটি আসনে আওয়ামী লীগের নেতারা জয়ী হলেও কেবল তিনি ন্যাপ থেকে জয়ী হন। ওই সময়ই তরুণ সংসদ সদস্য হিসেবে সুরঞ্জিত সবার মনোযোগ কাড়েন।

আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার আগে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পরিচিত পান ‘ছোট দলের বড় নেতা’ হিসেবে। একাত্তরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ৫ নম্বর সেক্টরের সাব কমান্ডার হিসেবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তা ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনী আনার জন্য গঠিত কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

তার ছাত্রজীবনের প্রথম অংশ কেটেছে সিলেট ও সুনামগঞ্জে। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। এরপর আইনে ডিগ্রি নেন। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি কয়েক বছর আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সংসদ-বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলে ‘সংস্কারপন্থী’ নেতা বলে পরিচিত হন তিনি। এ কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়েন। পরে ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হলেও তার সহকারীর গাড়িতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন সুরঞ্জিত। এরপর তিনি পদত্যাগ করলেও তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজনীতিতে বাকপটু ও দক্ষ সাংসদ হিসেবে পরিচিত লাভ করেন তিনি।

সুরঞ্জিত ১৯৭৯ সালের সংসদে ছিলেন একতা পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯৯১ সালের সংসদে গণতন্ত্রী পার্টি থেকে নির্বাচিত হন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে হেরে যান। পরে অবশ্য অন্য আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। এরপর অষ্টম, নবম ও দশম সংসদেও তিনি নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে সংস্কারের প্রস্তাব তোলাদের কাতারে ছিলেন তিনি। এ কারণে নির্বাচনের পর ‘সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত অন্যদের’ মত সুরঞ্জিতকেও মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়। পরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়েন। ঠাঁই পান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে। দলের মধ্যে এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন ‘বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না’।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় এলে এই সরকারের তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। প্রথম রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই রেল বিভাগেকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, রেলের ‘কালো বিড়ালটি’ খুঁজে বের করতে চাই। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় নিজের এপিএসের গাড়িতে বিপুল পরিমান অর্থ পাওয়া গেলে তিনি চাপে পড়ে যান। সহকারীর অর্থ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেও পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে সে সময় তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দশম সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর সুরঞ্জিতকে আর মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। তিনি আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরঞ্জিত ছিলেন সবার ছোট। তিন ভাই আগেই মারা গেছেন; একমাত্র বোন কলকাতায় বসবাস করছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। সৌমেন সেনগুপ্ত তাদের একমাত্র সন্তান।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

রাজনীতি এর অারো খবর