পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে অর্থায়ন জটিলতা
পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে অর্থায়ন জটিলতা
২০১৭-০২-০৩ ১৩:০৬:০১
প্রিন্টঅ-অ+


পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের মূল অর্থায়নকারী চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণচুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ছয় মাস ধরে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তারা কিছু জানাচ্ছে না। এমনকি ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জন্য চীনের ঋণের তালিকায়ও এ প্রকল্প নেই। ফলে অর্থায়ন জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক বা দ্রুত বাস্তবায়নের তালিকাভুক্ত এ প্রকল্পের যথাসময়ে কাজ শেষ হবে কি-না, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।


পদ্মার মাওয়া ও জাজিরা পয়েন্টে নির্মাণাধীন দেশের সবচেয়ে বড় এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। এদিন থেকেই ট্রেন চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩১৩ কোটি ডলার দেওয়ার কথা চীনের এক্সিম ব্যাংকের। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে) এর পরিমাণ ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের নির্বাচিত ঠিকাদার চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের (সিআরইসি) সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তিও করেছে রেলওয়ে। গত আগস্টে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির পর অব্যাহতভাবে যোগাযোগ করা হলেও দেশটির এক্সিম ব্যাংক মূল ঋণচুক্তি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ কারণে দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারসংক্ষেপও পাঠিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) দেশটির দূতাবাস ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এরও কোনো জবাব দেয়নি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংক।


রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, চীনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। এখন ব্যাংক কেন ঋণচুক্তিতে দেরি করছে, তা জানা নেই। তবে দ্রুত অর্থ পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইআরডি দেশটিকে চিঠি দিয়েছে। তিনি বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ঋণচুক্তি হলেই মূল কাজের উদ্বোধন করা হবে। তবে চুক্তি দেরি হলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রেল চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ইআরডি সচিব শফিকুল আযম বলেন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে ঋণচুক্তি করতে চীনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন পরবর্তী কার্যক্রম চলছে, যাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু করা যায়।

প্রকল্পের পরিচালক সুকুমার ভৌমিক বলেন, বাণিজ্যিক চুক্তির পর ঋণচুক্তিতে দেরি হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। সরকারি তহবিলে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চললেও মূল কাজ থমকে গেছে। তিনি বলেন, ঋণচুক্তির বিষয়ে রেলওয়ের কিছু করার নেই। ইআরডি অর্থায়নের বিষয়ে কাজ করছে।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই এ সেতু দিয়ে ট্রেন চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ঋণচুক্তি সই না হওয়ায় মাঠের কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বছরের শুকনো মৌসুমের মধ্যে আড়িয়াল খাঁ সেতুসহ অন্যান্য রেলসেতুর ফাউন্ডেশন নির্মাণ করা সম্ভব না হলে পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকে ট্রেন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।


রেলওয়ের অভিযোগ, চীনের এক্সিম ব্যাংক চুক্তি না করায় মূল পদ্মা সেতুর কাজেও বিঘ্ন ঘটছে। এ সেতুতে নির্মিতব্য ব্লাস্টলেস স্ল্যাব ট্রাক, ভায়াডাক্ট, ওয়াকওয়ে, সিগন্যালিং কেবল ডিজাইন কাজ সম্পন্ন করে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সিডিউল চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এটি করতে না পারলে রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণে ইন্টারফেসিং সমস্যা সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া পদ্মা সেতুর ওপর রেলপথ নির্মাণের জন্য যাবতীয় নকশা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। এমন একটি অগ্রাধিকার প্রকল্পের বিষয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের কাজ শুরু করার প্রয়োজন হলেও চীন তা করছে না। এ কারণে ঋণ মঞ্জুর এবং চুক্তি সইয়ের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ অবস্থায় পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকে রেল চালু করতে না পারলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে।


পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে চীনের অর্থ না পেলে রেলপথ মন্ত্রণালয় বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে। কারণ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ প্রকল্পের বিপরীতে চার হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করতে না পারলে রেলওয়ের এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রায় ৩১ শতাংশ কম হবে। এর ফলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা এবং পারফরম্যান্স প্রশ্নবিদ্ধ হবে।


রেলপথ মন্ত্রণালয়কে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ২১৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ করতে হবে। ২৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, ২ কিলোমিটার র‌্যাম্পস, ৬৬ বড় সেতু, ২৪৪টি কালভার্ট, একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯টি লেভেল ক্রসিং ও ৪০টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। ১৪টি নতুন স্টেশন বিল্ডিং নির্মাণের পাশপাশি ছয়টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন করার প্রস্তাব দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ১০০ ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়।
(খান এ মামুন)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

অর্থনীতি এর অারো খবর