বসে নেই হ্যাকাররা: বাংলাদেশ ব্যাংকে সাত দিনে ৫০০ সাইবার হামলা
বসে নেই হ্যাকাররা: বাংলাদেশ ব্যাংকে সাত দিনে ৫০০ সাইবার হামলা
২০১৭-০১-১১ ১৩:৪৮:১৪
প্রিন্টঅ-অ+


বসে নেই হ্যাকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ও ওয়েবসাইট লক্ষ্য করে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার-সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি আইপি অ্যাড্রেস লক্ষ্য করে পাঁচ শতাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্কে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে পাঁচ হাজারের বেশি হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সার্ভার এবং নেটওয়ার্ক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটওয়ার্কে প্রায় ১৮ হাজার হামলা হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানি হ্যাকারদের হামলার পরিমাণও বেড়েছে। দেশের সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, হামলার ধরন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, হ্যাকারদের সবচেয়ে কৌশলী হামলার লক্ষ্যবস্তু এখনও
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন সাইট। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ছোট-বড় সব দেশের গুরুত্বপূর্ণ সার্ভার ও নেটওয়ার্ক এবং ওয়েবসাইট লক্ষ্য করে হ্যাকাররা প্রতিনিয়তই হামলা চালাচ্ছে। তবে গত এক-দেড় মাসে বাংলাদেশের কোনো নেটওয়ার্কে চালানো হামলা সফল হয়নি। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় একটি হামলা সফল হলেও হ্যাকররা বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টির সুযোগ পেতে পারে বলে মত দেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পর সরকারের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং সরকারি সংস্থার সার্ভার ও সাইটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক করা হয়েছে। এখন সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতাও তৈরি হয়েছে। তবে

ব্যক্তিপর্যায়ে বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। কারণ অধিকাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সাইবার হামলা-সংক্রান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন নন। ফলে স্মার্টফোন থেকে ব্যাংকিংসহ আর্থিক লেনদেনই এখন সবেচেয় বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মত দেন তিনি।

এই কর্মকর্তার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, এটা খুবই সত্য যে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর বড় কারণ অসচেতনতা। এর ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে অসংখ্য ব্যবহারকারী একই সময়ে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে যে ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল সরকারি পর্যায়ে তা নেওয়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যে কারণে বিটিসিএলের ডোমেইন সার্ভার, তথ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট এখনও সহজে হ্যাকিংয়ের শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে সাইবার নিরাপত্তায় ফাঁক থেকেই যাবে এবং হ্যাকাররা যে কোনো মুহূর্তে সুযোগ নেবে।

হামলার ঝুঁকি বেড়েছে :পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, শুধু বাংলাদেশ নয়, সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হ্যাকারদের হামলা বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সার্ভার ও ওয়েবসাইট লক্ষ্য করে হামলার সংখ্যা বেড়েছে। কী পরিমাণ হামলা বেড়েছে তা সূত্র স্পষ্ট জানাতে না পারলেও এ ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় বিশ্বখ্যাত সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিসকোর সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে। তাদের ২০১৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিকভাবে এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে বিগত বছরের তুলনায় ৫৪ শতাংশ হামলা বেড়েছে। একই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। স্মার্টফোনে হামলার ঝুঁকি ও বৈচিত্র্য আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। ম্যালওয়ার হামলার ক্ষেত্রে উইন্ডোজ-নির্ভর কম্পিউটারে র‌্যানসওয়্যার নামে একটি নতুন ম্যালওয়ারের হামলার পরিমাণ ৬২ শতাংশ বলেও জানানো হয় প্রতিবেদনে।

পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, বাংলাদেশ লক্ষ্য করে বেশি হামলা হচ্ছে পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানি হ্যাকারদের হামলার পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। অন্যান্য অঞ্চল থেকে হামলা হলেও তার পরিমাণ কম। সবচেয়ে বেশি কৌশলী ও ক্ষতিকর হামলার লক্ষ্যবস্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় এ ব্যাংকের নিরপত্তা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত দৃঢ় এবং এ ক্ষেত্রে হামলা সফল হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।

স্মার্টফোনই বড় ঝুঁকি :সিসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্মার্টফোনে হামলার পরিমাণ এবং বৈচিত্র্য বাড়ছে। বিশেষ করে স্মার্টফোনের স্টোরেজে স্থায়ী ম্যালওয়ার প্রবেশ করানোর ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের ম্যালওয়ার প্রবেশ করার পর তা বেশিরভাগ সময়ই হ্যান্ডসেটে ইনস্টল করা নিরাপত্তা অ্যাপকেও দখলে নেয়, তখন ওই নিরাপত্তা অ্যাপ ম্যালওয়ার প্রতিরোধ করতে পারে না।

দুই মাস আগে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আদুপসের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি স্মার্টফোন থেকে তথ্য চুরির অভিযোগ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোওয়্যার। চীনা ব্রা্যন্ডের বিভিন্ন স্মার্টফোন থেকে ওটিএ সেবার ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের গোপন অ্যাপ ব্যবহার করে এই তথ্য চুরির অভিযোগ ওঠার পর আদুপ টেকনোলজিস বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চায়। একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, আইফোনের আইওএস প্ল্যাটফর্মের দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ। আর অ্যান্ড্রয়েড ফোন উৎপাদনকারী ব্র্যান্ডের মধ্যে একমাত্র কোরিয়ার কোম্পানি স্যামসাংয়ের স্মার্টফোনেই ইন বিল্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো ব্র্যান্ডের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর