অন্ধদের জন্য সাকিবের "ডিজিটাল চশমা"
অন্ধদের জন্য সাকিবের "ডিজিটাল চশমা"
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০১-০৫ ১৪:৪৫:৫৯
প্রিন্টঅ-অ+


ইংরেজি মাধ্যমে ‘ও’ লেভেলে পড়ছে নাজমুস সাকিব। উদ্ভাবন করেছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পথচলায় সহায়ক ডিজিটাল চশমা। জিতেছে প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যাওয়ার্ড। সারাবিশ্ব থেকে সাত ক্যাটাগরিতে সাতজনকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

দেশের তথ্য প্রযুক্তিতে তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়ে কথা হয় এই তরুণের সঙ্গে। নাজমুস সাকিব বলে, উন্নত দেশে উদ্ভাবনী কাজে সরকার সহায়তা করছে। আমাদের দেশেও এই সহায়তা রয়েছে। তবে সেটা খুবই কম। দেশে মেধাবী তরুণের ছড়াছড়ি। তবে গবেষণায় অনেক খরচ হয়। পরিবার, সমাজ এবং সরকারের সহায়তা না থাকলে উদ্ভাবনীতে তারুণ্যের সাফল্য পিছিয়ে যাবে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, নাজমুস সাকিব তখন হলি ফ্লাওয়ার মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বাসা ধানমন্ডির ১৫ নং-এ। পাশের ভবনে থাকে বীরশ্রেষ্ঠ নুর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আদিল। বন্ধুত্ব থাকায় মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যেত সাকিব। লিফটে ওঠার সময় দেখা হতো এক দাদুর। দাদু চোখে দেখতে পান না। ওয়াকস্ট্যান্ড নিয়ে চলাফেরা করেন। লিফটে ওঠার সময় সঙ্গী কাউকে পেলে বলতেন, আমাকে এ তলায় নামিয়ে দিও। সঙ্গী না থাকলে অনুমান করে বাটনে চাপ দিতেন। কখনো সঠিক ফ্লোরে নামতে পারতেন। কখনো ভুল ফ্লোরে চলে যেতেন।

দাদুর কষ্ট দেখে সাকিব ভাবে, অন্ধদের উপকারের জন্য কিছু করা যায় কি না? এমন কোনো চশমা; যা তাদের পথচলাকে সহজ করবে। শৈশব থেকেই সে ইলেক্ট্রনিক নিয়ে কাজ করে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করা ছোটমামা সায়ীদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী তাকে বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা দেন। মূলত তার কাছ থেকেই কম্পিউটারের ব্যবহার, সার্কিটের কাজ, সার্কিটের ডিজাইন, সেন্সর, ট্রানজিস্টর, মাইক্রোকনট্রোলার প্রভৃতির কাজ এবং ব্যবহার শিখেছে সাকিব। পরে ইন্টারনেট এবং বইপত্র থেকে নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।

কাজটি ছিল সাকিবের জন্য চ্যালেঞ্জের। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে লেন্স তৈরি— দুটোই একসঙ্গে চলতে থাকল। পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ থাকায় পরিবার থেকেও সহায়তা ছিল। দৃষ্টিসহায়ক লেন্সের ব্যবহার করতে অ্যাপ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় সাকিব। মোবাইল সামনে নিয়ে কমান্ড দিলে যেন কাজ হয়। অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও কীভাবে অ্যাপ তৈরি করতে হয়, জানত না। আর অ্যাপের সাহায্যে অন্ধদের পথচলায় সহায়ক কোনো লেন্স তখনো উদ্ভাবন হয়নি। আইডিয়া মাথায় নিয়ে হাতড়ে হাতড়ে এগোতে থাকে সাকিব। রাত জেগে কাজ করত। খেলাধুলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল।

একদিন যায়, দুদিন যায়। এভাবে কাজ এগোয়। লেন্স নিয়ে পরীক্ষা করে। কমান্ড দিলে কাজ করার কথা, দূরে কোনো বাধা থাকলে সঙ্কেত আসার কথা। কিন্তু সঙ্কেত আসে না। একটি, দুটি করে তেরোটি গ্লাস ব্যর্থ হওয়ার পর সাফল্যের দেখা মেলে। ২০১৪ সালে তার ১৪তম গ্লাস অনেকাংশে সফল হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তার ‘স্মার্ট কনট্রোলার গ্লাস’ চূড়ান্ত সফলতা পায়।

সাকিব জানায়, ‘ব্যর্থতা শব্দটি আমার অভিধানে নেই। কোনো কাজে হাত দিয়ে শেষ হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকি। একটি, দুটি করে তেরোটি লেন্স কাজ না করলেও হাল ছাড়িনি। দেড় বছর কাজ করার পর সফলতা পেয়েছি।’

সাকিবের এই ‘স্মার্ট কনট্রোলার গ্লাসে’র সাহায্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে। অবশ্যই ব্যক্তির সঙ্গে অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকতে হবে। সামনে ১ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত কোনো বাধা থাকলে তা ওই ব্যক্তিকে জানিয়ে দেবে এই ডিজিটাল চশমা। রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ চালু করে ‘আই ওয়ান্ট টু ক্রস দি রোড’ কমান্ড দিলে ১০ মিটার দূরে পর্যন্ত কোনো বাধা থাকলে তা জানিয়ে দেবে।

এ চশমায় আরেকটি ফিচার রয়েছে প্যারালাইজড বা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য। লাইট, ফ্যান, টিভিতে সেন্সর লাগিয়ে রেখে অসুস্থ ব্যক্তি ‘স্মার্ট কনট্রোলার গ্লাস’ পরে তাকালে কাজ করবে। আবার তাকালে বন্ধ হয়ে যাবে। কষ্ট করে সুইচ অন, অফ করতে হবে না।

জানা গেল, এর আগেও সাকিব পেয়েছে আরো নানা পুরস্কার। ২০১৪ সালে সাকিব বিসিএসআইআর আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রজেক্ট ক্যাটাগরিতে রানার্স আপ হয়েছে। ২০১৩ সালে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি কলেজ আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় জুনিয়র ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। এছাড়া ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় মেকানিক্যাল ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরস্কার জিতে নিয়েছে এই তরুণ উদ্ভাবক।
(বারেক কায়সার)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিশেষ প্রতিবেদন এর অারো খবর