কোয়াড বাইক উদ্ভাবন: লাল-সবুজ পতাকা উড়াতে চান রুয়েট স্বপ্নবাজরা
কোয়াড বাইক উদ্ভাবন: লাল-সবুজ পতাকা উড়াতে চান রুয়েট স্বপ্নবাজরা
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৭-০১-০৪ ১৪:০৯:৪৭
প্রিন্টঅ-অ+


‘শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। স্পন্সর খুঁজতে আমরা দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিয়েছি। প্রথম দিকে মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি ‘কোয়াড বাইক’ কী! কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাইকের ধারণা ছিল অনেকটাই নতুন। শেষ পর্যন্ত নিজেদের একাগ্র প্রচেষ্টা আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আমরা তা বানাতে সক্ষম হয়েছি’।

প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কঠিন লড়াইয়ের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন, উদ্ভাবনের নেশায় বিভোর ক্র্যাক প্লাটুনের টিম লিডার সুমিত কুমার। দুর্গম পথে চলাচলে সহায়ক কোয়াড বাইকটি তৈরি করে ফেলেছেন এই সুমিতরাই। যা বাংলাদেশের অটোমোবাইল জগতের উদ্ভাবনী ইতিহাসে প্রথম। তাই আবিষ্কারের মূল অবদানটা তাদেরই।

তবে কেবল উদ্ভাবনেই ক্ষান্ত হননি। এবার তারা কোয়াড বাইক নিয়ে ফর্মুলা ওয়ান প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়াতে চান তারা। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এক আসনের গাড়ির এই বিশেষ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। বর্তমানে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।

সুমিত কুমার জানান, তারা সবাই রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম থেকে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। রুয়েটের দুইজন ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজরের (অনুষদ উপদেষ্টা) সহযোগিতায় তারা দশজন মিলে প্রায় তিন মাসের প্রচেষ্টায় কোয়াড বাইকটি তৈরি করেছেন। গবেষণা পর্যায়ে থাকায় তাদের এই বাইকটি বানাতে খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। তবে এখন দেশের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে রিপ্রডাকশনে গেলে বাইকটির পেছনে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

বাইকটিতে একটি দেশি কোম্পানির ১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। ৬০ কিলোমিটার বেগে তাদের তৈরি কোয়াড বাইকটি পাহাড় বা দুর্গম অঞ্চলের মাটির রাস্তায় চলতে পারবে। এতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চারটি চাকা লাগানো হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে রুয়েটের মেশিন শপেই তৈরি করা হয়েছে এটি।

ক্র্যাক প্লাটুনের আরেক তরুণ উদ্ভাব শাফিন মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন, বাইকটি বানানোর পর গত বছরের ২২ অক্টোবর ভারতের তামিল নাড়ুতে অনুষ্ঠিত কোয়াড বাইক ডিজাইন চ্যালেঞ্জে আমাদের ক্র্যাক প্লাটুনের টিম অংশ নেয়। এতে ২৩ ফাইনালিস্টের সঙ্গে লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। সঙ্গী ছিল নিজেদের তৈরি এই কোয়াড বাইকটি।

শাফিন জানান, বাংলাদেশে তারাই প্রথম কোয়াড বাইক তৈরি করেছেন। বর্তমানে এটির আরও অত্যাধুনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য ডিজাইনেও পরিবর্তন আনতে চাইছেন। তবে এজন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তাই তারা এখন বড় স্পন্সর খুঁজছেন।

rajshahi-quad-car-picture-4এ ছাড়া তাদের উদ্ভাবিত প্রজেক্ট নিয়ে এরই মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী তাদের অগ্রযাত্রায় খুশি হয়েছেন এবং প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনার জন্য তাদের সময় দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

ভিশন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মুসা মাহমুদ রানা নামের তরুণ উদ্ভাবকদের আরও একজন জানান, তাদের স্বপ্নের কথা। বলেন, অটোমোবাইল জগতে তারা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন ব্র্যান্ড করতে চান। এজন্য দেশের শিল্পোউদ্যোক্তরা এগিয়ে আসলে তাদের এই পথ চলা আরও মসৃণ হবে। এটি তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।

মুসা মাহমুদ রানা জানান, সবার নজর কাড়তে এবার তারা জার্মানিতে অনুষ্ঠিতব্য ফর্মুলা ওয়ানে অংশ নিতে যান। ফর্মুলা ওয়ান এফ ১ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ। ইন্টারন্যাশনাল অটোমোবাইল ফেডারেশন (এফআইএ) চক্রাবৃত্তে এই ফর্মুলা ওয়ান ক্রীড়া প্রতিযোগিতাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি গাড়ি প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এবার সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে চান তারা।

টিমের সাংগঠনিক নাম উচ্চারণ করে সুমিত কুমার দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করে ওই সময় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল।

এজন্য মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তাদের টিমের নামও ক্র্যাক প্লাটুন রাখা হয়েছে। তাদের লড়াই হচ্ছে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দেখতে চান। এর প্রথম সিঁড়ি হচ্ছে ফর্মুলা ওয়ান।

তাদের বিশ্বাস সেখানে দেশের তৈরি কোয়াড বাইক নিয়ে অংশ নিতে পারলে তারা বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করতে পারবেন। এজন্য আরও একটি কোয়াড বাইক তৈরি করতে হবে।

এ ছাড়া ট্রান্সপোর্ট ও প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণের জন্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন। তারা সবাই ছাত্র। কোথা থেকে এতো টাকা জোগাড় হবে তা জানা নেই তাদের।

কেবল মনের জোরেই এগিয়ে চলেছেন তারা। হয়ত এই স্বপ্ন কোনো না কোনোভাবে বাস্তবে রূপ নেবে এমনটাই প্রত্যাশা রাজশাহী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ও মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে গড়া টিম ক্র্যাক প্লাটুনের।

বিষয়টি নিয়ে রুয়েট উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ রফিকুল আলম বেগের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ছাত্ররা রুয়েটের পৃষ্ঠপোষকতায় কোয়াড বাইকটি তৈরি করেছে। এখন তারা জার্মানিতে ফর্মুলা ওয়ানে অংশ নিতে চাইলে অনেক অর্থের প্রয়োজন। আর তাদের সরকারি নীতিমালা মেনে চলতে হয়। বিষয়টি নিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। জানালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিজ্ঞান প্রযুক্তি এর অারো খবর