গোয়েন্দা সরঞ্জামের অবাধ বেচাকেনা অনলাইনে
গোয়েন্দা সরঞ্জামের অবাধ বেচাকেনা অনলাইনে
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-১২-০৩ ০৭:২৫:২১
প্রিন্টঅ-অ+


মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের সঙ্গে বাজার ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর ধরে মানুষের কেনাকাটায় যুক্ত হয়েছে অনলাইন শপিং, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বলা যায়, প্রতিদিনই নতুন ক্রেতা ও বিক্রেতা বা উদ্যোক্তা যোগ হচ্ছেন এ ব্যবস্থায়। তবে বিপণন খাতের নতুন এই ব্যবস্থায় নজরদারি তেমন নেই। কে কোথায় বসে কী পণ্য বিক্রি করছেন, তার কোনো হিসাব থাকছে না কোথাও। সম্প্রতি দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা অনলাইন মার্কেট ও মার্কেট প্লেসে অবাধে গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত স্পর্শকাতর ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস কেনাবেচা হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থাটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক প্রতিবেদনে দেশের ৫৭টি অনলাইন মার্কেট ও মার্কেট প্লেসের তালিকা দিয়েছে। যেখানে অবাধে গোয়েন্দাকাজে ব্যবহৃত হয় এমন সব ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস কেনাবেচা হচ্ছে। এসব অনলাইনে স্পাই বা গোপন ক্যামেরাযুক্ত কলম, চশমা, চাবির রিং, অ্যাশট্রে, লাইটার, ঘড়ি, বোতাম, অ্যালার্ম ঘড়ি, বেল্ট, এয়ারফোন, আইডি কার্ড হোল্ডার, এয়ারফ্রেশনার, ক্যালকুলেটর, ভ্যানিটি ব্যাগ, মগ, অ্যাডাপটার ও পাওয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন সামগ্রী অবাধে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে ড্রোন খেলনা, রোবট, অ্যান্টেনা, বেজস্টেশন ইত্যাদি। এগুলোর দামও নাগালের মধ্যে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় রাষ্ট্র ও জনসাধারণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশে অনলাইন মার্কেট হিসেবে জনপ্রিয় সব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে ওই তালিকায়। একই প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, এসব মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও এনএসআইর প্রধানদের কাছে পাঠিয়েছে সংস্থাটি।

গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, এ ধরনের ক্যামেরা সাধারণত সন্দেহভাজন ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির চলাফেরা পর্যবেক্ষণ এবং কারোর জিজ্ঞাসাবাদ বা কথোপকথনের দৃশ্য ও শব্দ গোপনে ধারণ করার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যবহার করা হয় গোপন ক্যামেরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। স্পাই ক্যামেরাযুক্ত সামগ্রী দেখে বোঝার উপায় নেই যে বস্তুগুলোতে গোপন ক্যামেরা রয়েছে। এজন্য খুব সহজে যে কোনো জায়গা থেকেই এসব সামগ্রী ব্যবহার করে ভিডিও রেকর্ড করা যায়। কেউ তার চশমা পরে অন্যের সামনে দাঁড়িয়ে তার অঙ্গভঙ্গি, কথোপকথন রেকর্ড করতে পারবেন। একইভাবে পকেটে রাখা কলম, হাতে থাকা লাইটার বা ঘড়ি, চাবির রিং, টেবিলে থাকা অ্যাশট্রের মাধ্যমেও রেকর্ড হয়ে যেতে পারে সব। সামান্য জায়গায় এই ক্যামেরা বসানো যায়। খেলনা ড্রোন পাঠিয়ে দূর থেকে অন্যের ঘরের দৃশ্য ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। অ্যান্টেনার মাধ্যমে দূর থেকে অন্যের ওপর নজরদারি বা আলাপ-আলোচনা জানা যেতে পারে। এসব ডিভাইস গোয়েন্দারা ব্যবহার করে থাকেন।

কিছু দিন আগে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক কর্মী গোপনে বাথরুমে এক নারী রোগীর ভিডিও ধারণ করে এ রকম গোপন ডিভাইসের মাধ্যমে। এর আগে সিলেটের মুন্সীপাড়া থেকে শাহরিয়ার রিপন নামের একজনকে আটক করে র‌্যাব। রিপন গোপনে নারীদের ভিডিও ধারণ করে প্রতারণা করত। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে ধারণ করা তারকাদের অনেকের ব্যক্তিগত কার্যকলাপের ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ভিডিও ধারণে মোবাইল ফোনের ক্যামেরার পাশাপাশি স্পাই ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। অনেকে গোপন ক্যামেরায় ছবি ধারণ করে তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল বা প্রতারণা করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব ছবি। সম্প্রতি একটি ফেসবুক গ্রুপ ডেসপারেটলি সিকিং- আনসেন্সরডের (ডিএসইউ) তিনজন অ্যাডমিনকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নারীদের সম্মানহানি করার অভিযোগে জোবায়ের আহমেদ, তৌহিদুল ইসলাম অর্ণব ও মো. আসিফ রানাকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে রাজধানীর একটি নামকরা বিউটি পার্লারের স্পা সেন্টারে গোপন ক্যামেরা দেখতে পান একজন গ্রাহক। ওই সময় গোপন ক্যামেরার ব্যবহার ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।

গোয়েন্দাদের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, সমাজে বিভিন্ন মানসিকতা ও উদ্দেশ্যের মানুষ রয়েছে। এ ধরনের পণ্য সহজলভ্য হলে তারা এসবের অপব্যবহার করতে পারে, যা ব্যক্তি স্বাধীনতা বা মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনলাইন মার্কেট ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সমকালকে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ই-কমার্স বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে আইসিটি বিভাগ। নীতিমালায় এসব বিষয়ে করণীয় উল্লেখ থাকবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ তথ্য ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, এ ধরনের পণ্য সহজলভ্য হয়ে গেলে তার অপব্যবহার হবেই। এতে সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা ও বিশ্বস্ততা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। বিশেষ কাজে ব্যবহারের জন্য এ ধরনের বিশেষায়িত পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমতি থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ সমকালকে বলেন, গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত পণ্য কোনোভাবেই অবাধে কেনাবেচা হওয়া ঠিক না। এতে রাষ্ট্র তথা মানুষের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে এসব পণ্যের বেচাকেনা হওয়া উচিত।

দেশের অনলাইন মার্কেট ও মার্কেট প্লেসগুলোর সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি রাজীব আহমেদ সমকালকে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের পর সংগঠনের পক্ষ থেকে সব সদস্যকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পণ্য কেনাবেচা না করতে। তারপর থেকে এ ধরনের পণ্যের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। এর পরও কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের পণ্য কেনাবেচা করলে সংগঠনের পক্ষ থেকে যতটা ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা নেওয়া হবে।

অনলাইন কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণে আনলেই এ সমস্যার সমাধান হবে তা নয়। গুগল প্লেতে স্পাই ক্যামেরার অ্যাপস পাওয়া যাচ্ছে সহজে। এই অ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইলের কামেরা হয়ে যাচ্ছে স্পাই ক্যামেরা। যে মোবাইলে এই অ্যাপস থাকবে, সেটি যদি ইন্টারনেটযুক্ত হয় তাহলে ক্যামেরা ওপেন না করেও বিশেষ নির্দেশক ব্যবহার করে ভিডিও করা সম্ভব। আর এই ভিডিওগুলো মোবাইল সেটের কোথাও থাকবে না, চলে যাবে একটি ই-মেইল অ্যাকাউন্টে। এ ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিজ্ঞান প্রযুক্তি এর অারো খবর