জলবায়ু পরিবর্তন: বিরূপ প্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত উপকূল
জলবায়ু পরিবর্তন: বিরূপ প্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত উপকূল
২০১৫-১১-৩০ ১৬:১৭:১৬
প্রিন্টঅ-অ+


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ায় দুর্যোগ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতি হচ্ছে উপকূলীয় বনভূমিসহ কৃষি জমির। মরে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি। বাড়ছে লবণ পানির প্রভাব, কমে যাচ্ছে জমির ফসল।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দিন দিন শ্বাসমূলীয় বনভূমিতে মরে যাচ্ছে অসংখ্য গাছপালা। সাগর তীরবর্তী উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মধ্যে বরগুনা জেলায় রয়েছে টেংরাগিরি বনাঞ্চলের অধীন নিশানবাড়িয়া, সখিনা ও নলবুনিয়ার বাবুগঞ্জ, পাথরঘাটার হরিণঘাটা, লালদিয়া, চরলাঠিমারা বনাঞ্চল।

বন বিভাগ বলছে, শ্বাসমূলীয় এসব বনে গাছের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে শ্বাসমূলে বালু জমে যাওয়া ও ভূমিক্ষয়। প্রবল ঢেউয়ে উপকূলে পাড় ভাঙছে, গাছের গোড়ার মাটি ও বালু সরে গিয়ে শিকড় শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে এসব শ্বাসমূলীয় গাছ ঠিকভাবে অক্সিজেন নিতে না পারায় পাতা হলুদ হয়ে প্রথমে সজীবতা হারায়, পরে মরে বিবর্ণ হয়ে যায়।

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে নদ-নদীতে পলি জমা হয়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। ফলে নদী হারাচ্ছে নাব্যতা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার প্রধান নদীগুলোতে ছোট-বড় অনেক ডুবো চর রয়েছে। যার কারণে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে নদীর সংযোগের খালগুলোও। তাই স্বাভাবিক জোয়ারে পানি বৃদ্ধির পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পাশাপাশি বেড়েছে নদী ভাঙন।

এছাড়া দিন দিন পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। উপকূলীয় এলাকায় এখন বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটও দেখা দিয়েছে জলবায়ুর প্রভাবে। নদীর পানি থেকে শুরু করে লবণ পানি উঠছে গভীর নলকূপ থেকেও। এ কারণে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগের প্রভাব।

কৃষির ওপরেও প্রভাব পরেছে জলবায়ু পরিবর্তনের। মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কমে যাচ্ছে ফসলি জমির ফসল।

কৃষি বিভাগ বলছে, রবি মৌসুমে নদীর পানিতে লবণ থাকায় কৃষকরা ঠিকমত সেচ কাজে পানি ব্যবহার করতে পারছে না। তাই এই মৌসুমে চাহিদা মতো ফসল পাচ্ছেন না কৃষকরা।

নিশানবাড়ীয়া গ্রামের আবদুল মালেক বলেন, ‘এখন খাবার পানির জন্য গ্রাম পার হয়ে যেতে হয় অন্য গ্রামে। নদী আর গভীর নলকূপের পানিতে লবণ উঠে তাই ওই পানি খাওয়া যায় না। পাশের গ্রামের ফিল্টার থেকে পানি আনেন তারা।

শহিদুল নামের এক উন্নয়ন কর্মী বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন আর আগের মতো ছয় ঋতুর দেশ নেই। এখন মনে হয় ৪ ঋতু। যখন তখন বৃষ্টি আবার খরা। তবে গরমও আগের তুলনায় অনেক বেশি।’

জাহাঙ্গীর নামের এক জেলে জানান, সাগরে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। জাল ফেলে দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেও মিলছে না মাছের দেখা। পাঁচ বছর আগে সাগরে জাল ফেলে দু’দিন অপেক্ষা করলে প্রচুর মাছ ধরা পড়ত।

মনসাতলী গ্রামের কৃষক শিপন গাজী বলেন, ‘সময় মতো চাষের পানি পাওয়া যায় না। নতুন নতুন রোগ লেগেই আছে, কোনও বালাইনাশকেও কাজ হচ্ছে না।’

বরগুনা বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. আলতাফ হোসেন বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে অনেক গাছ ঝুঁকিতে রয়েছে। মাটিতে লবণ বেড়ে যাওয়ায় বেশ কিছু প্রজাতির গাছের বৃদ্ধি আগের মতো আর হয় না।

বরগুনা সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূল। জীববৈচিত্র্য রয়েছে হুমকির মুখে। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক গাছপালা, উদ্ভিদসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও পশু পাখি।

তিনি বলেন, খুদে বরলা নামের উদ্ভিদ এখন বিলুপ্ত প্রায়। এটি কেবল বাংলাদেশেই পাওয়া যেত। এছাড়াও তালিপাম, পাতা ঝাঝি, করুদ এখন বিলুপ্তির পথে। প্রাণীর মধ্যে ঘড়িয়াল, নীলগাই, রাজ শকুনের দেখাই মিলছে না। একইসঙ্গে নদীতে লবণ পানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মিঠা পানির মাছও হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূল।
(তরিকুল রিয়াজ)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিশেষ প্রতিবেদন এর অারো খবর