মার্কিনিদের প্রমাণ করার সময় তারা গাধা নয় তারা হাতি!
মার্কিনিদের প্রমাণ করার সময় তারা গাধা নয় তারা হাতি!
শেখ তাজুল ইসলাম তুহিন
২০১৬-১১-০৭ ০৩:২৭:১১
প্রিন্টঅ-অ+


কলম্বাস আম্রিকা আবিষ্কার করছিলেন। তবে ভুলে করে। কলম্বাস বের হইছিলেন ভারতের সন্ধানে, তিনি আটলান্টিক মহাসাগরে কিছু দ্বীপ দেখে মনে করছিলেন এটাই ইন্ডিয়া। তাই ভুল করে সেই দ্বীপের নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে গেছে। আর আম্রিকার আদিবাসীদের নাম হয়ে গেছে রেড ইন্ডিয়ান। ভুল করে কলমবাস আম্রিকা আবিষ্কার করে পুরো পৃথিবীকে বাঁশ দিয়ে গেছেন। এইবার আম্রিকানদের পালা। "গাধা" প্রতীকে লড়াই করা হিলারি আর "হাতি" প্রতীকে লড়াই করা ট্রাম্প কে কাকে বাঁশ দিবে তা নির্ধারণ হবে ৮ ই নভেম্বর। তবে এই বাঁশ দেওয়ার প্রক্রিয়াটা খুবই জটিল।

৮ ই নভেম্বর মার্কিনিরা ভোট দিবেন। সবার ধারণা তারা হিলারি কিংবা ট্রাম্পকে ভোট দিবেন। ভুল ধারণা। মার্কিনিরা ৮ ই নভেম্বর ভোট দিবে ইলেক্টোরাল কলেজকে। ইলেক্টোরাল কলেজ হলো নির্বাচক মণ্ডলী, যার সদস্যরা রাজ্যগুলোর বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মী। যারা নির্বাচিত হবেন সাধারণ জনগণের ভোটের মাধ্যমে।

৮ ই নভেম্বরের ভোটে যেসব ইলেক্টোরাল কলেজ নির্বাচিত হবেন, তারা ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় বুধবারের পর প্রথম যে সোমবার আসবে অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর নিজ নিজ রাজ্যের রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে ভোট দিবেন। তারপরই শুরু হবে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া। সেই ভোট গণনা করা হবে পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৬ই জানুয়ারি। বিজয়ী প্রার্থী শপথ গ্রহণ করবেন ২০ জানুয়ারি। অর্থাৎ মার্কিন নাগরিকরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন না, তারা নির্বাচন করেন ইলেক্টোরাল কলেজ আর এই ইলেক্টোরাল কলেজরা পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। আমাদের দেশে যারা সংসদ সদস্য বা এমপি আম্রিকাতে সেটা ইলেক্টোরাল কলেজ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একই সাথে সরকার প্রধান, রাষ্ট্র প্রধান এবং সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ।

আমেরিকাতে মোট রাজ্য ৫০টি। ৫০ টি অঙ্গরাজ্যে মোট ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। যিনি ২৭০ টি ইলেক্টোরাল ভোট পাবে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। যদি কেউ ২৭০ টি ইলেক্টোরাল ভোট না পায়, তাহলে প্রথম তিন জন প্রার্থীর মধ্য থেকে প্রতিনিধি সভার গোপন ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোন প্রার্থী ৫১% ভোট পেলেও লাভ হবে না! যদি না সে প্রার্থী ২৭০ ইলেক্টোরাল ভোট না পায়। ২০০০ সালে ডেমোক্রেট প্রার্থী “আল গোর” ভোট বেশি পেয়েও জর্জ বুশের কাছে হেরে যান। কারণ জর্জ বুশের "ইলেক্টোরাল ভোট" বেশি ছিল, অন্যদিকে আল গোর মানুষের ব্যাপক সমর্থন এবং বেশি ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারে নি!

নির্বাচনে মূল দল দুটি-

১।ডেমোক্রেট-
প্রতীক – গাধা। প্রার্থী - হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন।

২।রিপাবলিকান
প্রতীক – হাতি। প্রার্থী - ডোনাল্ড জন ট্রাম্প।

হিলারি হচ্ছে গাধা, ট্রাম্প হচ্ছে হাতি।

সাধারণত উচ্চ আয়ের লোকজন, ৩০ এর নিচে বয়স, কলেজ গ্র্যাজুয়েট, প্রটেস্ট্যান্টরা রিপাবলিকানদের বেশি পছন্দ করে। তবে এবার নিম্ন আয়ের অনেকেই রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে আছে। অন্যদিকে, বয়স্ক, ক্যাথলিক, স্কুল শিক্ষিত নিম্ন আয়ের লোকজন ডেমোক্রেটদের বেশি পছন্দ করে!

কে হোয়াইট হাউজের চাবি হাতে পাবে তা নির্ভর করবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যার উপর। কারণ কোন রাজ্যে যদি কোন দলের প্রার্থী জয় পায় তাহলে সে অঙ্গরাজ্যের সব ইলেক্টোরাল ভোট চলে যাবে সেই দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পকেটে। অর্থাৎ টেক্সাস রাজ্যে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল জয় পায় তাহলে সেখানকার ৩৪ টি ইলেক্টোরাল ভোট সরাসরি চলে যাবে ট্রাম্পের পকেটে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় “উইনার টেক অল”।

সেক্ষেত্রে নিউইয়র্ক, টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য হিলারি-ট্রাম্প দুজনের জন্যই এসিড টেস্ট। এই ৪টি রাজ্যেই আছে ১৪৭ "ইলেক্টোরাল" ভোট। ৪ টি রাজ্যে ট্রাম্প-হিলারি দুজনই “নেক টু নেক” পাল্লা দিচ্ছে!

বাকি থাকে আরও ৪৬ টি রাজ্য। এই ৪৬ টি রাজ্যের অনেক রাজ্যই ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্রেট অথবা রিপাবলিকানরা জয় পেয়ে আসছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হতে চাইলে জিততে হবে সুয়িং স্টেট বা ব্যাটেলগ্রাউন্ড বলে বিবেচিত রাজ্যগুলোতে। কলোরাডো, নেভাডা, নিউ হ্যাম্পশায়ার,মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া, উইসকনসিনের মত রাজ্যগুলোতে। এসব রাজ্যকে মূলত ব্যাটেল গ্রাউন্ড হিসেবে ধরা হয়। যেখানে ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা প্রায় ১৫০। এই রাজ্যগুলোর বেশীরভাগ ইলেক্টোরাল কলেজের সংখ্যা যার দিকে বেশি যাবে তাঁর হোয়াইট হাউজের টিকেট কনফার্ম।

একটা মজার বিষয় হচ্ছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ওহাইও রাজ্যে যে দল বা প্রার্থী জয় পেয়েছে তিনিই প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউজের চাবি পেয়েছে। এখন পর্যন্ত আগাম ভোট দেওয়া বুথ ফেরত জরিপে ডোনাল্ড ট্রাম্প হিলারির চেয়ে এগিয়ে আছে ওহাইও রাজ্যে...

এতদিন পর্যন্ত মিডিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হিলারিকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এবার পর্দায় আবির্ভুত হয়েছেন “কিলারি”। হয়ত তিনিই শেষ মুহুর্তে হিলারির কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিবেন! যদি হিলারি নির্বাচনে হেরে যায় তাহলে দায়ী থাকবেন “কিলারি”! বর্তমানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেওয়ার পিছনে মূল কারিগর হচ্ছেন কিলারি। তিনি আর কেউ নন, জেমস কোমি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিস্টিক ইন্টিলিজেন্স এন্ড সিকিউরিটি সার্ভিস FBI এর প্রধান জেমস কোমি। ভোটের মাত্র ১০ দিন আগে হিলারির ই-মেইল কেলেংকারি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন FBI বস জেমস কোমি। সে জন্য মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের অনুমতিও লাভ করেন। নিম্নকক্ষে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই অনুমতি লাভে বেগ পেতে হয় নি!

মনস্তাত্ত্বিকভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে গেছেন। হিলারিকে নাকানি চুবানি খাইয়ে দিশেহারা করার ক্রেডিট ট্রাম্প নিতেই পারে। সে কারণেই হিলারির পক্ষে বারাক ওবামা, মিশেল ওবামা, গায়ক গায়িকা সবাই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

গতকাল হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় গান গেয়ে শোনান সঙ্গীত শিল্পী বিয়েন্স। তার কিছুক্ষণ পর পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প হিলারিকে কটাক্ষ করে বলেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আমার গিটার-পিয়ানোর দরকার নেই, দরকার ভোট :P

ট্রাম্পের জন্য প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে "অস্ত্র ব্যবসায়ী" এবং "ঔষুধ" ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা। আম্রিকার রাজনীতিতে “অস্ত্র” ব্যবসায়ী” এবং “ঔষুধ” ব্যবসায়ীরা খুব প্রভাবশালী। আম্রিকাতে চাইলেই অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া যায়,এ কারণে সেখানে প্রচুর মানুষ মারা যায় প্রতিবছর। হিলারি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে, অন্যদিকে ট্রাম্প আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে। আবার ওবামার “স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার বিল” পাস করার ফলে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ অধিবাসী স্বাস্থ্য বীমা লাভ করে। যাদের খরচ এখন সরকারী অর্থেই মিটে। কিন্তু লস হয়ে গেছে বেসরকারি ঔষুধ শিল্পের বড় বড় ব্যবসায়ীদের। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট হলে ওবামার স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করা হবে। যার কারণে অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং ঔষুধ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের সমর্থনটা ট্রাম্প পাচ্ছে বলে মনে করা হয়।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্প চাইলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রিপাবলিকানরা ২৮ বার, ডেমোক্রেটরা ২১ বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে। দেখার বিষয় মার্কিনীরা কাকে বেছে নে! গাধা হিলারি, না হাতি ট্রাম্পকে। তবে হাতি যদি গাধার উপরে উঠে যায় সে অবস্থা চিন্তা করা সমীচীন হবে না :P

হিলারির সমর্থক গোষ্ঠী এতোদিন নিশ্চিত বিজয় জেনে গা ছাড়া ভাবে ছিল। কিন্তু ট্রাম্প শপথ করেই মাঠে নেমেছে “বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সূচ্যগ্র মেদিনী”।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে “অক্টোবর সারপ্রাইজ” বলে একটা টার্ম আছে। যেহেতু সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৪ বছর পর নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার নির্বাচন হয়, তাই সারপ্রাইজটাকে নভেম্বরের আগের মাস “অক্টোবর সারপ্রাইজ” বলা হয়। নির্বাচনের আগে সাধারণত যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে তার পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়, তাকেই "অক্টোবর সারপ্রাইজ" বলা হয়! যদি অক্টোবর সারপ্রাইজ ঘটে তাহলে ট্রাম্প জয়ী, আর যদি তা না ঘটে তাহলে গাধা হিলারি জয়ী হবে! মার্কিনিদের প্রমাণ করার সময় তারা গাধা নয় তারা হাতি!

প্রজেক্ট লেনিন
১১/৬/২০১৬...


https://www.facebook.com/lenin.oprostut/posts/1350266808331134

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফেসবুক থেকে এর অারো খবর