উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব: সুরের খেলায় নির্ঘুম রাত
উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব: সুরের খেলায় নির্ঘুম রাত
সংগীতা ঘোষ
২০১৫-১১-২৯ ০৫:০৭:০৬
প্রিন্টঅ-অ+


পুরোদমে শীত আসতে আরও কিছু দিন বাকি। তার পরও শেষ বিকেল থেকেই আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন। সন্ধ্যাটা কেমন যেন ঘোর-লাগা। রাত একটু গভীর হলেই টুপটাপ ঝরছে শিশির। প্রকৃতির এমন আয়োজনে এবারও রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব। গতকাল শনিবার ছিল দ্বিতীয় দিনের আয়োজন।

সন্ধ্যায় শুরু হয়ে একটানা ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসের ওপর স্থাপিত বিশাল মঞ্চে ছিল সুর-তালের খেলা। ছিল সুর-তালের সঙ্গে নাচ বা গানে গলা মিলিয়ে উল্লাস। কখনও সুরের মূর্ছনা, কখনও বাজনার তাল, আবার কখনও লয়ের নান্দনিক পরিবেশনা- যা শ্রোতাকে নিমগ্ন রেখেছে সুরের গভীরে। প্রায় ১০ ঘণ্টা সুরের খেলায় বিভোর সময় পার করেছেন শ্রোতারা। শিল্পীরাও উজাড় করে দিয়েছেন তাদের সবটুকু।


উৎসবের দ্বিতীয় দিনের আয়োজনের শুরুতে ধ্রুপদ পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের অভিজিৎ কুণ্ডু। পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকরের কাছে তালিম নেওয়া এই শিল্পী একটি মাত্র রাগ ভুপালি পরিবেশন করেন। শিল্পীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন তার গুরু পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর। উৎসবে নতুন সংযোজন সরস্বতী বীণা। এই বীণার সুরে মুগ্ধতা ছড়ান উপমহাদেশের প্রখ্যাত গুরু পদ্মাবতী অনন্ত গোপালান ও ড. এস বালাচন্দরের কাছে বীণায় তালিম নেওয়া ভারতের শীর্ষস্থানীয় বীণাবাদক জয়ন্তী কুমারেশ। ঘড়ির কাঁটায় যখন রাত পৌনে ৮টা। তখন এই শিল্পী মঞ্চে আসেন।

পরম মমতায় কোলের ওপর রাখেন বাদ্যযন্ত্রটি। তারপর দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ছন্দে ছন্দে জয়ন্তীর ১০টি আঙুল ঘুরে বেড়ালো বীণার ওপর। তুললেন সুরেলা ধ্বনি। পৌনে এক ঘণ্টাব্যাপী বাদনে একে একে উপস্থাপন করলেন দক্ষিণ ভারতের রাগ কাফিসহ নানা আঙ্গিকের রাগ-রাগিণী। পরে জয়ন্তী কুমারেশের হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের সহধর্মিণী মহুয়া খায়ের। সুস্মিতা দেবনাথ এসেছিলেন তৃতীয় পরিবেশনা নিয়ে। ৪৫ মিনিটের পরিবেশনায় শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন ইফতেখার আলম প্রধান, হারমোনিয়ামে বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী। এরপর ধ্রুপদ পরিবেশন করেন ভারতের নেতৃস্থানীয় ধ্রুপদ শিল্পী পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর। এই শিল্পীকে পাখোয়াজে সঙ্গত করেন প্রতাপ আওয়াদ। শিল্পীর হাতে উৎসব স্মারক তুলে দেন স্কয়ার টয়লেট্রিজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারপারসন রত্না পাত্র।

দ্বিতীয় দিনের পঞ্চম পরিবেশনা ছিল একক তবলা বাদন। কর্ণাটকী সঙ্গীত ও হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তালতত্ত্বের বিশেষ পণ্ডিত সুরেশ তালওয়ালকর তবলার বোল আর পাখোয়াজের তালের সমন্বয়ে মোহনীয় সুর-মূর্ছনায় শ্রোতাদের বিভোর করেন। ভারতের স্বনামধন্য এই শিল্পীকে তবলায় সঙ্গত করেন সাভানি তালওয়ালকর, পাখোয়াজে ওমকার দালভি, কণ্ঠে বিনয় রামদর্শন ও হারমোনিয়ামে অজয় যোগেলকর। প্রথমবারের মতো উৎসবে এসেছেন খ্যাতিমান কর্ণাটকী কণ্ঠশিল্পী পদ্মবিভূষণ ড. বালমুরালীকৃষ্ণ। তিনি এবারের প্রবীণতম শিল্পী। তার সঙ্গে বাঁশিতে যুগলবন্দিতে অংশ নেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড নমিনি পণ্ডিত রণু মজুমদার। ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্করের কাছে তালিম নেওয়া বংশীবাদক পণ্ডিত রণেন্দ্রনাথ মজুমদার, যিনি রণু মজুমদার নামে বেশি পরিচিত এবং বেহালা, ভিওলা, খঞ্জিরা, বীণা ও মৃদঙ্গম বাদনে পারদর্শী ভারতের জাতীয় শিল্পী বালমুরালীকৃষ্ণের যুগলবন্দি পরিবেশনা। এস্রাজ বাজিয়ে শোনান ভারতের উদীয়মান এস্রাজ শিল্পী শুভায়ু সেন মজুমদার। তাকে তবলায় সঙ্গত দেন অভিজিৎ ব্যানার্জি। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের উৎসবে টানা চতুর্থবার এসেছেন পাতিয়ালা ও কাসুর ঘরানার প্রখ্যাত পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। তার খেয়াল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান।

প্রথম রজনীর মধ্যরাতের আয়োজন: উদ্বোধনী রজনীর তৃতীয় শিল্পী ছিলেন জয়াপ্রদা রামমূর্তি। তাকে বাঁশিতে সঙ্গত করেন সুভাষ শালা, বেহালায় চক্রপাণি গাঙ্গুলাকুর্থি, মৃদঙ্গমে বালা সুব্রামানিয়াম পারুপলি। পঞ্চম শিল্পী ছিলেন সন্তুর শিল্পী রাহুল শর্মা। কৌশিকী চক্রবর্তী রাগ মালকোশ দিয়ে তার পরিবেশনা শুরু করেন। প িত কুশল দাস সেতারে রাগ হেমন্ত এবং পাহাড়ি রাগে একটি ধুন বাজিয়ে শোনান। প্রথম রজনীর শেষ পরিবেশনা ছিল কর্ণাটকী সঙ্গীতের প্রখ্যাত শিল্পী বিদুষী বম্বে জয়শ্রীর।

আরও কিছু তথ্য:
অনলাইনে নিবন্ধন করে যারা পাস সংগ্রহ করেছেন তারাই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন। উৎসবস্থলে কোনো পাস পাওয়া যাচ্ছে না। উৎসবের প্রবেশের দ্বার বন্ধ হচ্ছে রাত ১টায়। উৎসবে যোগদান এবং ফিরতে শাহবাগ, ধানমণ্ডি (ঢাকা সিটি কলেজ), গোপীবাগ (সায়েদাবাদ), মিরপুর ১২ (পল্লবী) ও উত্তরার আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা রেখেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে বিআরটিসির আটটি দ্বিতল বাস।


তৃতীয় দিনের আয়োজন:
আজ রোববার উৎসবের তৃতীয় দিনের অধিবেশন শুরু হবে যথারীতি সন্ধ্যা ৭টায়। সূচনায় পরিবেশিত হবে নৃত্যশিল্পী ওয়ার্দা রিহাব ও তার দলের মণিপুরি নাচ। এদিন ধ্রুপদ পরিবেশন করবেন ওস্তাদ ওয়াসিফ ডাগর। সরোদ বাজিয়ে শোনাবেন ইউসুফ খান। ভারতের সিংগিং ভায়োলিনখ্যাত এন রাজমের নেতৃত্বে কর্ণাটকী ধারার তিন প্রজন্মের তিন শিল্পী সুর তুলবেন বেহালায়। খেয়াল পরিবেশন করবেন বিদুষী শ্রুতি সাদোলিকর। তৃতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ গুরু কড়াইকুডি মানি। তিনি পরিবেশন করবেন মৃদঙ্গ। সবশেষে মঞ্চে আসবেন বিদুষী শুভা মুডগাল। তিনি পরিবেশন করবেন খেয়াল।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিনোদন এর অারো খবর