মিয়ানমারে আজ ঐতিহাসিক নির্বাচন
মিয়ানমারে আজ ঐতিহাসিক নির্বাচন
২০১৫-১১-০৮ ০৯:৩০:২৭
প্রিন্টঅ-অ+


বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আজ মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত আড়াই দশকের মধ্যে দেশটিতে এটাই প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন। মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম, এই নির্বাচনে সু চির অংশগ্রহণ, এশিয়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য, চীনের প্রভাব এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুসহ এমন অনেক কারণেই গোটা বিশ্বের নজর এখন মিয়ানমারের দিকে। সংবাদসূত্র : বিবিসি, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ইনডিয়ান এক্সপ্রেস, ইউএস নিউজ

আজকের এই পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৯১টি দলের ছয় হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে নির্বাচনে প্রধান দুটি দল হচ্ছে ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডি) এবং বিরোধী দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। নির্বাচনে মোট বৈধ ভোটারের সংখ্যা তিন কোটি। তবে এই তালিকায় অনেক মৃত ভোটারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তাই মিয়ানমারের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ৫ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম।

মিয়ানমারের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব ন্যাশনালিস্টে আসন রয়েছে ২২৪টি। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ৫৬টি আসন সংরক্ষিত সামরিক বাহিনীর জন্য। আবার ৪৪০টি আসনের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ১১০টি আসন। রোববার ভোটগ্রহণের মাধ্যমে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচন করা হলেও কে হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট, তা নির্ধারণ করতে প্রায় চার মাস অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সরকারের কোন পদটি কে নেবেন, তা নিয়েও বেশ বড় ধরনের দরকষাকষি শুরু হয়ে যাবে। তাই নির্বাচনের পরপরই একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার ক্ষমতায় বসতে সময় লাগবে অনেকদিন।

ইউএসডি এবং এনএলডির পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্য প্রভাবশালী দলগুলো হচ্ছে মিয়ানমারস ফারমার্স ডেভেলপমেন্ট পার্টি, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পার্টি (এনডিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এনডিএফ) এবং ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি (এনইউপি)। তবে এসব দলের বেশিরভাগের প্রভাবই আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও অবাধ হবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন বিরোধীরা। তবে এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট সাবেক জেনারেল থেইন সেইন। নির্বাচনের আগে গত শুক্রবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ভোটের ফল কী হবে, তা নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমি আবারো স্পষ্ট করে বলছি, নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, বর্তমান সরকার এবং সেনাবাহিনী_ উভয়েই তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। সুষ্ঠুভাবে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

কিন্তু সব প্রতিশ্রুতির পরও যেন নির্ভার হতে পারছেন না অং সান সু চি। শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি এরই মধ্যে নির্বাচনে জালিয়াতি হওয়ার আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি এই জালিয়াতিতে জড়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা তার। এবারকার নির্বাচনে এনএলডিকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হলেও ভোটে দাঁড়াতে পারেননি দলীয় প্রধান ৭০ বছর বয়সী সু চি। গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হলেও বিদেশি (ব্রিটেন) নাগরিকত্ব লাভ করা স্বামী-সন্তানের কারণে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এমনকি তার দল নির্বাচনে জয়ী হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা চালাতে পারবেন না তিনি। অবশ্য দল জিতলে প্রেসিডেন্টের ওপরে থেকে দেশ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

১৯৬২ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর সামরিক একনায়কতন্ত্রের অধীনে ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয় এনএলডি। কিন্তু সেই সময় সু চির কাছে ক্ষমতা দেননি ক্ষমতাধর জেনারেলরা। এরপর তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচন হলেও তাতে অংশ নেয়নি এনএলডি। ৪০টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে দেশটির পার্লামেন্টের ৩৩০টি আসনের মধ্যে ২৫৯টি লাভ করে ক্ষমতাসীন সেনা সমর্থিত ইউএসডি। ওই নির্বাচনে জিতে দীর্ঘদিনের সামরিক লেবাস ছেড়ে গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্টের আদলে ফের মসনদে বসেন থেইন সেইন। তবে তার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সু চি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পান। এরপর ২০১২ সালে এক উপনির্বাচনে সু চির দল এনএলডিকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। সেই নির্বাচনে ৪৪টি আসনের মধ্যে ৪৩টিই পেয়েছিল এনএলডি। তবে এবারই প্রথম থেকে মুক্তভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পেরেছেন এই নেত্রী।

নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবার সু চির দলই জয়লাভ করবে_ রোববার বার্তা সংস্থাগুলো এমনটাই জানিয়েছে। উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের সঙ্গে সংঘাতে না যাওয়ায় সু চির পক্ষে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী যখন রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন এবং নাগরিকত্ব বাতিলের ব্যাপারে সমালোচনার ঢেউ ওঠে, তখন মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন সু চি। এমনকি এবারকার নির্বাচনেও তার দল থেকে কোনো মুসলিমকে প্রার্থী করা হয়নি। শেষ মুহূর্তে মুসলিমদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেও। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এত আলোচনার মধ্যেও বহু দলের অংশগ্রহণের এই নির্বাচন নিয়ে তেমন উৎসাহ নেই মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে। অন্যদিকে, নির্বাচনে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও সত্যিকারের গণতন্ত্র ফিরবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। কারণ, প্রতিরক্ষা এবং স্বরাষ্ট্রের মতো মন্ত্রণালয় আর সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকবে সামরিক বাহিনীর হাতেই। তাই মিয়ানমারের মূল ক্ষমতার বড় অংশ থেকে যাবে সেনাবাহিনীর হাতেই।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিদেশ এর অারো খবর