সৌদি আরবে কারাবন্দি ফিলিস্তিনি কবি আশরাফ ফায়াদ-এর কবিতা
সৌদি আরবে কারাবন্দি ফিলিস্তিনি কবি আশরাফ ফায়াদ-এর কবিতা
২০১৫-১১-২৮ ০৯:৪৩:০২
প্রিন্টঅ-অ+


ভাষান্তর: আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান:

অনুবাদকের কথা:
আশরাফ ফায়াদ (Ashraf Fayadh) সৌদি আরবে বসবাসকারী একজন প্যালেস্টাইনী কবি ও শিল্পী। এক বছরের বেশী সময় ধরে তিনি সৌদি আরবের একটি কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি মাথায় নিয়ে।

বিস্ময়করভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ কবিতার মাধ্যমে খোদ সৃষ্টিকর্তাকে নাকি অপমান করেছেন। কবি ও শিল্পী আশরাফ ফায়াদকে সৌদি আরবে বন্দি করা হয়েছে মূলত কোনো প্রকৃত আইনী অভিযোগ ছাড়াই, শুধুমাত্র ideas that do not suit the Saudi society বা সৌদি সমাজে জন্য সঠিক নয় তার ধারণা এমন দাবী করে।

এই অভিযোগের ‍সূচনা করেছিল এক সৌদি নাগরিক, ২০০৮ সালে প্রকাশিত আশরাফ ফায়াদের একটি কবিতার সংকলন Instructions Within এ কিছু কবিতার অর্থ বিকৃত করে অভিযোগ উত্থাপন করার পর।

কবি ছাড়াও ফায়াদ একজন চিত্রশিল্পী, এবং বৃটিশ সৌদি শিল্পকলা সংগঠন Edge of Arabia র একজন নেতৃস্থানীয় সদস্য। ফায়াদকে প্রথমে চার বছরের জেল ও ৮০০ বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হয়েছিল, রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করার পর পুনঃবিচারে তা বাতিল হয়ে যায়, তবে নতুন বিচারকের প্যানেল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোন আইনজীবির সহায়তাও তিনি পাননি।

সারা পৃথিবীব্যাপী কবি,সাহিত্যিক, শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মীরা এই অন্যায় বিচারের প্রতি আন্দোলন করছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। ধর্মকে আমরা বারংবার ব্যবহার হতে দেখছি সৃজনশীল মানুষদের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা হরণ ও সংখ্যলঘু নির্যাতনকে যথার্থতা দেবার জন্য।

আমরা কবি আশরাফ ফায়াদ বিনা শর্তে মুক্তি চাই। কবি ও সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী মোনা করিম ফায়াদ এর কিছু কবিতা অনুবাদ করেছেন আরবী থেকে ইংরেজীতে । আমরা আরবী থেকে ভাষান্তরিত ইংরেজী কবিতাগুলোকে বাংলায় অনুবাদ করেছি।

ইংরেজী অনুবাদক মোনা করিম (Mona Kareem) - নির্বাসিত কবি ও লেখক, যার জন্ম কুয়েতে। আরবী ভাষায় তার দুটি কবিতার বই আছে।

আমরা কবি আশরাফ ফায়াদ-এর বিনা শর্তে মুক্তি চাই।

ফ্রিদা কাহলো’র গোঁফ
(মোনা করিম এর ইংরেজী অনুবাদের ভাষান্তর)

কাঁদামাটির গন্ধকে উপেক্ষা করবো আমি,
বৃষ্টি আর আমার বুকে বহুদিন ধরে থিতু হয়ে বসে থাকা
সেই দহনটাকেও ভৎর্সনা করা প্রয়োজন।
আমার পরিস্থিতির জন্য একটি উপযুক্ত স্বান্তনা খুজছি আমি,
যা আমাকে সুযোগ দিচ্ছে না তোমার ঠোঁটগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য
যেমনভাবে আমি চাই।
অথবা তোমার লালচে পাপড়ি থেকে মুছতে দিচ্ছে না শিশির বিন্দু,
অথবা কিছুতেই পারছি না কমাতে আমার সেই হতাশাকে
যা আমাকে আচ্ছন্ন করে,
যখন আমি অনুধাবন করি এই মূহুর্তে তুমি আমার পাশে নেই।

এবং পাশে থাকবে না -
যখন আমি বাধ্য হই আমার অবস্থানের যথার্থতাকে ব্যাখ্যা করতে রাতের শাস্তি দেয়া সেই নীরবতার কাছে।
এমনভাবে আচরণ করো - যেন এই পৃথিবী নীরব, যেমন করে আমরা দূর থেকে দেখছি একে,
এবং আমাদের মধ্যে যা কিছু ঘটেছে
সেগুলো শুধুমাত্র সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া খারাপ কোন তামাশা ছাড়া যেন আর কিছু নয়!

#
তুমিহীন কাটানো সেই দিনগুলো নিয়ে কি ভাবো তুমি?
সেই শব্দগুলোকে, যা আমার তীব্র যন্ত্রণা থেকে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এত দ্রুত?
শুষ্ক সমুদ্র শৈবালের মত আমার বুকের ভিতর জমতে থাকা সেই গিঁটগুলো ?
তোমাকে বলতে ভুলে গেছি আমি, তোমার অনুপস্থিতিতে আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি ( নিয়মমাফিক যদি বলতেই হয়)
এবং সেই ইচ্ছাগুলো তোমার কামনার দিকে যাবার রাস্তায় হারিয়ে ফেলেছে নিজেদের,
ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে আমার সব স্মৃতিগুলো।

আমি যে এখনও আলোর অনুসন্ধান করছি, দেখার জন্য কিন্তু না,
বরং এর কারণ অন্ধকার শঙ্কিত করে -
এমনকি যখন আমরা সেই অন্ধকারেও অভ্যস্ত হয়ে পড়ি!

আমার এই ক্ষমা প্রার্থনা কি যথেষ্ট হবে?
সব কিছুর জন্য, যা কিছু ঘটেছে,
যখন আমি চেষ্টা করেছি ভালো কোন অজুহাত বানানোর জন্য।

#
যখনই আমার ‍বুকে ঈর্ষা অনুভব করি,
যখনই হতাশা আমার অন্ধকার দিনগুলোর নতুন একটি দিনকে নষ্ট করে
যখনই আমি বলি - ন্যায় বিচারের ব্যাথা উঠবে মাসিকের এবং
ভালোবাসা হচ্ছে দূর্বল চিত্তের কোনো এক পুরুষ মানুষ,
জীবনের অপরাহ্নে লিঙ্গোত্থানের সমস্যায় আক্রান্ত যে।

#
স্মৃতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে আমার
এবং দাবী করতে হবে আমার ভালো ঘুম হয়েছে রাতে,
প্রশ্নগুলো আমার ছ্ন্নি বিচ্ছিন্ন করতে হবে,
যারা একটি যুক্তির খোঁজে হাজির হয়, বিশ্বাসযোগ্য ‍উত্তরগুলো খুঁজতে।
সেই প্রশ্নগুলো, খুব বেশী ব্যক্তিগত কারণে, যারা সাধারণত যতিচিহ্ন পড়ে গেলেই আবির্ভূত হতে থাকে।

#
আয়নাকেই ব্যাখ্যা করতে দাও কত সুন্দর তুমি!
তোমার ধুলোমাখা শব্দের স্তুপ সরাও, গভীরভাবে শ্বাস নাও
মনে রেখো আমি তোমাকে কত বেশী ভালোবেসেছিলাম,
এবং কিভাবে পুরো বিষয়টি রুপান্তরিত হয়েছিল একটি বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গে -
কারণ হতে পারতো যা কোনো বড় অগ্নিকাণ্ডের - শূন্য কোনো গুদামে!


আশরাফ ফায়াদ এর বিতর্কিত কবিতা ( মোনা করিম এর ইংরেজী অনুবাদ থেকে);
এই কবিতাগুলো ফায়াদ এর কবিতা সংকলন Instructions Within থেকে নেয়া। ২০০৮ সালে যে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল বৈরুত কেন্দ্রিক প্রকাশনা Dar al-Farabi থেকে।পরবর্তীতে কবিতাগুলোর বইটি সৌদি আরবে নিষিদ্ধ করা হয়।


তেল কোনো ক্ষতি করে না, শুধুমাত্র দরিদ্রতার কিছু চিহ্ন রেখে যাওয়া ছাড়া

সেই দিন, আরেকটি তৈলকূপ যারা খুঁজে পেয়েছিল যারা, যখন তাদের মুখ আধারে আচ্ছন্ন হয়েছিল,
যখন আপনার হৃদপিন্ডে জীবন অনুপ্রবেশ করেছিল, হৃদয় থেকে আরো বেশী তেল নিষ্কর্ষণ করতে
… জনগণের স্বার্থে

সেটাই হচ্ছে.. তেলের প্রতিশ্রুতি, একটি সত্যিকারের প্রতিশ্রুতি।
সমাপ্তি ..


বলা হয়েছিল: ওখানেই বসতি স্থাপন করো
কিন্তু আপনাদের মধ্যে কেউ আছেন যারা সবার শত্রু
সুতরাং আপাতত এই কথা থাক

নদীর তলদেশ থেকে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন
যারা আপনারা উপরে তাদের উচিৎ যারা নীচে তাদের প্রতি কিছু করুণা প্রদর্শন করা
গৃহচ্যুত মানুষ অসহায়
রক্তের মত, যা কেউ কিনতে চায় না তেলের বাজারে!


ক্ষমা করো, আমাকে ক্ষমা করো
তোমার জন্য আরো বেশী অশ্রুপাত না করতে পারার কারণে
স্মৃতিবেদনায় কাতর হয়ে অস্ফুট স্বরে তোমার নাম উচ্চারণ না করার জন্য
আমি আমার মুখ ঘুরিয়ে রেখেছি তোমার আলিঙ্গনের উষ্ণতার প্রতি
তুমি ছাড়া আমার আর কোন ভালোবাসা নেই, তুমি একাই, আর আমি তোমার প্রথম অনুসন্ধানকারী


রাত্রি,
সময়ের ব্যপার তুমি অনভিজ্ঞ
বৃষ্টিরপাতেরও অভাব,
যা মুছে দিতে পারতো আপনার অতীতের সব অবশিষ্টাংশ
এবং আপনাকে মুক্তি দিতে পারতো সেই বন্দীত্ব থেকে, যার নাম আপনি দিয়েছেন ধার্মিকতা
আপনার ঐ হৃদয় থেকে, যে ভালোবাসতে সক্ষম, খেলতে সক্ষম
এবং বিভক্ত করতে পারতো ঐ নির্জীব ধর্ম থেকে আপনার অশ্লীল প্রত্যাহার
প্রবঞ্চক সেই ঐশী নির্দেশ..
সেই ঈশ্বরদের থেকে

যারা তাদের গৌরব হারিয়েছে।


তুমি ঢেকুর তুলছো, যতটা না তুমি করে থাকো তার চেয়ে বেশী
যেমন করে পানশালাগুলো তাদের অতিথিদের আশীর্বাদপুষ্ট করে
আবৃত্তি আর মোহনী নর্তকীদের দিয়ে

ডিজেকে সাথে নিয়ে
তুমি তোমার বিভ্রম আবৃত্তি করছো
এবং প্রশংসা করছো এই সব শরীরগুলোকে
যারা নির্বাসনের কবিতার সাথেও তাদের শরীর দোলাচ্ছে।


যদিও তার কোন অধিকার নেই হাঁটবার
অথবা দুলবার অথবা কাঁদবার

তার নিঃশ্বাস, তার বর্জ্য এবং তার অশ্রু
নবায়ন করার জন্য এমনকি
আত্মার জানালা খোলারও কোন অধিকার নেই তার

তোমারও ভুলে যাবার প্রবণতা আছে যে
তুমি এক টুকরো রুটি


নির্বাসিত হবার দিনে, তারা নগ্ন দাড়িয়ে
যখন তুমি মরচে ধরা নর্দমার নলে সাতার কাটছো, খালি পায়ে..

তোমার পায়ের জন্য সেটা ভালো পারে
কিন্তু পৃথিবীর জন্য নয়


সব নবীরাই এখন অবসরে
সুতরাং আপনার নবীর আপনার কাছে ফিরে আসার জন্য
অপেক্ষায় থাকবেন না

এবং আপনার জন্য,
শুধু আপনার জন্য টেলিভিশনের পর্দা তাদের দৈনন্দিন রিপোর্ট নিয়ে আসে
এবং তাদের মোটা বেতনও পায়

একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য
টাকা কত গুরুত্বপূর্ণ।


আমার পিতামহ প্রতিদিন নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন,
নির্বাসন ছাড়া, স্বর্গীয় কোন সৃষ্টি ছাড়া
আমি ইতিমধ্যে একবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছি আমার ছবিতে কোন ঐশ্বরিক ফুঁ ছাড়াই
আমি পৃথিবীতেই নরকের অভিজ্ঞতা পেয়েছি

পৃথিবী হচ্ছে নরক
যা প্রস্তুত শরণার্থীদের জন্য

১০
আপনার নীরব রক্ত কোনো কথা বলবে না
যতক্ষণ আপনি আপনার মৃত্যু নিয়ে গর্ব করবেন
যতক্ষণ আপনি আপনার ঘোষণা অব্যাহত রাখবে – গোপনে – যে
আপনি আপনার আত্মাকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন
যারা বেশী কিছু জানে না

আত্মা হারানোর মূল্য আপনাকে পরিশোধ করতে হবে সময় দিয়ে

তেলের অশ্রুপাত করা আপনার চোখগুলো
দাবী করতে যতটা সময় লাগবে তার চেয়েও দীর্ঘ সময়।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

শিল্প সাহিত্য এর অারো খবর