ডিজিটাল প্রেমপত্র!
ডিজিটাল প্রেমপত্র!
২০১৬-১০-১৯ ০৬:১৪:৪৫
প্রিন্টঅ-অ+


দুই দশক আগেও হাতে হাতে প্রেমপত্র গুঁজে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। দুরুদুরু বুকে কাঁপা হাতে লেখা সে চিঠিই ধরে রাখত অনুভবের প্রথম আলোর ছটা৷ ক্যাম্পাসে বা গলির মোড়ে শত সংকোচে প্রেমপত্র হাতে প্রিয় মানুষের সামনে দাঁড়ানো—সে তো পর্বতশৃঙ্গ জয়ের মতোই ব্যাপার ছিল। কিন্তু হালের তরুণদের কাছে সেই প্রেমপত্রের আবেদন কী অজানা? স্মার্টফোনের সময়ে তাঁদের প্রেমপত্রের জায়গাটি কোন মাধ্যম দখল করেছে?

এই প্রশ্নগুলোর জুতসই উত্তর পাওয়া গেল বিভা ও অনিকের (ছদ্মনাম) কথায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক অনুষ্ঠানে দুজনের পরিচয়। মুক্তমঞ্চের কোনায় বসে সেদিন এক পশলা কথাও হয়েছিল। সে কথার রেশ ধরেই বিভাকে ফেসবুকে খুঁজে নেন অনিক। ‘আমরা কি একদিন দেখা করতে পারি’ অনিকের ফেসবুক মেসেজে সাঁয় মেলে বিভার। তারপর? অনিক বলেন, ‘দেখা হলো বিকেলে। সামনাসামনি তেমন কিছুই গুছিয়ে বলতে পারছিলাম না। তখন মাথায় এসেছিল চিঠি লিখলে খারাপ হয় না। কিন্তু এই সময়ে চিঠি লিখব ভাবতেই কেমন যেন সেকেলে মনে হচ্ছিল!’

এত কাঠখড় পোড়ানোর চেয়ে আপনি তো ফোনেই মনের কথা বলতে পারতেন? ‘সে চেষ্টাও করেছি। ফোনে কথা বলার সময়ও সাহসে কুলোচ্ছিল না “ভালোবাসি” কথাটি বলার।’ অনিকের মনের বার্তা বিভার দুয়ারে কীভাবে কড়া নাড়ল? বিভা বলেন, ‘আমি তো সেদিনই ওর চোখের ভাষা বুঝেছি। কিন্তু প্রকাশ করিনি। দুই দিন পর হুট করে দেখি নাতিদীর্ঘ একটি খুদে বার্তা!’ বিভার মুঠোফোনের সেই খুদে বার্তায় ছিল অনিকের ‘ডিজিটাল প্রেমপত্র’।

এখনো তাঁরা সেই ডিজিটাল প্রেমপত্র চালাচালি করেন। এই গল্প শুধু অনিক ও বিভার নয়, তরুণেরা এখন নিজেদের মনের কথা পছন্দের মানুষকে জানাতে সহজ মাধ্যমই ব্যবহার করছেন। চিঠি লেখার যে উত্তেজনা, তা কি খুদে বার্তা কিংবা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে পাঠানো মেসেজে পাওয়া যায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে চিঠির রোমাঞ্চকর ব্যাপারটি গল্পে বা বড়দের কাছে শুনেছি। আমাকে এটা তেমন টানে না। হয়তো আমরা যে মাধ্যম ব্যবহার করছি সেটাই আমার কাছে রোমাঞ্চকর মনে হয় বলে।’ ব্যাপারটি খোলাসা হলো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তরুণ কর্মী সানজিদা নাহারের কথায়, চিঠি লিখতে যে আবেগের দরকার হয় তা কিন্তু একটি এসএমএস লিখতেও প্রয়োজন হয়। কতবার চেষ্টা করেই না একটি সুন্দর এসএমএস লেখা হয়। তখন তো চিঠি লিখে ঝুড়ি ভরে ফেলত। এখন আমরা ড্রাফট ভরে ফেলি। ‍দুরুদুরু বুকেই কিন্তু সেন্ট করি।’
তবে কিছু ব্যতিক্রমী মানুষও তো সব সময়ই থাকেন। এমনই একজন তরুণ প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মেজবাহ। শৌখিন এই তরুণ এখনো চিঠি চালাচালি করেন। তিনি বলেন, ‘চিঠির প্রতি বরাবরই আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল। আমিও চাইতাম আগেকার দিনের মতো প্রেমপত্র লিখতে। সেই আগ্রহ থেকেই প্রেমপত্র লেখা শুরু করি। ভার্সিটিতে আমাদের বেশ কিছু চিঠিও চালাচালি হয়েছে। তবে ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমেই বেশি কথা হয়।’

তরুণদের যোগাযোগের মাধ্যমের পরিবর্তনকে তথ্যপ্রযুক্তিবিদেরা খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘একসময় তো কবুতরের পায়ে বেঁধে চিঠি পাঠাত। আমরা তো সেটা এখন কল্পনাও করতে পারি না। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন হবে। আর প্রযুক্তির পরিবর্তনের মধ্যমে যোগাযোগের মাধ্যম পরিবর্তন হবে।’

সবাইকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কথাও জানালেন মোস্তফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা চিঠির যুগে বড় হয়েছি, তারা এখন পুরোনো দিনের কথা ভেবে স্মৃতিকাতর হতে পারি। কিন্তু তরুণেরা তাঁদের সময়ে যা সহজ, সেটাই ব্যবহার করবেন। তবে এই যোগাযোগের মধ্যে যেটুকু সামাজিকতা ধরে রাখা দরকার, তা রাখতে হবে।’

ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো ও স্কাইপের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোই তরুণদের প্রেমপত্রের জায়গা দখল করে নিয়েছে। তবে যে মাধ্যম ব্যবহার করেই যোগাযোগ হোক না কেন, তরুণেরা মনে করেন প্রেমপত্রের যে আবেদন, সেটা তাঁরা খুঁজে পান তাঁদের হাতে থাকা স্মার্টফোনের এই অ্যাপগুলোতেই।
(সজীব মিয়া)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফিচার এর অারো খবর