শব্দদূষণ কমাতে চাই সচেতনতা
শব্দদূষণ কমাতে চাই সচেতনতা
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-১০-১৫ ০৫:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মানুষের জীবনে শব্দ বা আওয়াজের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, এই শব্দ থেকেই জন্ম ভাষার, কথার এবং অনুভূতি প্রকাশের। যে মানুষটি শব্দ শোনে না বা উচ্চারণ করতে পারে না, সে হাজারো মানুষের সঙ্গে থেকেও বিচ্ছিন্ন।
তবে এই শব্দ যখন কানের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন কিন্তু তা নানা জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। জন্মগত বধিরতার হার প্রতি হাজারে একজনের, কিন্তু সুস্থ শ্রবণশক্তি নিয়ে জন্ম হওয়ার পর প্রতি হাজারে একজন পরবর্তী জীবনে বধির হয়ে যেতে পারেন। তার মূল কারণ শব্দাঘাত। অতিমাত্রার শব্দ, যা অর্থহীন ও শ্রবণকে আঘাত করে—তাকেই আমরা শব্দদূষণ বলি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন সহনীয় বা শ্রবণযোগ্য শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় শব্দমাত্রা নিরূপণ করতে গিয়ে দেখা যায়, ফার্মগেট এলাকায় শব্দের তীব্রতা সর্বোচ্চ। সকাল আটটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত প্রায় সব সময়ই ১২০ ডেসিবেলের ওপরে শব্দ হয় সেখানে, যা নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার দ্বিগুণ বা তিন গুণ। ঢাকায় শব্দের তীব্রতা সবচেয়ে কম যে এলাকায়, সেটা উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর। কিন্তু সেখানেও শব্দের তীব্রতা মানুষের স্বাভাবিক সহনীয় মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ।

ঢাকা শহরে শব্দদূষণের উৎস হিসেবে মোটরগাড়ির হর্ন, মোটরসাইকেল, নির্মাণকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান, মাইকিং, জেনারেটর, কলকারখানা ইত্যাদি অন্যতম। এর বাইরে আছে বাড়িতে বা অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বা এসির শব্দ, টেলিভিশনের আওয়াজ, মোবাইল ফোনে শিশুদের মিউজিক বা কার্টুন দেখার শব্দ। এর কোনোটা ৬০ ডেসিবেলের চেয়ে বেশি হলে তা শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে।

শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা রকম জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। শব্দদূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃৎস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে অক্সিজেনের স্বল্পতা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমি, দিক ভুলে যাওয়া, শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা তৈরির জন্য এই শব্দদূষণ দায়ী।

আমাদের প্রিয় শহরকে এই ভয়াবহ শব্দদূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সঠিক আইন প্রয়োগ, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন।

বিনা প্রয়োজনে গাড়ির হর্ন বাজানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত। হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। নির্মাণকাজে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দরকার। পাঠ্যপুস্তকে শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা উচিত। কানে হেডফোন বা ইয়ার প্লাগ লাগিয়ে মাত্রাতিরিক্ত শব্দে গান শোনা পশ্চিমা বিশ্ব শিশু-কিশোরদের মধ্যে শ্রবণশক্তি হারানোর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত এখন।

বাড়িতে শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি, যেমন: টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন বা ডিশওয়াসারের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে দিন। অতিরিক্ত ও দীর্ঘ সময় টিভি দেখা উচিত নয়।

দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনের ব্যবহার, হেডফোনের সাহায্যে গান শোনা, সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউডস্পিকার বাজিয়ে দূষণ সৃষ্টি করা-ইত্যাদি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নিজেদেরই পাল্টাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ধারেকাছে হর্ন বাজানো বা কোনো শব্দ করা জরিমানাযোগ্য হতে হবে। কারখানাগুলোকে আবাসিক এলাকার বাইরে নিতে হবে।

জেনারেটর-জাতীয় যন্ত্র কনসিলড বা আবদ্ধ রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বাড়ির আশপাশে ঘন গাছপালার সারি শব্দদূষণ কমায়। এ ধরনের নানা পদক্ষেপের সঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতনতা শব্দদূষণ কমাতে সাহায্য করবে।

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত

নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বাস্থ্য এর অারো খবর