মোবাইল ব্যাংকিংয়ে খরচ বাড়তে পারে গ্রাহকের
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে খরচ বাড়তে পারে গ্রাহকের
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-০৯-২৬ ২০:১৬:৩৭
প্রিন্টঅ-অ+


দেশের মোবাইলফোন অপারেটরগুলো মোবাইল ব্যাংকিংয়ে খরচ বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্যে গত ২৬ মে বিটিআরসিতে চিঠি পাঠায় মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশঙ্কা, এই প্রস্তাবনা বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেলে টাকা পাঠাতে আরও খরচ বাড়বে গ্রাহকের। তবে অ্যামটব বলছে, গ্রাহকের খরচ বাড়বে না, সব ঠিক থাকবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা ৩ কোটি ৬ লাখ। এর মধ্যে সিংহভাগ গ্রাহক বিকাশ ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের। বিকাশের মাধ্যমে গ্রাহককে টাকা পাঠাতে প্রতি ১০০ টাকায় খরচ (ক্যাশ আউট) করতে হয় ১ দশমিক ৮৫ টাকা। নতুন প্রস্তাবনা অনুমোদন পেলে এই খরচ অনেক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয়ের ৭ ভাগ মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে তাদের ইউএসএসডি (আনস্ট্রাকচার্ড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডাটা) চ্যানেল ব্যবহার করে মোবাইল আর্থিক সেবা দেওয়ার জন্য। এছাড়া আয়ের প্রায় ৮০ ভাগই পায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা এজেন্ট ও পরিবেশক। আর সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি পায় ১৩-১৬ ভাগ। মোবাইলফোন অপারেটররা যে ৭ ভাগ টাকা পায়, তারা সেই পরিমাণকে আরও বাড়িয়ে নিতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে তারা রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলের পরিবর্তে ইউএসএসডি সেশনবেজড চার্জ আরোপ করতে চায়। এ কারণেই খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সেবা একেবারে বিনামেূল্যে দেয়।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে মোবাইল অপারেটরগুলোর ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ মোবাইল অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক ফি বাবদ ১৩৯ কোটি টাকা দিয়েছে।

এ বিষয়ে বিকাশ-এর মুখপাত্র জাহেদুল ইসলাম বলেন, ২০১৫ সালে বিকাশ গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও এয়ারটেলকে তাদের ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহারের জন্য ৬৭ কোটি টাকা দিয়েছে। নেটওয়ার্ক ফির সিংহভাগই পেয়েছে পেয়েছে গ্রামীণফোন। জাহেদুল ইসলাম আরও বলেন, ২০১৪ সালে এই টাকার পরিমাণ ছিল ৪৬ কোটি এবং ২০১৩ সালে ২৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইলফোন অপারেটরগুলো এ খাত থেকে আরও বেশি আয় করতে এই কৌশল নিয়েছে।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যালেন্স চেক, পেমেন্ট, এয়ার টাইম রিচার্জ, আন-সাকসেসফুল ট্রান্সজেকশন ও ক্যাশ-ইনের কোনও টাকা চার্জ করে না। কেবল পি টু পি (সেন্ড মানিতে ৫ টাকা), ক্যাশ আউটে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং এটিম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় ২ শতাংশ টাকা চার্জ করা হয়।

মোবাইল অপারেটরগুলো মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে এতদিন ৭ শতাংশ অর্থ চার্জ করলেও নতুন প্রস্তাবনায় সেশনভিত্তিতে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাহক টাকা পাঠাতে চাইলে তাদের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। একজন গ্রাহক ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহার করলেই চার্জ দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউএসএসডি চ্যানেল হলো মোবাইল অপারেটরগুলোর অন্যতম একটি রিসোর্স। এর কস্ট অব অপরচুনিটি রয়েছে। এটা তো এনগেজড করে রাখতে পারি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে লেসন পেয়েছি। আমরা মনে করছি, এই বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। প্রতিযোগিতার অভাব রয়েছে। আমরা চাই বিষয়টি প্রতিযোগিতামূলক হোক।’ তিনি জানান, অ্যামটব বিটিআরসিকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বিভিন্ন দেশের উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসি নিশ্চয়ই এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করবে। এক প্রশ্নের জবাবে টিআইএম নূরুল কবির বলেন, ‘গ্রাহকের খরচ বাড়বে না। সব ঠিক থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘মোবাইল ফিনান্সিয়াল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নাকি অনেক সেবা ফ্রি দেয়। সেটা তারা ফ্রি দেবে কিনা, তাদের ব্যাপার। তারা এজেন্টদের প্রায় ৮০ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ার করে। এই জায়গাটায় একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে চলে এলে সব ঠিক থাকবে।’

মোবাইল ব্যাংকিংঅ্যামটব সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ মে অ্যামটব বিটিআরসিতে এ বিষয়ক চিঠিটি পাঠায়। চিঠিতে সেশনবেজড চার্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে মোবাইলফোন অপারেটররা রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ভিত্তিতে যে টাকা (মোট আয়ের ৭ শতাংশ) পায় সেটা যৌক্তিক করার প্রয়োজন রয়েছে। অ্যামটব নতুন করে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ২ মিনিটের (একটি লেনদেন সম্পন্ন করতে সর্বনিম্ন ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় প্রয়োজন হয়) একটি লেনদেনের জন্য দেড় টাকা এবং এসএমএস-এর চার্জের জন্য ২০ পয়সা দিতে হবে অপারেটরদের।

২০১১ সালে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং চালু হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল দেশের দরিদ্র ও ব্যাংক-বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে একটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসা। ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহারের ফলে কম দামের মোবাইল সেট ব্যবহার করে গ্রাহকরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা উপভোগ করতে পারছেন।
মোবাইল ব্যাংকিং-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, মোবাইল অপারেটরগুলোর আয় বৃদ্ধিতে মোবাইল ব্যাংকিং খাতের অবদান বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে অবদান রাখার হার আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২৮টি ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দিলেও বর্তমানে ১৮টি ব্যাংক এই সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত সেবা দিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং -এর মাধ্যমে ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট ছাড়াও বেতন দেওয়া, মোবাইল ফোনের এয়ার টাইম কেনা এবং বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট কেনা যাচ্ছে বিকাশের মাধ্যমে।

গত ৩০ আগস্ট টেলিকম সাংবাদিকদের সংগঠন টিআরএনবি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছেন, ‘মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের একচেটিয়া বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিণত করা হবে। প্রয়োজনে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হবে। এই সেবা নিরাপদ ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির যৌথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির মধ্যে একটি যৌথ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

অর্থনীতি এর অারো খবর