মেট্রো রেলের কাজ চলছে কি?
মেট্রো রেলের কাজ চলছে কি?
সংগীতা ঘোষ
২০১৫-১১-২৪ ১৮:৫৮:১২
প্রিন্টঅ-অ+


ঢাকা নগরীর প্রধান সড়কে যানজট হলে অনেক সময় দেখা যায়, সড়কের মাঝখানে বেশ খানিকটা এলাকা ঘিরে কর্মযজ্ঞ চলছে, যার চারপাশে রেলিংয়ের দেয়ালে সারি সারি লেখা আছে, ‘ঢাকা মেট্রো রেলের কাজ চলিতেছে’, ‘মেট্রো রেল আসছে’। ঢাকাবাসী এসব দেখে পুলকিত হন সন্দেহ নেই কিন্তু দুদিন পরই দেখা যায় রাস্তায় কিছু খোঁড়াখুঁড়ি বাদে আর কিছুই নেই। সব কর্মকাণ্ড হাওয়ায় উবে গেছে। খোঁজ নিলে জানা যাবে সয়েল টেস্ট চলছে। এই সয়েল টেস্ট কয়েক বছর ধরেই চলছে। মূল কাজ কবে হবে? আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে অক্টোবরে এর একটি প্লান প্রকাশ করে (দি ডেইলি স্টার ২১.১০.২০০৯), যাতে বলা হয়, সায়েদাবাদ থেকে মহাখালী হয়ে উত্তরা এবং সায়েদাবাদ থেকে মিরপুর হয়ে উত্তরা, দুটি পথে মেট্রো রেল নির্মাণ করা হবে। ছয় মাসের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে। প্রকল্পটিতে একটি এক্সপ্রেসওয়েসহ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি ২০১০-এর দিকে এক্সপ্রেসওয়ের বিষয়টিই সামনে এসে যায়। আগস্ট মাসে জানা যায় সরকার ২.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করবে (দি ডেইলি স্টার ২৪.০৮.২০১০)। জনগণের তরফ থেকে সমালোচনা আসার পর সরকার বলে, মেট্রো রেল একটি ভিন্ন প্রকল্প যার নির্মাণকাজ শুরু হবে ২০১৩ সালে (দি ডেইলি স্টার ০৫.০৯.২০১০)। এরপর জানা যায় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পল্লবী হয়ে উত্তরা ২০.১ কিমি মেট্রো রেল নির্মাণ করা হবে। ২০১২-১৩ সালে টেন্ডার হবে, কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে (দি ডেইলি স্টার ১৯.১২.২০১২)।

ঢাকায় মেট্রো রেল নগরবাসীর বহুদিনের দাবি, বহুদিনের স্বপ্ন। মেট্রো রেল পরিকল্পনা ওই সব নগরীর জন্য করা হয় যার লোকসংখ্যা দশ লাখের বেশি। মেট্রো রেল ব্যবস্থাটি স্থাপন হতে হতে নগরীর লোকসংখ্যা আরো বাড়ে তাই পরিকল্পনায় আরো ছড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়। কোনো নগরীতে মেট্রো রেল ধনী-গরিব উভয়েরই পরিবহন ব্যবস্থা। এর শেষ মাথায় কার পার্কিং করে ধনীরা এতে চড়ে অতি দ্রুত নগরীর কেন্দ্রে পৌঁছে যেতে পারেন। মেট্রো রেল বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে, যা তাদের সস্তায় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে আগ্রহের স্থানগুলোতে পৌঁছে দিতে পারে। একটি নগরী যতই নোংরা আর অপরিচ্ছন্ন হোক, মেট্রো রেলের বিশেষত্ব হলো এটি একটি পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা। মেট্রো রেল পাতালে, ভূতলে কিংবা আকাশে যেখানে সম্ভব চলতে পারে। ব্যাঙ্কক মেট্রো রেল (স্কাই ট্রেন) এক কর্মদিবসে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি যাত্রীকে বহন করার রেকর্ড (জুন ২০০৯) রাখে। তারা বলে মেট্রো রেল ব্যাঙ্কক নগরীর ভয়াবহ যানজট দূর করেছে, নিয়মিত যাত্রীদের পরিবেশ বান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা দিয়েছে। একটি মেট্রো রেল ১ হাজার যাত্রীকে বহন করতে পারে, যেখানে ওই সংখ্যক ব্যক্তির বহনের জন্য ৮০০ কার লাগে। কলকাতা মেট্রো ১৯৮৪, ব্যাঙ্কক মেট্রো ১৯৯৯, দিল্লি ২০০২, বাঙ্গালোর ২০১১ ও মুম্বাই মেট্রো ২০১৩ সালে চালু হয়।

ঢাকা মেট্রো রেলের পরিকল্পনা একটি জাইকা সমীক্ষার ফল, যাতে তিনটি লাইনের কথা বলা হয়েছে। এর প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় আকাশে ১২ মিলিয়ন ডলার/কিমি, পাতালে ৪৮ মিলিয়ন ডলার/কিমি (দি ডেইলি স্টার ০৫.০৯.২০০৯)। এটি শুরু করতে সরকারকে প্রথমে একটি কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করতে হবে। কবে তা হবে? পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি একটি মনো রেল নির্মাণ পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু তা অসম্ভব বলে বাদ দেয়া হয়েছে। মনো রেল আকৃতিতে ছোট এবং একমুখী পথে চলে, মেট্রো রেল গণপরিবহনের জন্য নির্মিত হয় দ্বিমুখী পথে চলে। জাইকা প্ল্যানে নীল লাইনে দুটি দুর্বলতা আছে, যথা- (১) এর দক্ষিণ প্রান্ত শুরু হয়েছে লাল লাইনের একই প্রান্ত সায়েদাবাদ থেকে। (২) নীল লাইনের উত্তরের শেষ প্রান্ত লাল লাইন ও নীল লাইনের একই শেষ প্রান্ত হয়ে যাচ্ছে উত্তরা। সরকারি পরিকল্পনায় লাল লাইন ও এক্সপ্রেসওয়ে একই রেখার উপরে রয়েছে। এরপর সরকার লাল লাইনে সায়েদাবাদ থেকে উত্তরা মেট্রো রেল নির্মাণ পরিকল্পনা ত্যাগ করে মনো রেল ও তারপর শুধুই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নীল লাইনের মেট্রো রেলের পরিকল্পনা বলবৎ থাকছে।

আওয়ামী লীগ সরকার এরপর থেকে অজানা কারণে মেট্রো রেল নির্মাণের পরিবর্তে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী বলে দেখা যায়। এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনা ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম দূর করবে না, গণপরিবহনেরও কোনো উন্নতি করবে না বরং ধনীদের আরো গাড়ি আমদানি করার উৎসাহ জোগাবে। নগরীতে মেট্রো রেল নির্মাণের উদ্যোগ হলে বুঝতে হবে সরকার সড়কসমূহে ব্যক্তিগত যান বৃদ্ধির চাইতে দ্রুত গণপরিবহন (টৎনধহ জধঢ়রফ গধংং ঞৎধহংরঃ) ব্যবস্থা চালুর প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। মেট্রো রেল কোনো এক দিকে ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারে। তাই প্রশ্ন, সরকার দ্বিধা করছে কেন? এই প্রকল্পের কনসালটান্ট অবপড়স অঁংঃৎধষরধ চৎড়ঢ়ৎরবঃধৎু খঃফ বলছিল প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়ে মালিবাগ জনপথ সড়ক, মগবাজার মৌচাক উড়াল সেতু, তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে মগবাজার সড়ক, বনানী রেল ক্রসিং থেকে মিরপুর সড়ক, এবং কুড়িল উড়াল সেতু প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা কি এসব ব্যয়বহুল প্রকল্প ভেঙে ফেলতে পারি?

মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক ডিজাইনের জন্য ঘওচচঙঘ কড়বর ঈড়সঢ়ধহু, ঔধঢ়ধহ নামের একটি সংস্থাকে নির্বাচন করা হয়েছে (িি.িৎধরষলড়ঁৎহধষ. পড়স/৯ঝবঢ়২০১৩)। জানা গেছে, জাপান ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ সায়েদাবাদ উত্তরা মাস রেল ট্রানজিটের (নীল লাইন) ব্যাপারে আগ্রহী এবং ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা বিলিয়ন ডলার লগ্নি করতে চায়। এ বছর ২৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি ইঞ্জিন ও ১৪৪টি কোচ ক্রয়ের জন্য প্রি কোলিফিকেশন টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে (ঢাকা ট্রবিউিন ০১.০২.২০১৫)। আমরা তাই সময় ক্ষেপণ না করে দ্রুততার সঙ্গে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
(প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।