প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে বিচার বিভাগ
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে বিচার বিভাগ
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-০৯-১৩ ১৯:৪৪:৫৬
প্রিন্টঅ-অ+


ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিচার বিভাগ। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে বদলে যাচ্ছে বিচার বিভাগের কাজের ধরণ।

আদালতে কাজের গতিও বেড়েছে এখন। বাড়ছে মামলা নিষ্পত্তির হার। প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশনের জন্য একের পর এক নানা উদ্যোগ নিয়েছেন।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আমরা বিচার বিভাগের ত্রুটি দূর করে ডিজিটাল জুডিশিয়ারির মাধ্যমে বিচারের ক্ষেত্রে দ্রুততা এবং মানুষের জন্য সহায়ক বিচারিক পদ্ধতি দিতে পারব।’

আদালতে ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং চালু: বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো সিলেটের ২০টি আদালতে ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং চালুর ঘটনা। শিগগিরই দেশের ৬৪টি জেলার আদালতেও এ প্রকল্প চালু হচ্ছে।

ঢাকার নিম্ন আদালতের কয়েকটি ভবনের বারান্দায় মনিটর বসানো হয়েছে। এতে আদালতগুলোর এজলাসের অবস্থান সম্পর্কে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা জানতে পারেন। আগে এ নিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তেন সংশ্লিষ্টরা।

বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভ্যস্ততা বাড়াতে কিছুদিন আগে ঢাকায় একটি কর্মশালাও শেষ করেছে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। আর এসবের পেছনে মূল নিয়ামক ও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান বিচারপতিও স্বপ্ন দেখেন বিচার বিভাগে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগুক। তিনি চান বিচার প্রক্রিয়ায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে। সর্বোপরি ডিজিটাল বিচারব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ায় সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের কষ্ট লাঘব করতে চান তিনি।

অনলাইন কার্যতালিকায় চলছে সুপ্রিম কোর্ট: সুপ্রিমকোর্টে কাগজের পাশাপাশি অনলাইনে ডেইলি কজলিস্ট বা কার্যতালিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের কার্যতালিকা অনলাইনে কাগজের মতো হুবহু ছাপা হচ্ছে।

উচ্চ আদালতের ওয়েব ঠিকানায় (www.supremecourt.gov.bd) গেলে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের কার্যতালিকা, মামলার ফলাফল, কোন আদালতে কোন মামলা বিচারাধীন বা শুনানি হচ্ছে, মামলার বর্তমান অবস্থা, রায় ও আদেশ অনলাইনেই পাওয়া যায়।

এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্টের বার্ষিক ক্যালেন্ডার, প্রধান বিচারপতিসহ অন্য সব বিচারপতির নামের তালিকা, প্রধান বিচারপতিসহ অন্য সব বিচারপতির সংক্ষিপ্ত বায়োগ্রাফি, সুপ্রিমকোর্টে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নামের তালিকা, কেস সার্চ, কজলিস্ট অ্যাপস, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বিভিন্ন নোটিস, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকে।

ওয়েবসাইটে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রুলসও রয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সংবিধান, দেশে প্রচলিত অনেক আইন ও আইন মন্ত্রণালয়ের লিঙ্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান বিচারপতি।

এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার)সাব্বির ফয়েজ রাইজিংবিডিকে বলেন, প্রধান বিচারপতির স্বপ্ন অনুযায়ী বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশনের যাত্রা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দিক নির্দেশনাতেই আমরা এ বিষয়ে অনেক দূর এগোতে পেরেছি।

বিচারকরা ছুটি নিবেন অনলাইনে: এতদিন চিঠি ও ফ্যাক্সের মাধ্যমে ছুটি নিলেও আগামীতে অনলাইনের মাধ্যমে তা করতে পারবেন নিম্ন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা।

ভোগান্তি কমাতে সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এরইমধ্যে একটি ই-এপ্লিকেশন সফটওয়্যারও তৈরি করা হয়েছে। নতুন এ সফটওয়্যার তৈরিতে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের একান্ত সচিব মো. আতিকুস সামাদ।

জানা গেছে, ছুটির প্রয়োজন হলে কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ই-এপ্লিকেশন সফটওয়্যারে প্রবেশ করবেন। ছুটির কারণ ও সময় লিখে অনুমতি চাইবেন। রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। ই-এপ্লিকেশন সফটওয়্যারে অল্প সময়ের মধ্যেই তা জানতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আগামী অক্টোবর থেকেই এ ব্যবস্থা চালু হতে পারে।

সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিম্ন আদালতের বিচারকদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করে সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, আগে ছুটির জন্য আবেদন আসতে ও সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগত। অনেকের জরুরি প্রয়োজনেও ছুটি পেতে দেরি হতো। আবার অনেক সময় ছুটির সিদ্ধান্ত পাওয়ার আগেই হয়তো কাউকে কর্মস্থল ত্যাগ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, এখন থেকে নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে ছুটির ব্যবস্থা হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আর কে কতদিন ছুটিতে থাকছেন এ বিষয়ে হিসাব রাখাও সহজ হবে। এতে ভোগান্তি কমবে।

ভিডিও কনফারেন্সে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিচারকাজ: বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের বিচার কাজ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালনা করার আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

সম্প্রতি বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজড করার লক্ষ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ টু প্রোগামের’ মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় মামলা থাকে। তাদেরকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় নেওয়া খুবই অসুবিধা হয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন টপ মোস্ট টেরোরিস্ট যাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল তাকে জেল থেকে কোর্টে নেওয়ার সময় রাস্তায় সন্ত্রাসীরা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে এখনও ধরা সম্ভব হয়নি। এগুলো থেকে নিস্তার পেতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিচারকাজ পরিচালনা করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টে চালু হচ্ছে ই-লাইব্রেরী: প্রধান বিচারপতির নির্দেশে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাইব্রেরিকে ই-লাইব্রেরিতে রূপান্তর করার। এ জন্য কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

এর আগে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে উদ্বোধন হয়েছে ই-লাইব্রেরি।

জানা গেছে, ই-লাইব্রেরির আগে সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান জাজেস লাইব্রেরিটিকে প্রথমে অটোমেটেডের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ই-লাইব্রেরির জন্য চলবে স্ক্যানিং-এর কাজও। টেন্ডারসহ সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী আগস্ট থেকে কোহা সফটওয়ার-এর মাধ্যমে অটোমেটেডের কাজ শুরু হতে পারে বলে সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এই কাজ শেষ হতে পারে এ বছরই। তবে সময় লাগতে পারে ই-লাইব্রেরির কাজ শেষ হতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক লাখের উপরে বই রয়েছে জাজেস লাইব্রেরিতে। কিন্তু লাইব্রেরি ব্যবহারকারীদের আইডেন্টিফিকেশন কার্ড না থাকায় কার নিকট কতটি বই রয়েছে তার হিসাব সঠিকভাবে রাখা যাচ্ছে না। আর বইগুলোতে সঠিক পদ্ধতিতে অ্যাসোসিয়েশন নাম্বার দেওয়া না থাকায় প্রকৃত সংখ্যাও নিরূপণ করা যাচ্ছে না।

অটোমেটেড হলে সুপ্রিম কোর্টে অবস্থানের সময় সংশ্লিষ্টরা নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কোন বই কোথায় আছে, খুব সহজে সেটা জানতে পারবে। এছাড়াও অটোমেটেডের মাধ্যমে বইয়ের অবস্থান, সার্কুলেশন, রিটার্ন এবং সর্টিংসহ যাবতীয় কাজ কম্পিউটারের মাধ্যমে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে করা যাবে। আর ই-লাইব্রেরি হলে যেকোনো স্থান থেকেই পড়া যাবে বই। সে ক্ষেত্রে সবার জন্যই বই পড়ার সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের পুরাতন ভবন এবং অ্যানেক্স ভবনে জাজেস লাইব্রেরির কার্যক্রম চলছে। তবে অ্যানেক্স-২ হলে ই-লাইব্রেরি স্থায়ীভাবে সেখানে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, আশপাশের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতে স্বল্প পরিসরে ই-লাইব্রেরি আছে। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে আমরাও কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, খুব দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

আইন ও অধিকার এর অারো খবর