এবার নিজামীর পালা
এবার নিজামীর পালা
সংগীতা ঘোষ
২০১৫-১১-২২ ১৮:১৩:৫৬
প্রিন্টঅ-অ+


একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবার জামায়াতে ইসলামীর আরেক শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামীর পালা। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের ৫টি মামলার রায় কার্যকর করা হলো। এর আগে আরো ৩টি মামলার চূড়ান্ত রায় কার্যকর করা হয়। ৩টি রায়ের মধ্যে ২টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একটিতে আমৃত্যু দণ্ড দেয়া হয়। মামলার ধারাবাহিকতায় এখন নিজামীর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। যে সাজা বর্তমানে ভোগ করছেন সাঈদী।

নিজামী ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আরো ৭টি মামলার আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন মীর কাসেম আলী, মোবারক হোসেন, সৈয়দ কায়সার, এটিএম আজহার, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার, ফোরকার মল্লিক, মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটু। এ ছাড়া শুনানি চলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম মারা যাওয়ায় তাদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে।

বর্তমানে একীভূত ট্রাইব্যুনালে ১৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি মামলার শুনানি চলছে। দুটি মামলার কাজ প্রায় শেষের পথে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর ১০টি মামলা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের তদন্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে মৌলভীবাজারের আলাউদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা আকমল আলী, মো. মতিন মিয়া, কক্সবাজারের মহসীন হায়দার চৌধুরী, সালামত উল্লা খান, নেত্রকোনার আবদুল খালেক তালুকদার, আলবদর কমান্ডার শামসুল হক, রাজাকার কমান্ডার নেছার আলী, রাজাকার কমান্ডার ইউনুস মৌলভী, রাজাকার আবদুল মতিন, রাজাকার আজিজ (হাবলু), মো. রিয়াজ উদ্দিন ফকির, আবু ছালেহ মো. আজিজ মিয়া ঘোড়া মারা আজিজ, ময়মনসিংহের আবুল ফালাহ মুহাম্মদ ফাইজ্জুল্লাহ।

দ্বিতীয় ধাপে চলতি বছরের ৩১ মার্চ আরো ৭টি মামলা ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের লিয়াকত আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ মোহাম্মদ হোসাইন ওরফে হোসেন, গোপালগঞ্জের এনায়েত মোল্লা, পটুয়াখালীর আয়নাল খাঁ, পটুয়াখালীর মো. আশ্রাব আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমদাদুল হক ওরফে টাক্কাবালী।

বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাধিক নেতাসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে বিচারের জন্য ১৯টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, দলটির বর্তমান নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মাওলানা আবদুস সুবহান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নির্বাহী সদস্য মীর কাসেম আলী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও এটিএম আজহারুল ইসলাম, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আবদুল আলীম ও ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার সাবেক মেয়র বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন, জাতীয় পার্টির নেতা হবিগঞ্জের সৈয়দ মো. কায়সার, পিরোজপুরের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার, সাবেক জামায়াত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন ও হাসান আলী। প্রবাসী দুই বাংলাদেশি চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটু। তাদের মধ্যে জাহিদ হোসেন খোকন, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান পলাতক থাকায় তারা আপিল করতে পারেননি।

মতিউর রহমান নিজামী: গত বছরের ২৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মতিউর রহমান নিজামী আপিল করেন। তৃতীয়বারের মতো মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। সর্বশেষ ১৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার আপিলে পেপারবুক থেকে প্রসিকিউশনের ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৯ সাক্ষীর সাক্ষ্য পাঠ শেষ হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে তৃতীয় দিনের শুনানি হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। শুনানিতে নিজামীর আপিলের পেপারবুক পড়েন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির। সরকার পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

৯ সেপ্টেম্বর এই আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল। মাঝে সুপ্রিম কোর্টের দেড় মাসের অবকাশ ছুটি থাকায় শুনানি ২ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। ২ নভেম্বর নিজামীর আপিল আবেদনটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ১০ নম্বরে ছিল। তবে আদালত ৩ নভেম্বর নিজামীর আপিলের শুনানির দিন ধার্য করলেও ওই দিন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি অনুপস্থিত থাকায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।

গত বছরের ২৩ নভেম্বর নিজামীর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। ১২১ পৃষ্ঠার মূল আপিল আবেদনে ১৬৮টি যুক্তি দেখিয়ে নিজামীর খালাস চাওয়া হয়।

আবেদনে ৬ হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার নথিপত্র জমা দেয়া হয়।
এর আগে মতিউর রহমান নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়ে রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। নিজামী একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধচলাকালে রাজাকার-আলবদরদের পরিকল্পনা, নির্দেশনা দিতেন এবং তারই নেতৃত্বে বদরবাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর প্রধান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসাইন ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক।
নিজামী ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন, যা বর্তমানে ছাত্রশিবির নামে পরিচিত।

আলবদর বাহিনী ছিল ছাত্রসংঘের ‘অ্যাকশন সেকশন’। স্পষ্টতই ছাত্রসংঘ ও আলবদরের ওপরে নিজামীর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ছিল। নিজামী মনপ্রাণ দিয়ে শুধু বাংলাদেশের বিরোধিতাই করেননি, তিনি পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী, আজহারুল হক ও হুমায়ুন কবিরের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। একাত্তরে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ও আলবদর বাহিনীর প্রধান নিজামী নিজে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় অংশগ্রহণ করেন। যা প্রমাণিত হয়েছে এবং এর দায়ে নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
(জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

আইন ও অধিকার এর অারো খবর