৩২ নম্বরে মানুষের ঢল
৩২ নম্বরে মানুষের ঢল
২০১৬-০৮-১৫ ১৭:২০:১৬
প্রিন্টঅ-অ+


শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। শুধু মানুষ আর মানুষ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই ছুটছেন সমানে। তাদের পরনে লাল-সবুজ, সাদা-কালো নানান রংয়ের পোশাক। বুকে কালোব্যাজ, হাতে ফুল ও কালো পতাকা। আছে পুস্পস্তবকও।

সোমবার ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পথ ধরে মুজিব স্মরণে হাজারো শোকার্ত মানুষ তাদের যাত্রা শুরু করেন ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে। এক চল্লিশ বছর আগে যেখানে থাকতেন, বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ মানুষটি নেই, সেখানে আছে তার প্রতিকৃতি। সেই প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে যদি জনক হারানোর শোক খানিকটা লাঘব হয়-এই অনুভূতি থেকে।

আজ সোমবার ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর ৪১ তম বার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষে শোক, শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় পুরোজাতি বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

দিনের প্রথম প্রহরে ভোর সাড়ে ৬টায় জনকের প্রতিকৃতিতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা ছাড়াও তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। তিন বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এর পর শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া এবং প্রধান বিচারপতি সুদির কুমার (এসকে সিনহা) জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু ভবনের ভেতরে যান। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালরাতে ওই ভবনের যে সিঁড়িতে ঘাতকদের গুলিতে বঙ্গবন্ধুর প্রাণহীন দেহ পড়েছিল, সেখানে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন তিনি। ওই স্থানটিতে বসে কিছু সময় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে শাহাদাত বরণকারী বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া করেন। সেখানে ঘুরে ঘুরে তার বাবার স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখেন।

প্রায় আধাঘণ্টা বঙ্গবন্ধু ভবনে অবস্থান শেষে প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে গিয়ে তার পরিবারের অন্য সদস্য ও স্বজনসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে পুষ্প অর্পণ করেন। কবরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন তিনি। এরপর পবিত্র ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। এখানেও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কবরস্থান মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়া যান।

এদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের মানুষ। ভোর থেকেই জাতির জনকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে ও আশপাশের রাস্তায় জড়ো হতে থাকেন। এক পর্যায়ে জড়ো হওয়া মানুষের ভিড় বঙ্গবন্ধু ভবনের আশপাশ পেরিয়ে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন তারা। এ সময় জোরালো কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবিটি।

দিবসটি উপলক্ষে ছিল সরকারি ছুটির দিনও। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ভবন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করে। সংবাদপত্রগুলো শোক দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে বিশেষ অনুষ্ঠান।

আওয়ামী লীগ ছাড়াও সেখানে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, গণফোরাম, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় পার্টি (জেপি), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, পুলিশের আইজি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর, তথ্য কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, নজরুল ইনস্টিটিউট, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, শিশু একাডেমি, খেলাঘর, কচি-কাঁচার মেলা, বাংলাদেশ বেতার, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পুলিশ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন, বিসিএস বেতার কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, গণজাগরণ মঞ্চ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা কৃষিবিদ পরিষদ, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, শেখ রাসেল শিশু সংসদ, বাংলাদেশ বিমান, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ছিন্নমূল হকার্স লীগ, রেলওয়ে শ্রমিক লীগ, বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদ, প্রশিকা, জয়বাংলা সাংস্কৃৃতিক ঐক্যজোট, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বিআরডিবি, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ফিল্ম আর্কাইভ, বিনিয়োগ বোর্ড, শিল্প গবেষণা পরিষদ, পলিটেকনিক শিক্ষক পরিষদ, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, জাতীয় মহিলা সংস্থা, তরুণ লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, হকার্স লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, বিসিএস পাবলিক ওয়ার্কার্স ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন।

দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর অলিগলিতে মাইকে বাজছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গান ও কবিতা এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণামূলক গানও চলছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। থানা, ওয়ার্ড ও মহল্লাগুলোতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী কোরআনখানি, মোনাজাত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলছে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে দুস্থ ও গরিব মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর থানা ও ওয়ার্ড ইউনিটগুলো। সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া চলছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে ধানমন্ডির পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী। যা এর আগে দেখা যায়নি। বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে কয়েকস্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে বঙ্গবন্ধু ভবনে প্রবেশে জটিলতায় পড়তে হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আটকা পড়েন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও। প্রায় ১০ মিনিট তাদের আটকা পড়ে থাকতে হয় বঙ্গবন্ধু ভবনের পূর্ব পাশের প্রবেশমুখে। পরে প্রবেশাধিকার পান তারা দুইজন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য শেষ পর্যন্ত প্রবেশাধিকার পাননি।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর