সন্তানসহ আইএসে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ব্রিটেনের তিন বোন
সন্তানসহ আইএসে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ব্রিটেনের তিন বোন
স্টাফ রিপোর্টার
২০১৬-০৮-১৫ ০৭:২৩:৪২
প্রিন্টঅ-অ+


ব্রিটেনের তিন বোন খাদিজা দাউদ (৩০), জোহরা দাউদ (৩৩) এবং সুগরা দাউদ (৩৪)। গত গ্রীষ্মে তারা ব্রাডফোর্ড থেকে নিজেদের নয় সন্তানকে নিয়ে আইএস-এ যোগ দিতে সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। তাদের পাঁচ মেয়ে এবং চার ছেলের বয়স তিন থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।

সৌদি আরবে হজ পালন করার পর বাড়িতে না ফিরে তারা বিমানে করে ইস্তানবুলে যায়। সেখান থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়ায় পাড়ি জমায়। ওই তিন বোন তাদের ভাই আহমেদ দাউদের সঙ্গে যোগ দেয়। আহমেদ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইএস-এর পক্ষে যুদ্ধ করছিল।

ব্রিটেন থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এ যোগ দেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্কুলছাত্রী খাদিজা সুলতানার ঘটনা সামনে আসার পর ব্রিটেনের নারীদের আইএস-এ যোগ দেওয়ার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।

পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন স্কুলের শিক্ষার্থী ১৭ বছর বয়সী খাদিজা স্কুলের ছুটি কাটানোর সময় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্য থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। তার সঙ্গে ছিল দুই বন্ধু শামীমা বেগম ও আমীরা আব্বাসি। সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার সময় খাদিজার বয়স ছিল ১৬ বছর। আর শামীমা ও আমীরার বয়স ছিল ১৫ বছর। তুর্কি সিমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে তারা আইএস-এ যোগ দেয় বলে জানা গেছে।

বিমান হামলায় খাদিজা নিহত হয়েছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর খাদিজার বিয়ে হয়েছিল এক সোমালি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে। তার স্বামীও নিহত হয়।

ওই তিন কিশোরীর পরিবারের আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে বলেছেন, আমীরা এবং শামীমারও আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। তবে আমীরার স্বামীও নিহত হয়েছে। তবে ওই দুই কিশোরী জীবিত রয়েছে বলে আকুঞ্জি জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার খাতিরে তাদের অবস্থান জানাননি তিনি।

২১ বছর বয়সী আকসা মাহমুদ আইএস-এ যোগ দিতে গ্লাসগো থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে যায় ২০১৩ সালের নভেম্বরে। সে এর আগে আইএস-এর জঙ্গি হামলার পক্ষে অনলাইনে প্রপাগান্ডা চালাতো আর ব্রিটিশ নারী ও তরুণীদের আইএস-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতো। ধারণা করা হয়, বেথনাল গ্রিন স্কুলের তিন শিক্ষার্থীর আইএস-এ যোগ দেওয়ার পেছনেও তার হাত রয়েছে।

আকসা এক আইএস জঙ্গিকে বিয়ে করেন। তাকে আইএস-এর আল-খানসা ব্রিগেডে উচ্চপদ দেওয়া হয়। ওই নারী ব্রিগেডের কাজ হলো নারী এবং শিশুদের আইএস-এর কথিত শরিয়া অনুযায়ী শাস্তির বিধান করা। শাস্তির মধ্যে রয়েছে নারীদের পুরুষ নিকটাত্মীয় ছাড়া ঘরের বাইরে আসলে গ্রেফতার ও মারধর এবং নম্র আচরণ না করলে দোররা মারা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে আকসা এবং স্যালি-অ্যান জোনস-এর ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কেন্টের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী স্যালি-অ্যান জোনস (আইএস-এর দেওয়া নাম উম হোসাইন আল-ব্রিটানি)-এর জন্ম খ্রিস্টান পরিবারে হলেও সে কিশোর বয়সে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল।

তার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে স্যালি ২০১৩ সালে সিরিয়ায় পথে পা বাড়ায়। সেখানে আইএস হ্যাকার জুনাইদ হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ড্রোন হামলায় জুনাইদের মৃত্যুর পর স্যালি টুইটারে জানিয়েছিল, সে তার স্বামীর জন্য গর্বিত। মার্কিন ও ব্রিটেন ড্রোন হামলার তালিকায় স্যালির নাম রয়েছে।

২৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী ডেয়ার আইএস-এ যোগ দেওয়া একেবারে প্রথম দিককার ব্রিটিশ নাগরিক। ২০১২ সালে আইএস-এ নাম লেখাতে সে সিরিয়ায় যায়। তিনি সঙ্গে করে তার একমাত্র শিশু ইসাকেও নিয়ে গিয়েছিল।

ডেয়ারের জন্মও দক্ষিণ লন্ডনের এক খ্রিস্টান পরিবারে। কিন্তু কিশোর বয়সে সে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। চ্যানেল ফোর-এ ব্রিটিশ নারীদের আইএস যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে নির্মিত এক প্রামাণ্যচিত্রে তার কথা উল্লেখ করা হয়।

সিরিয়ায় পৌঁছে তার নতুন নাম হয় মরিয়ম। তখন তার বিয়ে হয় সুইডিশ বংশোদ্ভূত আইএস জঙ্গি আবু বকরের সঙ্গে। পরে আবু বকর নিহত হয়।

প্রকাশিত খবরে জানা যায়, তখন তার গর্ভে ছিল আরেকটি শিশু। কিন্তু ডেয়ার সিরিয়া ছেড়ে যেতে অস্বীকার করে এবং সেখানেই তার সন্তানকে বড় করে তুলবে বলে জানিয়েছিল। তার এই বক্তব্য আইএর প্রপাগান্ডায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। ডেয়ারই আইএস-এর হাতে বন্দি জেমস ফলি-কে জবাই করে হত্যা করেছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার ছেলে চার বছর বয়সী ইসা-কে আইএস-এর এক প্রপাগান্ডা ভিডিওতে দেখা যায়, যেখানে সে আইএস-এর ‘হেড ব্যান্ড’ পরেছিল। ওই ভিডিওতে ইসা বলছিল, ‘আমরা এখানে সব কাফেরদের হত্যা করবো।’

অনেক ব্রিটিশ নারী মরীচিকার সুখে আইএস-এ যোগ দিতে পাড়ি জমিয়েছে সিরিয়ার পথে। কিন্তু এখানে খাদিজা সুলতানার ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। স্বামী নিহত হওয়ার পর ঘোর কাটতে থাকে খাদিজার। সে বুঝতে পারে, আসলে সে এক মরীচিকার দিকে ছুটছিল।

খাদিজার সামনেই ১৭ বছর বয়সী অস্ট্রীয় কিশোরী সামারা কেসিনোভিচকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সামারাকে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা খাদিজার ওপর ভীষণ প্রভাব বিস্তার করে বলে খাদিজার পারিবারিক আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জি জানিয়েছেন। তিনি বিবিসি নিউজনাইট-কে বলেন, ‘যদি পালাতে গিয়ে আপনি আইএস-এর হাতে ধরা পড়েন, তাহলে তারা আপনাকে শাস্তি দেবে, আর এই শাস্তি ভীষণ বর্বর।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইএস ত্যাগ করাটা, অ্যালকাত্রাজ (সান ফ্রান্সিসকোর একটি বিচ্ছিন্ন দীপ, যেখানে রয়েছে মার্কিন সেনা কারাগার) থেকে বেরিয়ে আসার মতোই। যেখানে হত্যার জন্য গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া আছে।

তাসনিম আকুঞ্জি বলেন, ‘যে সপ্তাহে সে (খাদিজা) আইএস ছেড়ে আসার কথা ভাবছিল, এক অস্ট্রীয় কিশোরী (সামারা কেসিনোভিচ) আইএস এলাকা থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে। তাকে জনসমক্ষে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভবত খাদিজা ওই ঘটনায় ভয় পেয়ে সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি।’

অস্ট্রীয় কিশোরী সামারা কেসিনোভিচ গত বছর তার দেশ থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে আইএস-এ যোগ দিয়েছিল। মোহভঙ্গ হওয়ায় সে আইএস থেকে পালিয়ে আসতে চেয়েছিল।

খাদিজার আইএস ত্যাগের চেষ্টা অন্যদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আকুঞ্জি বলেন, এই হৃদয়বিদারক ঘটনার একটা ইতিবাচক দিক হতে পারে, যারা এখনও সেখানে যেতে আগ্রহী, যুদ্ধ এলাকা সম্পর্কে তারা একটা ধারণা পেতে পারেন। যা থেকে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ধারণা করা হচ্ছে, খাদিজা তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে ফোনে তার বোন হালিমার সঙ্গে কথা বলেছিল। সে বলেছিল, ‘আমার ভালো লাগছে না, আমি ভয় পাচ্ছি। হয়তো আপনাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ হালিমা তাকে সাহস যুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি তোমার অবস্থা বুঝতে পারছি। ভয় পেও না। আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখো।’

খাদিজা আরও বলেছিল, ‘এখন সীমান্ত বন্ধ, আমি কিভাবে এখান থেকে বের হবো? আমি পিকেকে (কুর্দি বাহিনী) অঞ্চল দিয়ে বাইরে আসতে পারবো না।’

হালিমা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি বেরিয়ে আসার ব্যাপারে কতোটা আত্মবিশাসী?’ খাদিজা ততদিনে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তার উত্তর, ‘শূন্য... মা কোথায়? আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’ এরপরই ফোনের লাইন কেটে যায়। মায়ের সঙ্গে আর কথা বলা হয়নি খাদিজার।

খাদিজার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরই হালিমা জানিয়েছিলেন, ‘তাকে (খাদিজা) খুবই ভীত মনে হচ্ছিল। সে খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। আমি খুবই অসহায় বোধ করছি। আমি কীই বা করতে পারি? এটা খুবই কষ্টের। আমি মনে করি না, সে নিজ থেকে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এটাই সবচেয়ে বড় কথা।’

ধারণা করা হচ্ছে, ওই ফোন কলের পরই বিমান হামলায় খাদিজা নিহত হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর খাদিজার মৃত্যুর বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করেনি।

উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ব্রিটেনের অন্তত ৮০০ নাগরিক আইএস-এ যোগ দিতে সিরিয়া পাড়ি জমিয়েছেন। এরমধ্যে অন্তত ২৫০ জন ফিরে এসেছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য গার্ডিয়ান, ডেইলি মেইল।


ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিদেশ এর অারো খবর