ঢাকা হতে পারে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শহর
ঢাকা হতে পারে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শহর
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-০৮-১০ ০৫:৩১:৪৪
প্রিন্টঅ-অ+


বৃহত্তর ঢাকার চারদিকে টলটলে নদীর পানির বেষ্টনী তৈরি করে ঢাকাকে দুনিয়ার সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও টঙ্গী খালের সংস্কার, বর্জ্য অপসারণ, খনন ও নাব্য ফিরিয়ে এগুলোকে সংযুক্তির মাধ্যমে ঢাকাকে সুন্দর এবং পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে আগামী প্রজন্মকে উপহার দেয়ার জন্য আমাদের কাজ করে যাওয়ার সময় এসেছে।

১০০ মি. গড় প্রশস্ততায় প্রায় ২২০ কিলোমিটার নদী পথটি ঢাকার চারদিকের একটি চমৎকার পরিবেশবান্ধব এবং শত শত বছরের জন্য নগরবাসীর একটি নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে পারে। পণ্য পরিবহন সহজ ও নিরাপদ যাতায়াত এবং যানজট নিরসনে এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য দরকার ১৬২ কিলোমিটার নদীর পুনর্খনন। যমুনা বা নিু ব্রহ্মপুত্র থেকে নয়া ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশী-তুরাগ হয়ে তারপর বুড়িগঙ্গা। তাহলে শুষ্ক মৌসুমে এ নদী পথগুলোর নাব্য ফিরে আসবে।

এছাড়া ধলেশ্বরী নদীর আরও একটি পুরনো সংযোগ সংস্কার ও পুনর্খননের মাধ্যমে সংযুক্তির ফলে বুড়িগঙ্গার প্রবাহ সারা বছরের জন্য নিশ্চিত করা যাবে। এভাবে শাখা নদীগুলোর সংযুক্তির ফলে দূষণ কমে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে। জেগে ওঠা চরগুলো অপসারণের মাধ্যমে নদীগুলোর একটি গড় প্রশস্ততা হিসাব করে উভয় পাড়ে বাঁধ দিয়ে সেচ ব্যবস্থা, মৎস্যচাষ এবং ফসলি জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

যদিও মূল লক্ষ্য হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীর নাব্য বৃদ্ধি করা। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে হুগলি নদীতে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার ফিডার ক্যানেল নির্মাণের জন্য যে ব্যয় করা হয়েছে, আমাদের উল্লিখিত প্রকল্পটির জন্য সেই তুলনায় সামান্য ব্যয় করলেই তা সফলতার মুখ দেখতে পারে। সমগ্র এ নদীপথটি সংস্কার-ড্রেজিংয়ের ফলে নদীপথের ২২টি সেতুর কম-বেশি পুনর্গঠন করতে হতে পারে। পথিমধ্যে কোনো যুৎসই স্থানে একটি ফ্লাশ সুইচ নির্মাণ, নিঃসরিত পলিমাটির ব্যবস্থাপনা এবং কোনো কোনো বাঁকে হার্ডরকের বাঁধাই প্রয়োজন হতে পারে।

মূলত একটি প্রবহমানতার জন্য যমুনার পানি নয়া ধলেশ্বরীর উজান থেকে পুংলী, বংশী, তুরাগে নিয়ে বুড়িগঙ্গায় প্রবাহিত করতে হবে। মূল যমুনার আরও দক্ষিণ থেকে ধলেশ্বরীর অন্য শাখাটিও বুড়িগঙ্গার সঙ্গে সংযুক্তি ঘটাতে হবে। ঢাকার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কলাতিয়ার কাছে প্রবাহটি এক সময়ে ধলেশ্বরীর প্রবাহ দ্বারাই বাহিত ছিল। বংশী নদীটির প্রবাহ থেকে বেয়ে চলা তুরাগ দক্ষিণে মিরপুরে বুড়িগঙ্গার মূল ধারায় সংযুক্ত। প্রধান দুটি প্রবাহ হচ্ছে কামরাঙ্গীরচর ও বসিলার খাল। বসিলার গুরুত্বপূর্ণ এ সংযোগ খালটি দখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এটিকে দখলমুক্ত করে খালটি প্রশস্ত করতে হবে।

১৭০০ শতাব্দীতে মোগলরা যখন বুড়িগঙ্গার তীরে তাদের রাজধানী স্থাপন করে তখন নদী তীরবর্তী অঞ্চলটি ঘিরেই গড়ে উঠতে থাকে বসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি। চারশ’ বছর পরও আজ অব্দি এ বুড়িগঙ্গা নদীটি নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শত শত বছর এ নদী ব্যবহৃত হয়েছে পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, দখল ও দূষণ, উজানে চরপড়া, শক্তবর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন নদীটিকে করেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদী। প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার লোক এটিকে নানা কাজে ব্যবহার করছে। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার আগের সময়টিতে ২৯ কিলোমিটার নদী ও খাল এবং ১৩১ বর্গকিলোমিটার জলাভূমি ২০০৯ সালে নেমে আসে যথাক্রমে ১১ কিলোমিটার ও ৫৪ বর্গকিলোমিটারে। বলা হয় এগুলো ঢাকার আয়তনের ২১ ভাগ।

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৭০০০ শিল্প-কারখানা থেকে ১৫ লাখ কিউবিক মিটার দূষিত পানি ও বর্জ্য বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, টঙ্গীখাল ও বালু নদীতে পতিত হচ্ছে। আরও প্রায় ৫ লাখ কিউবিক মিটার দূষণ হচ্ছে অন্যান্য উৎস থেকে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ অংশে বালু নদীটির উভয়পাড় ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ অংশে নদীটি দখল হয়েছে আগেই।

রাজধানীর নতুন বাজার থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে শ্মশানঘাট এলাকাটি একশ্রেণীর রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের দ্বারা দখল করা হয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নদীটির বিস্তীর্ণ পাড় ভরাট করে তাদের পূর্বাচল শহর প্রকল্প গড়ে তুলছে। একটি দেশে আইনের শাসন না থাকলে যা হয় এটি একটি দৃষ্টান্ত।

খলামুড়া থেকে তেরামুখ টঙ্গীকে ভেদ করে ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ তুরাগ নদীটি জেলা প্রশাসন, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদফতর এবং পুলিশের নাকের ডগায় শীর্ণকায় এক খালে পরিণত হয়েছে।

এক সময়ের কাহার দরিয়া আজ মৃত। দুরন্ত সেই তুরাগ আজ ভূমিদস্যুদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে প্রতিদিন। টঙ্গী-আশুলিয়া সংযোগ সড়কসহ বিরুলিয়া সেতু, ধৌর সেতু, প্রত্যাশা সেতু, কামারপাড়া সেতু সংলগ্ন অসংখ্য স্থানে নদী ভরাট/দখল চলছে অবিরাম। বিষয়টিকে আরও সুবিধা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসনের একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ভুল সীমানা পিলার। এক সময় তুরাগ নদীর গড় প্রশস্ততা ছিল ১০০ মিটার। পানি ছিল টলটলে। নদীটির দূষণের মাত্রা হৃদয়বিদারক, ভয়াবহ। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ২ মিলিগ্রাম/লিটার। যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম/লিটার না থাকলে মাছসহ কোনো জলজপ্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। রাসায়নিক ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, মারকারি ও অন্যান্য শিল্পবর্জ্য পানির তলদেশে মিশে যাওয়ার ফলে চাষাবাদ, মৎস্যচাষ, গোসল কোনো কাজেই এর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ঢাকার ১৫ মাইল উত্তরে তুরাগ নদীটির তীরঘেঁষে প্রতিনিয়ত দূষণ হচ্ছে টেক্সটাইল মিল, লিডব্যাটারি, কাগজ ও মণ্ড, ওষুধশিল্প, রঙ, ডিটারজেন্ট, লোহা ও স্টিল কারখানা, রাবার কারখানা ইত্যাদি থেকে নির্গত অশোধিত পানি এবং বর্জ্য নদীটিকে দূষণের এক চরম মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

কালিয়াকৈর অঞ্চলের কারখানাগুলোর অশোধিত বিপুল পরিমাণ বর্জ্য বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে মুকশ বিলের মাধ্যমে তুরাগের জন্য হয়েছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এতে কালিয়াকৈর অঞ্চলের জলাভূমি ও তুরাগ-বংশী নদী তীরবর্তী মানুষ সরাসরি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে।

একটি সার-কারখানা, একটি থারমাল পাওয়ার স্টেশন, টেক্সটাইল এবং ডাইং কারখানাসহ শত শত শিল্প-কারখানার বর্জ্য ঘোড়াশাল থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত ক্রমাগত দূষিত করে মেরে ফেলেছে শীতলক্ষ্যা নদীটিকে।

বালু ও টঙ্গী খাল দখল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দূষণ হচ্ছে অবিরাম। নদীগুলোর কোনোটিতেই এখন আর কোনো প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সিজেন নেই। ঢাকার চারদিকের পানি বেষ্টনী নদীগুলোতে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ আগামী প্রজন্মের আমিষের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ২২ ভাগ খাবার পানির জোগান দিচ্ছে নদীগুলো থেকে। তখন খাবার পানির পুরোটাই নদীর পানি থেকে জোগান দেয়া সম্ভব হবে।

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নদী সীমানা নির্ধারণের জন্য মোট ৪০৬৩টি সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪২২টি পিলার সঠিক স্থানে স্থাপন করা হয়নি, ২৬৪টি পিলার ধ্বংস হয়ে গেছে, ১৪৮টির কোনো চিহ্ন নেই এবং ৩৬টি সীমানা পিলার পাওয়াই যাচ্ছে না।

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদী রক্ষার্থে সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করলে ২০০৯ সালে মহামান্য হাইকোর্ট নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদের নির্দেশ প্রদান করেন। টাস্কফোর্সের একজন সদস্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের মতে ‘আমরা নদী বাঁচানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমরা শুধু সুপারিশ করতে পারি কিন্তু বিষয়টিকে কার্যে পরিণত করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’

ঘনবসতির এই ঢাকাকে বাসযোগ্য ও নয়নাভিরাম, পরিবেশবান্ধব একটি আধুনিক শহরে পরিণত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত শহর উপহার দেয়ার জন্য আমাদের প্রকল্পটি নিয়ে ভাবতে হবে। সিঙ্গাপুরের একটি নদীও আমাদের বুড়িগঙ্গার মতো এক সময় দূষিত ছিল। আজ সেই নদীটি পরিণত হয়েছে একটি সম্পদে। তেমনি বোস্টন নগরীর চার্লস নদীটির কথা বলা যায়। ১৯৬৬ সালে স্টেন্ডেল নামক এক ব্যক্তি ‘ডার্টি রিভার’ নামে যে গানটি রচনা করেন তা দিনে দিনে হয়ে ওঠে জনপ্রিয় এবং ফিরতে থাকে মানুষের মুখে মুখে। গানটির প্রচারের ফলে কর্তৃপক্ষ চার্লস নদীটির ওপর গুরুত্ব দেয় এবং অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে চার্লসটন নদীটির আজকের টলটলে পানির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনে, যেটি আজ বোস্টনের একটি অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়েছে।

এর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে আমাদের উল্লিখিত ঢাকার চারদিকের এই নদী বেষ্টনীটি। যেটি দেখার জন্য হয়তো আগামী দিনগুলোতে দুনিয়ার তাবৎ পর্যটকই উদগ্রীব থাকবে। ঢাকার চারদিকে নৌবিহার, চাঁদিনীরাতে নৌযানে রাতযাপন, মৎস্যচাষ, সবুজ বেষ্টনী ইত্যাদি একটি নয়নাভিরাম পরিবেশবান্ধব শহর-এ উন্নীত করতে পারে প্রিয় এই শহর ঢাকাকে।

(বেলাল আহমেদ : গবেষক; সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

পরিবেশ এর অারো খবর