জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারসহ আরো ৮ জন চিহ্নিত
জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারসহ আরো ৮ জন চিহ্নিত
ডেস্ক রিপোর্ট
২০১৬-০৮-০৫ ২০:৩৮:১৪
প্রিন্টঅ-অ+


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স থেকে পাস করা তুহিন প্রায় দেড় বছর ধরে নিখোঁজ। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তুহিন ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে কিছু দিন পর ছেড়ে দেন। এরপর স্যামসাং মোবাইল ফোন কোম্পানির কাওরান বাজারের অফিসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ নেন। এর পর থেকেই হঠাৎ করেই তুহিন নিখোঁজ। সম্প্রতি তার জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা।

পুলিশ ও গোয়েন্দারা অনুসন্ধান করে দুটি পরিবারের সবার জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যও জানিয়েছেন।

সায়মা আক্তার মুক্তা ও রাবেয়া আক্তার টুম্পা আপন দুই বোন। তাদের বিয়ে হয়েছে যথাক্রমে সাইফুল হক সুজন ও শরিফুল হক ইমন নামে আপন দুই ভাইয়ের সঙ্গে। মুক্তা-টুম্পাদের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার করফা গ্রামে। আর সুজনদের বাড়ি খুলনার পাকুড়তিয়া গ্রামে। বিয়ের পর দুই ভাই ও দুই বোনের পরিবারের সবাই জড়িয়ে পড়ে জঙ্গি কার্যক্রমে। এদের মধ্যে গেল বছর সিরিয়ায় আইএস বিরোধী হামলায় নিহত হয়েছে সুজন। সেই থেকে দুটি পরিবারের অন্য সদস্যরা কোথায় আছেন জানে না কেউ। পুলিশ ও গোয়েন্দারা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছেন দুটি পরিবারই জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। তবে তারা দেশে না বিদেশে সেটা নিশ্চিত নয়।

এছাড়া আরো ৬ জনের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে একজন চিকিত্সকও আছেন। আছেন একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। এদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

গোয়েন্দারা বলছেন, তারা সরাসরি জঙ্গি তত্পরতায় যুক্ত। কেউ কেউ বিদেশে থেকে জঙ্গি কার্যক্রমে মদদ দিচ্ছেন। আবার কেউ দেশেই পালিয়ে আছেন। এই ৬ জন হলেন- সাবেক সচিব মোহাম্মদ মূসা সাদিকের ছোট ছেলে সাইমুন হাছিব মোনাজ, গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়াবাজার গ্রামের মৃত তৌহিদুল ইসলামের ছেলে মো. রিদওয়ান ইসলাম তুহিন, আশুলিয়ার টুঙ্গাবাড়ীর আব্দুল মালেকের ছেলে আব্দুর রহমান মাসুদ, রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের মৃত ওয়াসিকুর আজাদের ছেলে ডা. আরাফাত-আল-আজাদ ওরফে আবু খালিদ আল বাঙালি ওরফে ডা. তুষার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মৃত শফিউর রহমানের ছেলে তাহমিদ রহমান সাফি ওরফে আবু ইছা আল বাঙালি এবং বগুড়ার কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ ইকবালের জামাতা এ কে এম তুরকিউর রহমান।

জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে ঘরছাড়া টুঙ্গিপাড়ার দুই বোনের বাবার নাম মৃত ছোলেমান শেখ। আর খুলনার পাকুড়তিয়া গ্রামের এ কে এম আবুল হাসনাতের ছেলে সাইফুল হক সুজন ও শরীফুল হক ইমন।

টুিঙ্গপাড়া থানার ওসি মাহমুদুল হক বলেন, ‘মুক্তার স্বামী সাইফুল হক সুজন সিরিয়ায় আইএস বিরোধী হামলায় ২০১৫ সালে মারা যান। ওই সময় তিনি আইএস ঘাঁটিতে ছিলেন।’ এ ঘটনার পর জঙ্গি অর্থায়নে সহযোগিতার অভিযোগে ঢাকার কাওরানবাজার থেকে সুজন-ইমনের বাবা হাসনাতকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তিনি এখনও কারাগারে।

মুক্তা ও টুম্পার সঙ্গে টুঙ্গিপাড়ায় তাদের বাবার বাড়ি করফা এবং শ্বশুরবাড়ি খুলনার পাকুড়তিয়া গ্রামের কোনো যোগাযোগ নেই বলে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে সুজনের সর্বশেষ বাসার ঠিকানা ছিল খুলনার ইকবাল নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে এবং ইমনের সর্বশেষ ঠিকানা ছিল ঢাকার মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেটের পাশে। তবে ওই এলাকায় গিয়ে খোঁজ করেও দুজনের কোনো আত্মীয়-স্বজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। মুক্তা ও টুম্পার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ার করফা গ্রামে গিয়ে তাদের পরিবারের কারো সন্ধান মেলেনি। ওই বাড়িতে তাদের দূর সম্পর্কের চাচা আসাদ শেখ ও তার স্ত্রী বিউটি বেগম সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন।

বিউটি বেগম বলেন, ছোলেমান শেখের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। ছোলেমান খুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। সেখানেই তার মেয়েরা বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে। আর খুলনার পাকুড়তিয়া গ্রামের বাসিন্দা বায়জিত মিয়া বলেন, আবুল হাসনাতের ছেলে সুজন গত বছর সিরিয়ায় আইএসের আস্তানায় রুশ হামলায় নিহত হয়েছিল বলে সবাই জানে।

সাবেক সচিব মোহাম্মদ মূসা সাদিকের ছেলে সাইমুন হাছিব মোনাজ দুই বছর আগে মালয়েশিয়া চলে যান বলে বনানীতে সাবেক সচিব মূসার বাসার তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী জানান। ‘ছেলেটা খুব ভালো ছিল, নামাজ পড়ত, মুখে হালকা দাড়ি ছিল। সব সময় মাথা নিচু করে চলাফেরা করত। কথা খুব কম বলত। বিয়ের সাত দিনের মাথায় সে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তার স্ত্রী ১০/১৫ দিন পর বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন,’ বলেন তিনি। বনানীর ২৩ নম্বর সড়কের ২২ নম্বর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী বুধবার দুপুরে এসব বলেন।

তবে মুসা সাদিক এই বাসায় থাকেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্যার ১৮ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে থাকেন। মাঝে মধ্যে এই বাসায় আসেন। এখানে তার বড় ছেলে মেহমুদ ও তার মা হোসনে আরা জয়েস থাকেন।’ তার সঙ্গে দেখা করতে বনানীর ১৮ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসায় গেলে সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক মিজানুর রহমান উপরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেন, স্যার ব্যস্ত আছেন দেখা করা যাবে না।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স থেকে পাস করা তুহিন প্রায় দেড় বছর ধরে নিখোঁজ বলে তার ছোট ভাই তানিম আমাদের জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তুহিন ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে কিছু দিন পর ছেড়ে দেন। এরপর স্যামসাং মোবাইল ফোন কোম্পানির কাওরান বাজারের অফিসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ নেন। এর মধ্যে হঠাত্ একদিন ভাইয়ের কোনো সন্ধান পাচ্ছিলাম না। তার মোবাইলও বন্ধ ছিল। সে সময় ভাই নিখোঁজের তথ্য জানিয়ে কলাবাগান থানায় একটি জিডি করেন বলে জানান তানিম।

আর নিখোঁজ আবদুর রহমান মাসুদের বিষয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। থানার কর্মকর্তারা জানান, নিখোঁজদের একটি তালিকা তৈরি করছেন তারা।

মাসুদের ঠিকানা টুঙ্গাবাড়ির ২ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাসা বলা হলেও ওই ঠিকানায় গিয়ে কোনো বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ বগুড়ার এ কে এম তুরকিউর রহমানের ঠিকানা বলা হয়েছে শহরের কালিটোলার মদিনা মসজিদ সংলগ্ন আবদুল খালেকের বাড়ির নবম তলা। ওই বাড়িতে গিয়ে নবম তলা নির্মাণাধীন দেখা গেলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।

তবে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, তুরকিউর অস্ট্রেলিয়াতে পড়াশোনা করার সময় জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এসে কর্নেল (অব.) ইকবালের মেয়েকে বিয়ে করে। এরপর গত বছরের ১৩ এপ্রিল সপরিবারে সিরিয়া চলে যায়। সর্বশেষ তার পরিবার তুরস্কে ছিল বলে খবরে প্রকাশ।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার শফিউর রহমানের ছেলে সাফিও গত এক বছর ধরে নিখোঁজ। আর রাজধানীর মৃত ওয়াসিকুর আজাদের ছেলে ডা. আরাফাত-আল-আজাদও মেডিক্যাল থেকে পাস করার পর জড়িয়ে পড়ে জঙ্গি কার্যক্রমে। তাকেও দীর্ঘ সময় ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। গোয়েন্দারা নিশ্চিত এরা সবাই জঙ্গি গ্রুপের হয়ে কাজ করছে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর