নতুন দল গড়ছেন বিএনপির সংস্কারপন্থিরা
নতুন দল গড়ছেন বিএনপির সংস্কারপন্থিরা
২০১৫-১১-০৫ ১৫:২০:৫৮
প্রিন্টঅ-অ+


দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি গণতান্ত্রিক নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে তৎপর হয়েছেন বিএনপির সংস্কারপন্থি নেতারা। আগামী নির্বাচনকে টার্গেট করে গোপনে নতুন দল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। নতুন বছরের প্রথম দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে দল গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। এরই মধ্যে তারা নিজেদের ইতিকর্তব্য নির্ধারণ করছেন। তৈরি করেছেন নতুন দলের খসড়া গঠনতন্ত্রও। কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভাগীয় সমন্বয়কের। নতুন দলে বিএনপির সংস্কারপন্থি সাবেক অর্ধশতাধিক সাংসদসহ শতাধিক নেতা থাকতে পারেন। একই সঙ্গে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দও নতুন দলে যোগ দেবেন বলে দাবি করেছেন আপাতত নিভৃতচারী কয়েকজন নেতা।

নতুন দল গঠনের উদ্যোগের কথা স্বীকার করেছেন অন্যতম উদ্যোক্তা সংস্কারপন্থি নেতা বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক হুইপ আশরাফ হোসেন এবং বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক হুইপ শহিদুল হক জামাল। তারা জানিয়েছেন, দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে নতুন দল গঠন করতে পারেন তারা। আপাতত তারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। আগামী বছরের প্রথম দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এই দুই নেতাই সমকালকে বলেছেন, অপেক্ষা করুন, দেখেন সামনের দিনগুলোতে কী হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও লন্ডনের এক নাগরিক সমাবেশে অভিযোগ করেছেন, সরকার বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনরাও দল ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এখনও কেউ দল ভাঙতে পারবে না বলে দাবি তার । তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করছেন, অচিরেই বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়বে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিএনপির অনেক নেতা দল ত্যাগ করবেন।

শেষ পর্যন্ত বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়বে কি-না_ তা নিশ্চিত না হলেও পর্দার আড়ালে চলছে জোর তৎপরতা। বেশ কিছুদিন ধরে ভেতরে ভেতরে এক হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। দফায় দফায় গোপন বৈঠক করছেন বিভিন্ন স্থানে। সম্প্রতি পরীবাগ সংস্কৃতি বিকাশ
কেন্দ্রে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেনের উদ্যোগে একটি কর্মিসভাও অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নতুন দল গঠনের ব্যাপারে তাদের মতামত নেওয়া হয়।


সূত্র দাবি করেছে, নতুন রাজনৈতিক দলে সংস্কারপন্থিরা ছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বিভিন্ন মহানগর ও জেলা কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও থাকবেন। তাদের মধ্যে বর্তমানে দলে কোণঠাসা, নিষ্ক্রিয় ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ নেতারা রয়েছেন। আবার অনেকের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক মামলাও রয়েছে। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের বেশ কিছু নেতাকর্মী নতুন দলে যোগ দিতে পারেন। যোগ দিতে পারেন কয়েকজন বুদ্ধিজীবীও।

সাবেক বিএনপি নেতা আশরাফ হোসেন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা মনে করেন, গণতন্ত্র মানে প্রজাতন্ত্র। প্রকৃত অর্থে দেশে প্রজাতন্ত্র আছে কি-না_ তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশে নতুন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তা হলো পরিবারতন্ত্র। একাধিক পরিবার বাংলাদেশের মালিক বনে গেছেন। গণতন্ত্রের লেবাসে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছেন তারা।



বিএনপি চেয়ারপারসনের জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করায় বিরোধিতা করে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন আশরাফ হোসেন। সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে তিনিও দল থেকে বহিষ্কার হন। এখনও তিনি আগের অবস্থানে অটুট থেকে বলেন, বিএনপির মধ্যে কোনো গণতন্ত্র নেই। পরিবারের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে সব সময়। এ অবস্থায় কীভাবে তারা দেশে প্রজাতন্ত্র কায়েম করবে।

নতুন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য নাম কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনও বলার সময় হয়নি। কারা কারা যোগাযোগ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বিভিন্ন দল থেকে নেতারা তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে আশা করছেন তিনি।



নতুন দলের অপর উদ্যোক্তা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক হুইপ শহিদুল হক জামাল বলেন, সংস্কারপন্থি অভিযোগে দল থেকে বাদ পড়া নেতারা একসঙ্গে আছেন। যা করবেন একসঙ্গে করবেন। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু করবেন না। দেশ ও জনগণের কল্যাণে তারা নতুন একটি রাজনৈতিক দল করার চেষ্টা করছেন। তাহলে কি তারা বিএনপি ভাঙতে যাচ্ছেন_ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া নিজেই দল ভাঙার জন্য দায়ী হবেন। অন্য কারও কিছু করতে হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে রাজনৈতিক খেলা দেখি, তার পর সিদ্ধান্ত।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেড এ খান বলেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপিতে ফেরার অপেক্ষা করব। ডাক না পেলে তখন কিছু করার চিন্তা করব।


সূত্র জানায়, বিএনপির সংস্কারপন্থি হিসেবে চিহ্নিত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন_ দলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেড এ খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মোফাজ্জল করিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাহ মো. আবুল হোসাইন, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক জহিরউদ্দিন স্বপন, দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি, কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সাংসদ সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, সুনামগঞ্জ জেলার সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ নজির হোসেন, বগুড়ার সাবেক সাংসদ ডা. জিয়াউল হক মোল্লা, জিএম সিরাজ, কাজী রফিকুল ইসলাম, কক্সবাজারের সাবেক সাংসদ প্রকৌশলী শহিদুজ্জামান, ময়মনসিংহের সাবেক সাংসদ দেলোয়ার হোসেন দুলু, ব্রা?হ্মণবাড়িয়ার সাবেক সাংসদ আনোয়ার হোসেন, চাঁদপুর জেলার সাবেক সভাপতি এসএ সুলতান টিটু, বরগুনা জেলার সভাপতি ও সাবেক সাংসদ নূরুল ইসলাম মনি, সাবেক সাংসদ শামীম কায়সার লিঙ্কন, সাবেক এমপি মোশাররফ হোসেন মঙ্গু, বরগুনার জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সাংসদ ইলেন ভুট্টো, মিরসরাইয়ের সাবেক সাংসদ এমএ জিন্নাহ, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সাংসদ শাহরিয়ার আখতার বুলু, শাম্মী শের প্রমুখ।


সূত্র জানায়, ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে দলের সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে দল থেকে ছিটকে পড়েন বিএনপির শতাধিক সাবেক সাংসদ ও নেতা। সংস্কারে ব্যর্থ হতাশ ওইসব নেতা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ খুঁজছেন। অবশ্য কেউ কেউ দলে ঠাঁই ফেলেও আগের মতো গুরুত্ব নেই। কেউ কেউ বিএনপিতে ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে দলের হাইকমান্ডের ইতিবাচক মনোভাবের আশা করেছিলেন। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা ছাড়া বেশিরভাগ সংস্কারপন্থিই দলের বাইরে থেকে যান।
(লোটন একরাম)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

রাজনীতি এর অারো খবর