কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইনে অভিনব প্রতিবাদ
কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইনে অভিনব প্রতিবাদ
স্টাফ রিপোর্টার
২০১৬-০৭-২৭ ০৪:২৬:১৫
প্রিন্টঅ-অ+


বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক ও বিশ্বব্যপী মানবতার সপক্ষের একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর অরুন্ধতী রায় ২০১৩ সালে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে কাশ্মির সম্পর্কে লিখেছিলেন ‘এটি একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণকৃত এলাকা। এখানে রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মিরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মিরিদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার মুক্তিকামীকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজারকে গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আরও অন্তত এক লাখ লোক।’

আর সাম্প্রতিক কাশ্মির পরিস্থিতির বিবেচনায় আউটলুক ইন্ডিয়ায় লেখা নিবন্ধে অরুন্ধতী স্পষ্ট করে মন্তব্য করেছেন, কাশ্মিরের নিরস্ত্র জনতার প্রতি ভারতীর বাহিনীর গুলি ছোঁড়া, হাসপাতাল আর অ্যাম্বুলেন্সে পুলিশের আক্রমণ, ছররা গুলিতে তরুণদের বুক বিদ্ধ করার ঘটনাকে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিতর্কে আটকে রাখা যাবে না। একে স্বাধীনতার জন্য একটি জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের বিরদ্ধে সামরিক দমননীতি আকারেই দেখতে হবে। অরুন্ধতী লিখেছেন, ‘কাশ্মির মানবাধিকার হরণ রুখতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে না। কাশ্মির লড়ছে স্বাধীনতার জন্য।’

উল্লেখ্য, ৮ জুলাই অনন্তনাগের কোকেরনাগ এলাকায় সেনা ও পুলিশের বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে হিজবুল কমান্ডার বুরহান ওয়ানিসহ তিন হিজবুল যোদ্ধা নিহত হন। বুরহানের নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে কাশ্মির জুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। কাশ্মিরের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চলমান সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ জনে। প্রতিদিনই সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে জনগণ। নিরস্ত্র জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার নামে সেখানে চলছে ছররা গুলির অভিযান। সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এটিকে প্রাণঘাতী নয় বলে দাবি করলেও, গত কয়েকদিনে কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া বিক্ষোভ এবং সহিংসতায় অসংখ্য কাশ্মীরবাসী ছররা গুলির আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ এঁদের মধ্যে শিশু-কিশোররাও রয়েছে, যারা কোনো বিক্ষোভ-স্থলে উপস্থিতই ছিল না৷ ডাক্তাররা বলছেন, এদের মধ্যে অনেকেই চোখে গুলির ক্ষতের কারণে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারাবেন৷

কাশ্মিরে চলমান সেই অভিযানে ব্যবহৃদ ছররা গুলির ভয়াবহতার দিকে ভারতীয় তারকাদের দৃষ্টি ফেরাতে শুরু হয়েছে এক অভিনব প্রচারণা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ছবি ও তাদের প্রতি বার্তা দিয়ে কাশ্মিরে ব্যবহৃত ছররা গুলির ভয়াবহতা প্রকাশ করা হচ্ছে ওই প্রচারণায়।

‘নেভার ফর্গেট পাকিস্তান’ শীর্ষক ফেসবুক পাতায় শেয়ার হওয়া ‘হোয়াট ইফ ইউ নিউ দ্য ভিক্টিম?’ নামের ওই প্রচারণামূলক অ্যালবামে ভারতীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, আলিয়া ভাট, সাইফ আলি খান, কাজল ও ঋত্বিক রোশন ছাড়াও স্থান পেয়েছেন রাজনীতিবিদরা৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও সোনিয়া গান্ধীকেও এই প্রচারণার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে৷ এমনকি ভারতীয় ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলিও আছেন একটি ছবিতে; পাশাপাশি একমাত্র অ-ভারতীয় হিসেবে রয়েছেন ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ।

‘হোয়াট ইফ ইউ নিউ দ্য ভিক্টিম’ (ভুক্তভোগী যদি তুমি অথবা তোমার কেউ হতো) শীর্ষক শীর্ষক ওই প্রচারণায় ভারতের বিভিন্ন তারকার প্রতি লেখা চিঠিতে কল্পিতভাবে ওই তারকার গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়। বোঝাতে চেষ্টা করা হয় কাশ্মিরবাসীর বাস্তবতা। বার্তারর সঙ্গের ছবিতে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তারকাদের ছররা গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার বিভীষিকা ফুটিয়ে তোলা হয়।
মোদির কাছে চিঠি লেখা হয় ডঃ সাজ্জাদ খান দের নামে,

প্রিয় মোদিজি,

আমরা আপনার প্রাথমিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছি কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আপনার চোখের মধ্যে গুলির ছোট ছোট কণিকাগুলো এখনও রয়ে গেছে। এই অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে, কেননা পুলিশের হস্তক্ষেপে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারিনি। তারা প্রায়শই জরুরি স্বাস্থ্য ঝুঁকি অস্বীকার করে হাসপাতাল থেকেও বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার করছে।

একটি পুরো প্রজন্ম নিরবে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এমন শত শত রোগী আমরা পেয়েছি ও চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা করেছি। আপনার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। আশা করছি অবিলম্বে আপনি এই নৃশংসতা বন্ধ করতে সমর্থ হবেন।

ডঃ সাজ্জাদ খানদে
একইভাবে সোনিয়ার চিঠিতে লেখা হয়,

প্রিয় সোনিয়াজি,

আপনার ডান চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়ায় আমরা অত্যন্ত শোকাহত । চিকিৎসায় বিলম্ব হওয়ায় আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমাদের মাত্র পাঁচটি অপারেশন টেবিল রয়েছে যা কিনা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই পূর্ণ থাকে। আমাদের চিকিৎসকদের মধ্যে যারা ঈদের ছুটিতে ছিলেন তাদের সকলের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি।

দুর্ভাগ্যের কথা হচ্ছে, রাহুলের অবস্থা এখনো আশংকাজনক। তাকে বাঁচাতে সব রকম চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমরা দেখেছি আপনার মিত্র ওমর আব্দুল্লাহ পেলেট বন্দুক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন কেননা এটা প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু সেনাবাহিনী সাধারণত সরাসরি মাথা বা বুক লক্ষ্য করে এই গুলি ছুড়ে থাকে যা বুলেটের মতোই ভয়াবহ হতে পারে।

ডঃ কামভালিজিত

ডিএমএস, এসএমএইচএস হাসপাতাল

ভারতীয় অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়াকে লেখা হয় নাসিমা জান নামের এক কাশ্মিরি মায়ের নামে। তিনি লেখেন,

প্রিয় ঐশ্বরিয়া,

তুমি তোমার চার বছরের মেয়ে আরাধ্যকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছ বলে জানতে পেরেছি। কাশ্মিরের জীবনে এমন অনেক দেখেছি কিন্তু এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তারা একটি চার বছরের শিশুকেও গুলি করতে পারে। কিন্তু তারা আমার সন্তানকে আঘাত করেছে।

জুহরা এখনো মনে করে সে পুলিশের আতশবাজির আঘাতে আহত হয়েছে। সে এতই ছোট্ট যে এখনো গুলি আর বোমার অর্থ বোঝে না, বোঝে না কেন নিরস্ত্র মানুষের ওপর এসব প্রয়োগ করা হয়। ভারতের সকল মায়েরা যদি একে অন্যের সন্তানের নিরাপত্তার জন্য আওয়াজ তোলে, তবেই হয়তো বাঁচাতে পারবে নিজের সন্তানকেও।

নাসিমা জান

কাশ্মির

চিঠি লেখা হয়েছে বলিউডের সবচেয়ে বড় তারকা শাহরুখ খানকেও। শাহরুখের বার্তায় লেখা হয়,

প্রিয় শাহরুখ

ভারতীয় সেনাবাহিনী তোমার সঙ্গে যা করেছে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হয় না। তুমি তো বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছিলেই না। কিন্তু আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট এভাবেই কাজ করে। তাদের সন্দেহভাজন যে কাউকেই গুলি করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।

তোমার পরিবারের প্রতি আমার সহমর্মিতা জেনো। আমার ভাই হামিদের সঙ্গেও একই রকম নৃশংসতান ঘটেছে।সে সারাদিন স্কুলে ছিলো, স্কুল শেষে পড়তে যাচ্ছিলো। আমরা শুনলাম সে পেলেটে আহত হয়েছে।কিন্তু তাকে দেখতে গিয়ে আর চিনতে পারিনি তার মুখ। সে এখন ভয়াবহ যন্ত্রণাড় মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি কাশ্মিরে যে কারো সঙ্গে এমনটা হতেই পারে।আশা করি তুমি এর পর থেকে কোন সেনা কর্মকর্তার ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পেলে কাশ্মিরের বিষয়টি উত্থাপন করার সাহস দেখাতে পারবে।

জুনাইদ নাজির

কাশ্মির

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিদেশ এর অারো খবর