বাংলাদেশের ম্যাকগাইভার কেনু মিস্ত্রি
বাংলাদেশের ম্যাকগাইভার কেনু মিস্ত্রি
২০১৬-০৭-২৪ ০১:৫১:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+


এক সময় দারুণ জনপ্রিয় ছিল মার্কিন টিভি সিরিজ ম্যাকগাইভার। বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও তুমুল জনপ্রিয় এ চরিত্রটি। হাতের কাছে যা পেতেন তা দিয়েই ম্যাকগাইভার নতুন কিছু আবিষ্কার করে চমকে দিতেন দর্শকদের। ময়মনসিংহের প্রান্তিক কৃষক মো. আবদুল্লাহ আল পাঠানকেও ভালোবেসে অনেকে ম্যাকগাইভারের সঙ্গে তুলনা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি আবিষ্কার করেছেন ৪২ প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতি, যা ব্যবহার করে নিয়মিত সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের রুকনাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল্লাহ আল পাঠান ওরফে কেনু মিস্ত্রি। ১৯৩২ সালে জন্ম নেওয়া কেনু জীবিকার তাগিদে মিস্ত্রির পেশা বেছে নেন এক সময়। বেশি দূর পড়ালেখা না করলেও কৃষকবান্ধব যন্ত্রপাতি তৈরি করে এলাকায় বেশ জনপ্রিয় তিনি।

সম্প্রতি ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের পাশে রুকনাকান্দা গ্রামে কৃষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবক বয়সের ভারে ন্যুব্জ কেনু মিস্ত্রি এক আলাপচারিতায় জানান, এ পর্যন্ত তিনি ৪২ প্রজাতির কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করেছেন।

প্রায় ৪৪ বছর আগেকার কথা। তখন চলছিল ইরি মৌসুম। তখন গ্রামের কৃষকরা ফসলের আগাছা পরিষ্কারের জন্য কোনো যন্ত্রের কথা চিন্তাই করতেন না। হাতে ইরি ধানের জমির আগাছা পরিষ্কার করতে কৃষকের বেশ কষ্ট হতো। সময়ও লাগত অনেক। কৃষকের কষ্টের ওই দৃশ্য দেখে মাথায় পরিকল্পনা আসে কেনু মিস্ত্রির। বাড়িতে গিয়ে একটি পুরনো কাঁচি (কাস্তে) নিয়ে চিন্তা শুরু করলেন। তারপর ওই কাস্তেটাকে পিটিয়ে নিড়ানির মতো করলেন। আর সেই লোহার পাতে একটি লম্বা বাঁশের হাতল লাগিয়ে ইরি ধানের জমিতে আগাছা পরিষ্কার শুরু করলেন। উদ্ভাবিত যন্ত্রটির নাম দিলেন সেনি উইডার। ওই যন্ত্র দিয়ে মাত্র আধা ঘণ্টায় ৫ শতক জমির আগাছা পরিষ্কার করেন নিজ হাতে। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কৃষকরা তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে নিড়ানি যন্ত্র সেনি উইডার বানিয়ে জমির আগাছা পরিষ্কার শুরু করেন।

কেনু মিস্ত্রি বলেন, শিক্ষক বাবা আমাকে পড়ালেখা করাতে চাইলেও পড়ালেখায় আমি মন বসাতে পারিনি কখনও। সব সময় মাথায় নতুন কিছু তৈরি করার চিন্তা ঘুরপাক খেত। কৃষকদের কথা চিন্তা করে সেনি উইডার তৈরির পর এলাকার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। কৃষকদের সাড়া দেখে আমারও উৎসাহ বেড়ে যায়। নতুন নতুন যন্ত্র তৈরির স্বপ্ন দেখতে শুরু করি এ সময়। স্বপ্ন পূরণ করতে নেমে পড়ি কাজে।

এভাবেই শুরু। কেনু মিস্ত্রি আরও জানান, তার হাত ধরে এরপর একে একে তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন কৃষিযন্ত্র। এক সময় ধান মাড়াইয়ে কৃষকের কষ্ট লাঘব ও সময় কমাতে আধুনিক ধানমাড়াই যন্ত্রও তৈরি করেন। তৈরি করেন ফসলের মাটি ঝুরঝুরে করার বিন্দাযন্ত্র, খুব সহজে মাটি খননের আগরযন্ত্র। কেনু মিস্ত্রির যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকায় গোল আলুর চাষাবাদ করেন কৃষকরা। গোল আলুর বীজ বপন সহজভাবে করার জন্য তৈরি করেন বীজ বপনযন্ত্র। তৈরি করেন নির্দিষ্ট দূরত্বে শস্যবীজ বপনযন্ত্র, সবজি বীজ বপনযন্ত্র, সবজি গাছের ডগা কেটে ফেলার কাটার।

ফসলের জমিতে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ রোধে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। ক্ষেত বা উঁচু গাছে কীটনাশক স্প্রে করার যন্ত্রও তৈরি করেন কেনু মিস্ত্রি। সবজির চারা উত্তোলন যন্ত্র, আধুনিক দা, আধুনিক খন্তা, আধুনিক কাঁচি, আধুনিক কোদালও তৈরি করেছেন তিনি। এ ছাড়া আরও তৈরি করেন গুটি ইউরিয়া সার প্রয়োগযন্ত্র, সহজে জমিতে সেচ দেওয়ার পাডাকল, পানি সেচের হাতকুন্দা।

গ্রামের মহিলাদের অনেক কষ্ট করে সেমাই বানাতে হতো।
তার নানা যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন দেখে গ্রামের নারীরা তাকে সেমাই বানানোর যন্ত্র তৈরির কথা বলেন। তাদের অনুরোধে তৈরি করেন হাতে সেমাই বানানোর যন্ত্র। এ ছাড়া গভীর কাদা থেকে সহজেই মাছ শিকারের জন্য হয়ড়া, সেনি উইডার ও কৃষিভেদে চার ধরনের নিড়ানি যন্ত্রসহ ৪২ প্রকার হস্তচালিত কৃষিযন্ত্র তৈরি করেন কেনু মিস্ত্রি।

ব্যক্তি জীবনে নানা অসচ্ছলতার মধ্যেও অপরিসীম মনোবল নিয়ে একের পর এক যন্ত্র আবিষ্কার করতে থাকেন তিনি। কৃষিবান্ধব এ যন্ত্রগুলো স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা ব্যবহার করেও সুফল পাচ্ছেন। এসব যন্ত্র আবিষ্কার করতে কেনু মিস্ত্রি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। ফসলের মাঠে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেন সমস্যা এবং সেভাবেই একের পর এক যন্ত্র তৈরি চলতে থাকে তার।

প্রান্তিক কৃষিবিজ্ঞানী কেনু মিস্ত্রির উদ্ভাবন করা বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও শৌখিন সামগ্রী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি জাদুঘরেও স্থান পেয়েছে। এ জাদুঘরের চারটি কক্ষে রয়েছে কেনু মিস্ত্রির উদ্ভাবন করা প্রায় ২৫টি কৃষিবান্ধব যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে জাদুঘরের ৫ নম্বর কক্ষে রয়েছে তার তৈরি কৃষকের বসতবাড়ি নামে একটি বিশেষ শিল্পকর্ম। কেনু মিস্ত্রির তৈরি কৃষিযন্ত্রে বাঁশ, কাঠ, ইস্পাত, স্টিল, লোহা ও সাইকেলের চেইন ছাড়া অন্য কোনো ভারী যন্ত্রের ব্যবহার নেই। দামে সস্তা, সহজলভ্য ও কার্যকরী যন্ত্রগুলো তাই কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

কেনু মিস্ত্রি বলেন, কোনো প্রকার শিক্ষা ছাড়াই নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকের কথা চিন্তা করে যন্ত্রগুলো উদ্ভাবন করেছি। দিনের পর দিন মাথা খাটিয়ে তৈরি করেছি এসব। যখন নিজের চোখে এসব যন্ত্র ব্যবহার করে কৃষকদের উপকার পেতে দেখি খুব ভালো লাগে তখন।

এসব কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করে বেশ কিছু সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। এখনও নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবনের স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত। তার মতে, এসব কৃষিযন্ত্র সরকার উদ্যোগ নিয়ে কৃষকদের ব্যবহারে উৎসাহী করে তুলতে পারলে উপকৃত হবে কৃষক তথা গোটা দেশ।

স্থানীয় কৃষক আবদুল হালিম, মো. সেলিম মিয়াসহ বেশ কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, কেনু মিস্ত্রির উদ্ভাবিত কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে তারা অনেক উপকার পাচ্ছেন। যন্ত্রগুলো ব্যবহারের ফলে ফসলের মাঠে কম সময় ও পরিশ্রমে বেশি কাজ করা যাচ্ছে। কেনু মিস্ত্রি ওই যন্ত্রগুলো তৈরি না করলে কৃষকদের অনেক কষ্ট করতে হতো।

গৌরীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাদিকুর রহমান বলেন, কেনু মিস্ত্রি কৃষকদের জন্য নানা প্রকার কৃষিযন্ত্র তৈরি করেছেন। তার উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো কৃষকদের জন্য সুফল বয়ে এনেছে। তার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য কৃষি বিভাগের উদ্যোগে সরকারিভাবে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং করানো হয়েছে। উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো আরও আধুনিকায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, কেনু মিস্ত্রির উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রগুলো সহজ ব্যবহারযোগ্য। এটি একটি দারুণ বিষয়। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনা এক নাম- কেনু মিস্ত্রি।
(মোস্তাফিজুর রহমান)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিশেষ প্রতিবেদন এর অারো খবর