চলে গেলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি
চলে গেলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি
২০১৬-০৭-০৫ ১৭:২১:২৩
প্রিন্টঅ-অ+


ইরানের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামি আর নেই। সোমবার (৪ জুলাই) ফ্রান্সের প্যারিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিলো ৭৬ বছর।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন আব্বাস। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধির কাছে হার মেনে মৃত্যুবরণ করতে হলো তাকে। তার মৃত্যুর খবরে বিশ্ব চলচ্চিত্রে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি দুই পুত্র আহমাদ ও বাহমানকে রেখে গেছেন।

আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে বলা হয় ইরানের চলচ্চিত্র গুরু। তার সম্পর্কে মার্কিন পরিচালক মার্টিন স্করসিস বলেন, ‘তিনি একেবারেই অন্যরকম মানুষ ছিলেন। শান্ত, মার্জিত, বিনয়ী, স্পষ্টভাষী এবং বেশ পর্যবেক্ষণশীল। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক ভদ্রলোক এবং সত্যিকার অর্থেই আমাদের মধ্যে দারুণ একজন শিল্পী। চলচ্চিত্রে শিল্পদক্ষতার চূড়ান্ত পর্যায় উপস্থাপন করে গেছেন তিনি।’

নিউইয়র্কের চলচ্চিত্র বিষয়ক ম্যাগাজিন দ্য ফিল্ম স্টেজ টুইটারে উল্লেখ করেছে, ‘বিশ্ব অসাধারণ একজন চলচ্চিত্রকারকে হারালো।’ ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট টুইট করেছে, ‘এ মৃত্যু বিষাদের।’ আব্বাসকে টেলিগ্রাফের চলচ্চিত্র সমালোচক রবি কলিন বলতেন, ‘জাদুকরের ছদ্মবেশে অবিশ্বাস্য কাজের মানুষ।’

নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ইরানি শিক্ষার অধ্যাপক হামিদ দাবাশি বলেন, ‘তার শিল্পের অদ্ভুত ব্যাপার হলো- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শহুরে চেতনা উভয় উঠে এসেছে তার চিত্রগ্রহণে। অসাম্প্রদায়িকতায় ইরানি দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি।’

আব্বাসের ছবিগুলো বিশ্ব চলচ্চিত্রে যেন মুক্ত হাওয়ায় নিঃশ্বাস- এ মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ইরানি চলচ্চিত্র অধ্যাপক জামশিদ আকরামি। তার ভাষ্য, ‘ইরানের উন্নত জীবন ও সংস্কৃতির যোগ্য প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। স্বর্ণপাম জেতার পর তার ছবি ও সেগুলোর বিষয়বস্তুর সঙ্গে দর্শকরা নিজেদের সম্পৃক্ত করে নিয়েছেন।’

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরও ইরানে ছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। এরপর ৪০টিরও বেশি ছবি তৈরি করেন তিনি, এর মধ্যে আছে প্রামাণ্যচিত্র। ইরানি চলচ্চিত্রে নতুন ঢেউ তুলেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রাঙ্গনে তার পথচলা শুরু হয়েছিলো ১৯৬০ সালে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন নিয়ে বাস্তববাদী গল্প বলতেন তিনি। তার হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে আলাদা স্বীকৃতি পেয়েছে ইরানি ছবি। তার কাজ আবেগপ্রবণ করেছে সব বয়সী দর্শকদের। ইরানি বিষয়বস্তু নিয়ে ছবি বানালেও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের তা নাড়া দিয়েছে।

১৯৯৭ সালে ‘টেস্ট অব চেরি’র জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম আসে আব্বাসের ঘরে। তিনিই এখন পর্যন্ত একমাত্র ইরানি যার ঝুলিতে আছে এই অর্জন। ছবিটির গল্প আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া এক ব্যক্তিকে ঘিরে। আত্মহত্যার পর তাকে সমাহিত করবে এমন একজনকে খুঁজতে থাকেন তিনি। তখনকার সময়ে ইরানি নাগরিক ও ধর্মীয় মনোভাবের চিত্র তুলে ধরা হয় এতে।

নিজের শেষ দু্ই ছবি ‘সার্টিফায়েড কপি’ (২০১০) ও ‘লাইক সামওয়ান লাভ’ (২০১২)-এর কাজ ইরানের বাইরে করেছেন আব্বাস। দুটোই স্থান পায় কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে। তার ‘টেন’ (২০০২) ছবিটিও স্বর্ণপামের জন্য মনোনীত হয়েছিলো। একটি গাড়ির সঙ্গে দুটি ডিজিটাল ক্যামেরা সংযুক্ত করে বানানো হয় এটি। এর গল্পে দেখা যায়, এক নারী তেহরানের চতুর্দিকে গাড়ি চালান। তার যাত্রী হন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। সামাজিক ইস্যুতে নারীর ভূমিকা তুলে ধরাই ছিলো ছবিটির মূল বক্তব্য। ২০০৫ সালে তিন পর্বের ছবি ‘টিকেটস’ নির্মাণের জন্য ব্রিটিশ পরিচালক কেন লোচ ও ইতালিয়ান চলচ্চিত্রকার এরমানো ওলমোর সঙ্গে হাত মেলান আব্বাস।

১৯৪০ সালে তেহরানে জন্মেছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তেহরান ইউনিভার্সিটিতে চারুকলায় পড়াশোনা করেন তিনি। ইরানি টিভির জন্য বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করে শুরুটা হয় তার। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর রাজতন্ত্রের আওতায় সরকারের ইসলামী ব্যবস্থার সূচনা হলে অনেক শিল্পী ও লেখক দেশ ছেড়ে চলে যান, কিন্তু আব্বাস থেকেছেন। গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র অথবা শিশুদের ঘিরেই তার বেশিরভাগ ছবির গল্প।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে প্রভাববিস্তারকারী নির্মাতাদের মধ্যে আব্বাস কিয়ারোস্তামি ছিলেন অন্যতম। ফরাসি-সুইস পরিচালক জ্যঁ-লুক গদার একবার বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র শুরু হয় ডিডব্লিউ গ্রিফিথের সঙ্গে, শেষ হয় আব্বাস কিয়ারোস্তামির মাধ্যমে।’

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিনোদন এর অারো খবর