উপকূলের সৌরশক্তির ব্যবহার হচ্ছে
উপকূলের সৌরশক্তির ব্যবহার হচ্ছে
২০১৬-০৭-০২ ০৫:২৮:৪৪
প্রিন্টঅ-অ+


ছোট ছোট নৌকা, ট্রলার, বনের মধ্যে ছোট্ট কুঁড়ে কিংবা সাগরপাড়ের জেলে পল্লীর সারি সারি ঘর আলোয় ঝলমলে। কোথাও কোথাও রেডিও, টেলিভিশন বা মিউজিক প্লেয়ারে গান-বাজনার শব্দও শোনা যায়। রাতের আধাঁর দূর করতে জ্বালানি তেল কেরোসিন কেনা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন লোকজন। কুয়াকাটা-সোনাকাটা সাগর সৈকত, হরিণঘাটা, ফাতরার জংগল, সোনাকাটার ইকোপার্কসহ উপকূলীয় এলাকার শহর-বন্দর বা প্রত্যন্ত পল্লীর কোণায় কোণায় পৌঁছে গেছে সৌর বিদ্যুত।

লোডশেডিংয়ের ঝামেলা নেই। কর্মীদের খবর দিলেই বাড়িতে লাগিয়ে (স্থাপন) দিয়ে যায়। খরচও তুলনামূলক অনেক কম। বরগুনা-পটুয়াখালীর বিভিন্ন গ্রাম ও সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোর স্থানীয় লোকজন ব্যাপক হারে সৌরশক্তি ব্যবহার করে আলোর চাহিদা মেটাচ্ছেন। শুধু গ্রামই নয়, জেলা-উপজেলা শহরে বিদ্যুতের পাশাপাশি মানুষের বাসা-বাড়ি কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সৌরশক্তির ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো। হাঁস-মুরগীর খামারে জ্বলছে সৌরবাতি। কৃষি জমিতে সৌর সেচ পদ্ধতি চালু হয়েছে পাঁচ বছর আগেই। এখন সড়কবাতি জ্বালানোর কাজেও সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সৌরশক্তি ব্যবহারকারীরা জানান, রাতে বাতি জ্বালানোসহ বৈদ্যুতিক পাখা (ছোট ডিসি ফ্যান) ও টেলিভিশন চালানোর মতো সুবিধা পাওয়ায় সৌরশক্তি এ অঞ্চলে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তাছাড়া যেসব এলাকায় বিদ্যুত পৌঁছাতে এখনও সময়ের দরকার, সেই এলাকাগুলোতে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবাই সৌরশক্তি ব্যবহার করেছেন। শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলাকালীন বা বিদ্যুত থাকা অবস্থায়ও আলোর চাহিদা মেটাতেও সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যাপক হারে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি দপ্তরগুলোর মতো জরুরি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুতের পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার বেশ পুরাতন। এ অঞ্চলে বিদ্যুত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান খোদ পল্লী বিদ্যুতের অফিসগুলোতেও সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেরীঘাটগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, শহর ও বন্দরে সৌরশক্তির সড়কবাতি অন্ধকার দূর করছে। সৌরশক্তির ব্যবহারে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন পপকর্ন বিক্রেতারা।

পপকর্ন বিক্রয় ভ্যানে সৌরপ্যানেল ও ব্যাটারির সাহায্যে মোটর চালনা করা হচ্ছে।

সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে বরগুনার কৃষকরা চাষ করছেন শত শত একর জমি। সূর্যালোকের সাহায্যে ফসলী জমিতে এই সেচ ব্যবস্থা কৃষকদের জ্বালানি তেল বা বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীলতার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ২০১০ সাল থেকে বরগুনায় ৬টি গ্রামে ৬টি সোলার ইরিগেশন পা¤িপং সিস্টেম ৪০ একর করে জমিতে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

ছোট-বড় প্রায় শতাধিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে জেলার গ্রাহকদের সৌরশক্তি ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকজন বিপণন কর্মকর্তা আলাপকালে জানান, মাত্র তিন হাজার টাকা থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে সৌর শক্তি ব্যবস্থা স্থাপন (ইনস্টল) করেন তারা। মোট দামের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা এককালীন পরিশোধ করে বাকি টাকা ৩০ থেকে ৪০ কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ থাকায় সৌর শক্তি ব্যবস্থা গ্রাহকদের কাছে বেশ সুবিধাজনক ও ব্যবহারযোগ্য হয়েছে।

সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশের সেটের এককালীন ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্য প্রায় অর্ধেক-এ নেমে এসেছে বলে জানালেন বেশ কয়েকটি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা। এ ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান লোকজন কিস্তির ঝামেলায় যাচ্ছেন না। ইতোমধ্যে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ সৌরশক্তি ব্যবহার করছেন।

শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর পাশাপাশি উপকূলীয় সাগরতীরবর্তী তালতলী ও পাথরঘাটা, কলাপাড়া, গলাচিপা রাঙ্গাবালীর মানুষেরা সৌর শক্তিতে বেশী উপকৃত হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা এনএসএসর নির্বাহী পরিচালক অ্যাড. শাহাবুদ্দিন পান্না। তিনি বলেন, সৌরশক্তির বিদ্যুত ব্যবহার করে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা অনেক বেড়েছে। তারা দেশ-বিদেশের সমসাময়িক বিষয়গুলো স¤পর্কে প্রতিনিয়ত ওয়াকিবহাল হচ্ছেন।

সম্প্রতিকালে স্থাপিত পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকাতেও সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি চলছে আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র, রাডার স্টেশন, সাবমেরিন স্টেশন নির্মাণের কাজ। সব জায়গায় রয়েছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার।

আমতলী সরকারী কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান, সহকারী অধ্যাপক উত্তম কুমার কর্মকার বলেন, সৌরশক্তির ব্যবহার বিদুতের বাড়তি চাহিদা থেকে আমাদের মুক্তি দিচ্ছে। উপযোগিতা থাকায় উপকূলীয় এলাকায় (উইন্ডমিল) বায়ু শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। সেটি সৌরশক্তির চেয়েও কম ব্যয়ের মধ্যে হবে।

বরগুনা-১ আসনের সাংসদ অ্যাড. ধীরেন্দ্র দেবনাথ শ¤ু¢ বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দ্রুত উপকূলীয় এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করছে। তিনি জানিয়েছেন, এখন সাগরপাড়ের মানুষও রাতে (সৌর) বিদ্যুতের আলোয় কাজ করছে। বিনোদন ও শিক্ষার জন্য টেলিভিশন দেখছে। দেশের প্রতিটি এলাকায় ডিজিটাল সুবিধা পৌঁছে যাচ্ছে। এভাবেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর