আন্তর্জাতিক ট্যাক্সিডার্মি কনফারেন্সে পুরস্কার জিতলো বাংলাদেশের দুই তরুণ
আন্তর্জাতিক ট্যাক্সিডার্মি কনফারেন্সে পুরস্কার জিতলো বাংলাদেশের দুই তরুণ
২০১৬-০৬-২৬ ০৬:০২:২২
প্রিন্টঅ-অ+


বিজ্ঞান ও শিল্পের এক স্বপ্নময় যুগলবন্দি ট্যাক্সিডার্মি। পৃথিবীর বিখ্যাত সব ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে (লন্ডন, বার্লিন, ওয়াশিংটন প্রভৃতি) প্রাণীদের এ ধরনের শিল্পময় উপস্থাপন দেখতে পাওয়া যায়। মৃত প্রাণীর চামড়া ব্যবহার করে বিশেষ কৌশলে তার মধ্যে জীবন্ত রূপ ফুটিয়ে তোলাই হচ্ছে ট্যাক্সিডার্মি। কাজটা মোটেই সহজ নয়। আধুনিক ট্যাক্সিডার্মি প্রাণীর বাসস্থান তথা বাস্তুতাত্তি্বক তথ্যের শিল্পময় উপস্থাপনও করে থাকে। শিক্ষা ও গবেষণায় ট্যাক্সিডার্মির ভূমিকা অপরিসীম। তবে দক্ষ ও নিপুণ ট্যাক্সিডার্মিস্ট হতে গেলে ধৈর্য, একাগ্রতা ও প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে সৃজনশীল শৈল্পিক মনেরও অধিকারী হতে হয়।

সচরাচর উন্নত বিশ্বের বিশেষজ্ঞরাই ট্যাক্সিডার্মির ভুবনে রাজত্ব করেন। এবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। চলতি বছরের ৫-৯ এপ্রিল জার্মানির বার্লিন শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ট্যাক্সিডার্মি কনফারেন্স-২০১৬ উপলক্ষে বাংলাদেশের এই সাফল্যটি এসেছে। বাংলাদেশের দুই তরুণ আমিনুল ও রায়হান চারটি ক্যাটাগরিতে মোট পাঁচটি পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। তার মধ্যে আমিনুল একাই জিতেছেন দুটি প্রথম ও দুটি দ্বিতীয় পুরস্কার। রায়হান জিতেছেন একটি দ্বিতীয় পুরস্কার। আর এ অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পেল দুজন আন্তর্জাতিক মানের ট্যাক্সিডার্মিস্ট। ট্যাক্সিডার্মির জগতে বাংলাদেশও এখন অনন্য এক উচ্চতায়।

জার্মান ট্যাক্সিডার্মি সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত এ বছরের প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০০ প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। এবারের এই প্রতিযোগিতার জন্য কয়েক মাস আগে আয়োজকরা প্রতিযোগিতার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে কয়েকটি প্রাণীর প্রজাতি নির্ধারণ করে। বিশ্বের অন্যান্য প্রতিযোগীর মতো বাংলাদেশের রায়হান ও আমিনুলও সেই চ্যালেঞ্জিং প্রাণী প্রজাতির ট্যাক্সিডার্মি শুরু করেন এবং তাদের সেই তৈরিকৃত প্রাণীগুলো নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে পাস করে বের হয়েছেন। ২০১৩ সাল থেকে জার্মানির অ্যাফোর্ট শহরে অবস্থিত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বিখ্যাত ট্যাক্সিডার্মিস্ট মার্কো ফিশারের তত্ত্বাবধানে ইউরোপের নামকরা সব প্রতিষ্ঠানে ট্যাক্সিডার্মির বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন আমিনুল ও রায়হান। জার্মানিতে তাদের প্রশিক্ষণ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় আধুনিক ট্যাক্সিডার্মির বিকাশ ঘটেছে প্রায় একশ বছর আগে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আধুনিক ট্যাক্সিডার্মির প্রশিক্ষণ কিংবা অনুশীলন শুরু হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর আগে। আর এই অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দুবার অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করল। এর আগে ২০১৪ সালে (২২-২৭ এপ্রিল) ইতালিতে অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান ট্যাক্সিডার্মি চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় এই তরুণদ্বয় যুগ্মভাবে ইউরোপের সব প্রতিযোগীকে হারিয়ে দিয়ে বেস্ট ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড শাখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।

বাংলাদেশে সত্যিকারের প্রশিক্ষিত দক্ষ ট্যাক্সিডার্মিস্টের বড়ই আকাল। তারা তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করে দেশের কল্যাণে তাদের লব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে ট্যাক্সিডার্মি চর্চায় বাংলাদেশে নতুন যুগের সূচনা হবে। আর সে যাত্রায় পথপ্রদর্শক হবেন বাংলাদেশের এই দুই তরুণ।

প্রকৃতপক্ষে ট্যাক্সিডার্মি কৌশল প্রয়োগ করে প্রস্তুতকৃত সেসব প্রাণী রাখার উপযুক্ত স্থান হচ্ছে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে এবং বহু উন্নয়নশীল দেশেও একাধিক ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে একটিও নেই। শোনা যাচ্ছে, ঢাকাতে একটি ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খবরটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংক্রান্ত শিক্ষা, গবেষণা, সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা তৈরিতে সমগ্র দেশের মধ্যে শুধু রাজধানীতে একটি ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম করলেই তা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। পর্যায়ক্রমে বিভাগভিত্তিক ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে কিংবা ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন প্রভৃতি কারণে নানা ধরনের অসংখ্য প্রাণী মারা যায়। ট্যাক্সিডার্মির সাহায্যে মৃত সেসব প্রাণীর অবিকল প্রতিরূপ তৈরি করে তা থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব। ট্যাক্সিডার্মিস্টরা হচ্ছেন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অন্যতম মানবসম্পদ। তাই দু-দুটো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত আমিনুল ও রায়হান বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ একাধিক ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জন্যও সম্পদ হতে পারেন। বাংলাদেশ অপেক্ষায় রইল এই দুই তরুণের।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

প্রবাস এর অারো খবর