বাস্তবের পথে মেট্রোরেল: প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন আজ
বাস্তবের পথে মেট্রোরেল: প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন আজ
২০১৬-০৬-২৫ ০৮:৩২:৩১
প্রিন্টঅ-অ+


রাজধানীর উত্তরায় দিয়াবাড়ি খালের দুই পাশে বিরান ভূমি। স্থাপনা বলতে খালের ওপর একটি সেতু। এর উত্তর পাশে কয়েকদিন ধরে জোরেশোরে চলছে নির্মাণকাজ। খালের দুপাশে মাটি ভরাটের পর সমান করা হচ্ছে। কারণ, এখানেই হবে মেট্রোরেলের ডিপো। এখান থেকেই ২০১৯ সালে চলবে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। মাত্র ৩৭ মিনিটে পৌঁছানো যাবে উত্তরা থেকে মতিঝিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিনাম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কর্মীরা মাটি সমান করার কাজ করছেন। মেট্রোরেলের ওয়ার্কশপ ও দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা হবে ডিপো থেকে। সার্ভেয়ার আল আমীন জানালেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজের উদ্বোধন করবেন। এ কারণেই এত ব্যস্ততা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক জানান, আজ রোববার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণকাজ উদ্বোধন করবেন।

সরকারের ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি মেট্রোরেল। প্রকল্পের অগ্রগতিকে নির্বিঘ্ন করতে মেট্রোরেল আইন-২০১৫ প্রণয়ন করেছে সরকার। ভূমি অধিগ্রহণে বিশেষ বিধান রাখা
হয়েছে আইনে। উত্তরায় রাজউকের প্রায় ৫৯ একর জমিতে মেট্রোরেলের ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। ৫৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এ কাজ পেয়েছে টোকিং কনস্ট্রাকশন। তাদেরই এদেশীয় সহযোগী সিনাম ইঞ্জিনিয়ারিং। চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৮ সালে শেষ হবে ডিপো নির্মাণের কাজ। একই সময়ে চলবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল রুট নির্মাণের কাজ। আটটি প্যাকেজে ভাগ করে হচ্ছে দেশের প্রথম মেট্রোরেলের (এমআরটি-৬) কাজ।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ছয়টি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ডিপো নির্মাণে চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে।

উত্তরা ফেজ-৩ থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারি কোম্পানি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিমিটিসিএল)। নির্বাহী সংস্থা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দেবে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য এ ঋণের সার্ভিস চার্জ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এর মধ্যে রেয়াতকাল থাকছে ১০ বছর। বাকি টাকা জোগান দেবে সরকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার।

২০১৩ সালের ১ নভেম্বর মেট্রোরেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালের ১১ জুলাই ডিপোর ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু হবে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে ২০২০ সালে মধ্যেই আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আশা ব্যক্ত করেন। মেট্রোরেলের মূল স্থাপনার প্রাথমিক নকশার কাজ শেষ হয়েছে ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর।

প্রকল্প পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে মেট্রোরেল প্রকল্পের আট শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের শেষ প্রান্ত মতিঝিল পর্যন্ত ভূমি জরিপের কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই মেট্রোরেলের কাজ শেষ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের রুট চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষায় একাধিকবার এ পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। আটটি প্যাকেজের মধ্যে একটির চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। ডিমিটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ডিপোর (প্যাকেজ-১) নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও ১১ কিলোমিটার পথের (প্যাকেজ ৩ ও ৪) ভায়াডাক্ট (ট্রেন চলাচলের উড়াল পথ) এবং স্টেশনের প্রাথমিক নকশা হয়েছে। চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল (প্যাকেজ-৫ ও ৬) রুটের ভায়াডাক্ট ও স্টেশনের প্রাথমিক নকশা করা হয়েছে। মেট্রোরেলের বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের কাজের (প্যাকেজ-৭) দরপত্র এখনও আহ্বান করা হয়নি। বগি ও ইঞ্জিন সংগ্রহের (প্যাকেজ-৮) দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে গত ২৫ ডিসেম্বর।

উত্তরার ফেজ-৩ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেলের স্টেশন থাকবে ১৬টি। এর নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। ভারতের দিলি্লর মেট্রোরেল আনন্দ হাবের নকশাকারী যুক্তরাজ্যের জন ম্যাকআসলান পার্টনারস আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ পেয়েছে। মুসলিম স্থাপত্যরীতিতে ১৬টি স্টেশনের নকশা করা হবে। চাদোয়ার মতো শামিয়ানা ওপর থেকে নিচে নেমে আসবে প্ল্যাটফর্মের ওপর, যা স্টেশনে সূর্যের আলো আসতে সহায়তা করবে। রাস্তার ওপর হবে এসব স্টেশন। স্টেশনগুলো ঢাকার নতুন পরিচয় সৃষ্টি করবে।

গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক ডিমিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে সবচেয়ে সফল ভূমিকা রাখবে মেট্রোরেল। ফ্লাইওভার পৃথিবীর কোনো দেশে যানজট দূর করতে পারেনি। ঢাকায়ও পারবে না। ফ্লাইওভারের সুফল স্বল্পমেয়াদি। মেট্রোরেলের সুফল দীর্ঘমেয়াদি। যাদের গাড়ি আছে, শুধু তারাই ফ্লাইওভারের সুফলভোগী। মেট্রোরেল মানেই গণপরিবহন। এর সুফল পাবেন সাধারণ মানুষ।

ডিমিটিসিএল জানিয়েছে, রাস্তার মাঝ বরাবর উড়াল পথের (ভায়াডাক্ট) ওপর স্থাপিত ডাবল রেললাইন থাকবে। ছয় মিটার চওড়া এই উড়াল পথে উভয় দিক থেকে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। রাস্তার ওপর ঝুলন্ত স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম দৈর্ঘ্য হবে ১৭০ মিটার। নিচতলায় হবে টিকিট কাউন্টার ও স্বয়ংক্রিয় প্রবেশদ্বার। চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে পেঁৗছাবেন। ইলেকট্রিক ট্রেনগুলো চলবে বিদ্যুতের সাহায্যে। মোট ২৪ জোড়া ট্রেন থাকবে। প্রতি ট্রেনে থাকবে ছয়টি করে বগি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে যাবে মেট্রোরেলের রুট। শিক্ষার্থীদের একাংশ এর বিরোধিতা করে রুট পরিবর্তেনের দাবি জানিয়ে আসছেন। মেট্রোরেলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। তিনি জানান, মেট্রোরেলে কম্পন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে। লাইনের নিচে থাকবে ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম (এমএসএস)। এতে কম্পন অনুভূত হবে না। ফলে রেলপথের আশপাশের স্থাপত্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। শব্দদূষণ রোধের ব্যবস্থাও থাকছে। বিশ্ববিদ্যালয়, সংসদ এলাকায় শব্দ শোষণকারী দেয়াল থাকবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তরা থেকে পল্লবী, মিরপুর, সংসদ ভবন সংলগ্ন খামারবাড়ি হয়ে যাবে মেট্রোরেল পথ। ১৬টি স্টেশন হবে উত্তর উত্তরা, মধ্য উত্তরা, দক্ষিণ উত্তরা, পল্লবী, আইএমটি, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও মোড়, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, শাপলা চত্বরে। প্রতি সাড়ে তিন মিনিট পর স্টেশনে থামবে। প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফিচার এর অারো খবর