সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল করার শত কোটি টাকার কর্মসূচি ভেস্তে গেছে
সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল করার শত কোটি টাকার কর্মসূচি ভেস্তে গেছে
২০১৬-০৬-২০ ২৩:২৫:৪৫
প্রিন্টঅ-অ+


প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল করার শত কোটি টাকার কর্মসূচি ভেস্তে গেছে। কোনো মাস্টার প্ল্যান বা পরিকল্পনা ছাড়াই প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। কিন্তু সীমাহীন অব্যবস্থা ও তদারকির অভাবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই মুখ থুবড়ে পড়ে। এর আওতায় ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনা হয়। কিন্তু এসব যন্ত্রাংশের বেশির ভাগ এখন অকেজো ও ব্যবহার অনুপযোগী। অর্থের অভাবে এসব যন্ত্রাংশ ঠিক করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি কাজ চলাকালীন ১০ বছরে এ কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক পদে ৬ বার পরিবর্তন করা হয়। সব প্রকল্প পরিচালকই পূর্ণকালীন নিয়োগ না দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩৪৬টি কম্পিউটারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। যার ২ হাজার ৭৯২টি নষ্ট হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম (ভারপ্রাপ্ত পরিকল্পনা সচিব) বলেন, প্রত্যেক প্রকল্প গ্রহণের সময়ই ঠিক করা উচিত তা শেষ হওয়ার পর সুফল কিভাবে নিশ্চিত হবে। শুরু থেকেই পরিকল্পনা না থাকলে প্রকল্প শেষে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে না এবং কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়।

কর্মসূচির পরিচালক প্রশাস্ত কুমার চক্রবর্তী বলেন, এ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেলে ভালো হতো। কিন্তু এ প্রকল্প কাজ চলার সময়ই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পসহ আইসিটি মন্ত্রণালয়ের বেশকিছু প্রকল্প শুরু হয়। লিড এজেন্সি তৈরি হওয়ায় পরে এ কর্মসূচির সময় বাড়ানো হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩৪৬টি কম্পিউটারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। যার ২ হাজার ৭৯২টি নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৬৬৭টি কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতির মধ্যে সবগুলোই নষ্ট। কৃষি মন্ত্রণালয়ে ৯২টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ৭০টি নষ্ট, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২৭টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৪টি নষ্ট এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪৪টির মধ্যে ৪২টিই নষ্ট হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ চা বোর্ডের ৮৬টি যন্ত্রাংশের মধ্যে ৫৯টি নষ্ট ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মানিকগঞ্জ রেকর্ড রুমের ৩১টির মধ্যে সবই প্রায় নষ্ট পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) ৯১টি যন্ত্রাংশের মধ্যে ৫৩টি, পুলিশের ৮২১টির মধ্যে ৭৮২টি, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের ১১৮টির মধ্যে ৮৬টি নষ্ট রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ৫৫টি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে নষ্ট হয়েছে সবগুলো। একইভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৫৬টির যন্ত্রাংশের নষ্ট সবগুলোই। এদিকে শেরপুর ডিসি কার্যালয়ের ১১৪টির মধ্যে ১১২টি, কুমিল্লা ডিসি কার্যালয়ের ১১৬টির মধ্যে ১১৫টি নষ্ট রয়েছে। কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের ১২৩টি কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশের মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়েছে ৮৪টি এবং বাংলাদেশ বিমানের ৪৬টি যন্ত্রাংশের নষ্ট হয়েছে ৪৫টি।

এছাড়া কর্মসূচির মাধ্যমে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন কারণে আর প্রয়োজনীয় মেরামত করা হয়নি। মেরামত না করায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই যন্ত্রপাতি আর ব্যবহৃত হয়নি।

এর মূল কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা। চুক্তি শেষে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবশ্যক টেকনিক্যাল সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের টেকনিক্যাল কর্মীর অভাব ছিল যারা ছোটখাটো মেরামত নিজেরাই করে দিতে পারত। ঢাকার বাইরের প্রতিষ্ঠানে নিকটস্থ কোনো কম্পিউটার মেরামতের ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০০২ সালে ৮৩ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে কর্মসূচিটি গ্রহণ করা হয়। এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে। ২০০৫ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দু’বার সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ১০১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়ন সময় বাড়িয়ে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। কর্মসূচির আওতায় ৫৫টি সাব-প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কথা থাকলেও শেষদিকে কমিয়ে ৩৯টি সাব-প্রজেক্ট করা হয়।

এ প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ছিল ওয়েবসাইট এবং প্রসেস অটোমেশন সফটওয়্যার নির্মাণে সহায়তা করা। অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা (লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক, মেট্রোপলিটন এরিয়া নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগ)। হার্ডওয়্যার সরবরাহ যেমন কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, সার্ভার, ভিডিও কনফারেন্সিং সরঞ্জামাদি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ দেয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসআইসিটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে কোনো মাস্টার প্ল্যান বা বিস্তারিত সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রকৃত প্রয়োজনভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি প্রণয়ন করা যায়নি।

এ কর্মসূচির প্রতি চরম অবহেলার উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ১০ বছর মেয়াদের মধ্যে ৬ জন প্রকল্প পরিচালক কর্মরত ছিলেন। তার মধ্যে একজন ৪ বছর, একজন ৩ বছর, একজন ১ বছর এবং বাকি ৩ জন ১ বছরের কম সময় নিয়োজিত ছিলেন। সব প্রকল্প পরিচালকই পূর্ণকালীন নিয়োগ না দিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ কর্মসূচির আওতায় সরবরাহকৃত সফটওয়্যার অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় আপডেটিং না করার কারণে আর ব্যবহৃত হয়নি। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকের অভাব এবং চুক্তি শেষে সফটওয়্যার সরবরাহকারীদের কাছে আবশ্যক টেকনিক্যাল সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তাছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সিকিউরিটি সিস্টেম সরবরাহ করা হয়নি।

প্রশিক্ষণার্থীদের জরিপ থেকে কিছু ধারাবাহিকতার সমস্যা শনাক্ত করেছে আইএমইডি। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন ফলোআপ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল। ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণে অধীনস্থ কর্মকর্তা বা সহকর্মীকে বিবেচনায় আনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব মতামত থেকে বেরিয়ে আসে প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতার অভাব ছিল এবং কর্মসূচির আওতায় আরও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

সংস্থাটি বলছে, কম্পিউটার বা যাবতীয় সরঞ্জামগুলোর বিক্রেতার বিক্রয়োত্তর সেবার চুক্তি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সময়সীমার মধ্যে যন্ত্রপাতি নষ্ট হলেও তা মেরামতে বিক্রেতা কাজ করেনি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে এ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে আইএমইডি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরঞ্জাম সরবরাহকারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ইউজার ফ্রেন্ডলি সফটওয়্যার সরবরাহ করা। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারী ও উপকারভোগীদের জন্য সচেতনতা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা। কানেক্টিভিটি সমস্যাগুলোর সমাধান এবং প্রকল্প পরিচালকসহ কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি না করা।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর