দেশের নদীগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা-ক্রোমিয়াম
দেশের নদীগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা-ক্রোমিয়াম
২০১৬-০৬-১৩ ০১:০২:২২
প্রিন্টঅ-অ+


প্রতিদিনই হাজার হাজার লিটার অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য গিয়ে মিশছে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানিতে। নির্ধারিত মানমাত্রার বহুগুণ ভারী ধাতবও যাচ্ছে এর সঙ্গে। ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো ভারী ধাতু জমা হচ্ছে নদীর তলদেশে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নদীগুলোর জলজ বাস্তুসংস্থানেরও ক্ষতি করছে।

১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে করা বিভিন্ন গবেষণা তথ্য থেকে দেখা গেছে, বংশী নদীতে ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসা রয়েছে যথাক্রমে ৯৮, ১ দশমিক ৯৩, দশমিক ৬১ ও ৬০ মিলিগ্রাম। বুড়িগঙ্গায় ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও সিসার উপস্থিতি যথাক্রমে ১৭৮, ৩ দশমিক ৩ ও ৭০ মিলিগ্রাম। আর পায়রা নদীতে ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসা রয়েছে যথাক্রমে ৪৫, ১২, দশমিক ৭২ ও ২৫ মিলিগ্রাম। করতোয়ায় ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মাত্রা যথাক্রমে ১০৯, ২৫, ১ দশমিক ২ ও ৫৮ মিলিগ্রাম। পদ্মা নদীতে ক্রোমিয়াম রয়েছে ৯৭ ও সিসা ১৭ মিলিগ্রাম। আর যমুনায় ক্রোমিয়াম ১১০ ও সিসা রয়েছে ১৯ মিলিগ্রাম। সরকারি নানা নথিতেও বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদীতে এসব ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মত্স্য অধিদপ্তরের চার গবেষক সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর পানিতে ২০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম, ৮১ দশমিক শূন্য ৯ মিলিগ্রাম আর্সেনিক, ২ দশমিক শূন্য ১ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম ও ৪৩ দশমিক ৬৯ মিলিগ্রাম সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। তবে নদীটিতে শীত ও গ্রীষ্মে এসব ধাতুর মাত্রার পার্থক্য রয়েছে। গ্রীষ্মে কর্ণফুলীতে ক্রোমিয়ামের মাত্রা থাকে ৫৭ দশমিক ৩১ ও শীতকালে ৭৮ দশমিক ৪৮ মিলিগ্রাম। আর সিসার মাত্রা গ্রীষ্মে ৩৫ দশমিক ২৫ ও শীতকালে ৪২ দশমিক ৫৯ মিলিগ্রাম। আর্সেনিক গ্রীষ্মে ১৩ দশমিক ১৭ ও শীতকালে ১৯ দশমিক ৬৭ মিলিগ্রাম এবং ক্যাডমিয়াম গ্রীষ্মে ১ দশমিক ১ ও শীতে ১ দশমিক ৮৭ মিলিগ্রাম রেকর্ড করা হয়েছে গবেষণাকালে।
ওই গবেষণায় কর্ণফুলী দূষণের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে সমুদ্রবন্দর ও অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসরণ। শীতকালে পানিপ্রবাহ কম থাকায় নদীর তলদেশে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেড়ে যায়।

নদীতে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ বেশি হওয়ায় জ্বালানি, সার ও বস্ত্র কারখানা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলাকে দায়ী করা হয়েছে। আর কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, কপার আর্সেনেট দিয়ে কাঠ সিজনিংকে আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। এছাড়া সিমেন্ট কারখানা, ট্যানারি, ব্যাটারি ও সিএফএল বাল্বসহ বিভিন্ন উত্স থেকে সিসা, পারদের মতো বিভিন্ন ভারী ধাতু মিশছে নদীর পানিতে।
অনেকটা একই কারণে এসব ভারী ধাতুর মাত্রা বাড়ছে ঢাকার নদ-নদীগুলোয়ও।

ঢাকার পাশে ধলেশ্বরীর কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে পাঁচ শতাধিক ইটভাটা। ইটভাটাগুলোয় যে কয়লা পোড়ানো হয়, সেখান থেকে প্রতিদিন ভারী ধাতু পারদ মিশছে নদীতে। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যায় রয়েছে বড় বড় সিমেন্ট কারখানা। এখান থেকে মিশছে পারদ, সিসা ও ধুলোবালি। ব্যাটারির সিসা যাচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। এছাড়া ট্যানারি বর্জ্যের কারণে বুড়িগঙ্গায় ক্রোমিয়ামের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

বুড়িগঙ্গার অনেক জায়গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। কর্ণফুলীতেও ক্রোমিয়ামের জন্য অনেকটা দায়ী ট্যানারি। শত শত টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্যে চরমভাবে দূষিত হচ্ছে তুরাগ।

পরিবেশ অধিদপ্তর সুপেয় পানিতে আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও সিসার মানমাত্রা নির্ধারণ করেছে দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। আর ক্যাডমিয়ামের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা নির্ধারণ করেছে দশমিক শূন্য শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। অথচ এর বহুগুণ বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সুপেয় পানির সবচেয়ে বড় উত্স নদীগুলোয়।

আর শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধনের পর নির্গত তরলের ক্ষেত্রে আর্সেনিকের মাত্রা দশমিক শূন্য ৫, ক্রোমিয়াম ১, ক্যাডমিয়াম দশমিক ৫ ও সিসার মানমাত্রা ১ মিলিগ্রািম নির্ধারণ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এছাড়া সেচভূমির জন্য সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা দশমিক ১, ক্রোমিয়ামের ১, ক্যাডমিয়ামের দশমিক ৫ ও আর্সেনিকের দশমিক ২ মিলিগ্রাম। কিন্তু অধিকাংশ নদ-নদীর পানিতেই এসব ধাতুর উপস্থিতি নির্ধারিত মাত্রার অনেক বেশি।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) ড. সুলতান আহমেদ বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলো সবচেয়ে বেশি দূষিত হয়েছে। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করা, তলদেশ ড্রেজিংসহ আমাদের বেশকিছু কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে।

পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি এসব নদ-নদীর জলজ বাস্তুসংস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কাউসার আহমেদ বলেন, নদীর পানিতে যেসব ভারী ধাতু মেশে, তা সাধারণত তলদেশে জমা হয়। যেসব মাছ কাদামাটি খায়, সেসব মাছ খেলে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। মাছ ছাড়াও নদীর তলদেশে শামুক-ঝিনুক এসব ধাতু মিশ্রিত কাদামাটি খায়। আর হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয় শামুক ও ঝিনুক। ফলে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই প্রবেশ করে এসব ভারী ধাতু। এভাবে খাদ্যচক্রের প্রতিটি ধাপেই এসব ভারী ধাতুর প্রভাব রয়েছে।
(মেহেদী আল আমিন)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

পরিবেশ এর অারো খবর