অপার সম্ভাবনাময় ধোলাইখাল
অপার সম্ভাবনাময় ধোলাইখাল
২০১৬-০৬-০৭ ১৭:৪৮:৫১
প্রিন্টঅ-অ+


হাতেম ইঞ্জিনিয়ারিং, মায়ের দোয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ভাই-ভাই ইঞ্জিনিয়ারিংস... পুরান ঢাকার রায়েশা বাজার মোড় থেকে টিপু সুলতান রোড হয়ে আপনি ওয়ারি, ধোলাইখাল কিংবা লক্ষ্মীবাজার যেদিক বরাবরই হেঁটে যান না কেন এমন শতাধিক ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ওয়ার্কশপ আপনার চোখ এড়িয়ে যাওয়া আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।

অনেকেই হয়ত এই দোকানগুলোর নামের পাশে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ লেখাটি দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হন এই ভেবে যে, এসব দোকান মালিক এবং কর্মচারীদের তো প্রাতিষ্ঠানিক প্রকৌশল জ্ঞান কিংবা ডিগ্রি নেই তবে কেন তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং যুক্ত করছেন?

এই বিভ্রান্তি মুহূর্তেই উবে যাবে যদি আপনি এই দোকানগুলোর আশেপাশে একটু চোখ কান খোলা রেখে হেঁটে বেড়ান। আপনার গাড়ির কোন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু কোথাও সেই যন্ত্রাংশ খুজে পাচ্ছেন না? কিংবা আপনার বস্ত্রশিল্পের কারখানায় ব্যবহৃত মেশিনটি কোন অদ্ভুতুড়ে সমস্যায় আক্রান্ত, যার সমাধান কেউ দিতে পারছেন না? ১৯৬৮ সাল থেকে এমনি শত সমস্যার সমাধান দিয়ে আসছে রাজধানীর ধোলাইখালে অবস্থিত সেই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ওয়ার্কশপগুলো; যার মালিক কিংবা শ্রমিক কারোরই নেই প্রাতিষ্ঠানিক কোন প্রকৌশল জ্ঞান। এটি বললেও কোনোভাবেই বেশি বলা হবে না যে হাতে কলমে কাজ শিখতে শিখতে তারা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালব্ধ কোন কোন প্রকৌশলীর সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতা করছেন।

ধোলাইখাল বিষয়ে আরও বিস্তর জানতে ‘দি ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর পক্ষ থেকে আমরা গিয়েছিলাম Bangladesh Engineering Industry Owners Association (BEIOA)- এর সভাপতি জনাব আব্দুর রাজ্জাকের কাছে। প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে তিনি এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আর ধোলাইখালে তিনি সাফল্যের সাথে ব্যবসা করেছেন প্রায় ৩০ বছর।

প্রথমেই তার কাছে আমরা জানতে চাই, বিইআইওএ মূলত কি ভূমিকা পালন করে?
জনাব রাজ্জাক বলেন, “ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাতে প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধানই মূলত ‘বিইআইওএ’-র প্রধান কাজ। এ জন্য আমদানি-রফতানি নীতি, শিল্প নীতি, রাজস্ব নীতি এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের মত বিষয়গুলোতে আমরা অ্যাডভোকেসি করে থাকি। এই খাতকে কীভাবে আরও ব্যবসাবান্ধব করা যায় সেজন্য আমরা আইনপ্রণয়নকারীদের সাথেও সেতুবন্ধনের কাজ করে থাকি”।

এই শিল্পের উন্নয়নে আপনারা কোন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পান কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “যথেষ্ট না হলেও আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পৃষ্ঠপোষকতা পাই। যেমন, রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের জন্য ১০ শতাংশ প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও ভ্যাট, ট্যাক্স, ট্যারিফের ক্ষেত্রেও আমরা কিছু শর্তের ভিত্তিতে প্রণোদনা পেয়ে থাকি”।

ধোলাইখাল তো বর্তমানে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এর শুরুটা হল কীভাবে- এই প্রশ্নের উত্তরে জনাব রাজ্জাক বলেন, “১৯৬৮ সাল থেকে ধোলাইখালে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান গড়ে উঠলেও মূলত স্বাধীনতার পর হতেই ধোলাইখালে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের পদযাত্রা শুরু। স্বাধীনতার পর ১৫-২০ টি টং দোকানে খুবই সীমিতভাবে সার্ভিসিং-এর কিছু কাজ করা হত এবং হাতে গোনা বাস ট্রাকের কিছু যন্ত্রাংশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ধোলাইখালসহ সারা বাংলাদেশে আমাদের প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি দোকান এবং কারখানা রয়েছে। এসব দোকান ও কারখানায় বাস, ট্রাক এবং ব্যক্তিগত গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির পাশাপাশি মেরামতের কাজও করা হয়। শুধু এর মধ্যেই এই শিল্পের কাজ সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে গার্মেন্টস, ফাস্টফুড কিংবা অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত যে মেশিনারিজ সেগুলোও আমরা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করছি। এমনকি আমাদের তৈরি যন্ত্রাংশ এবং মেশিনারিজ চিন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। অনেকে হয়ত এটি জানেন না যে কৃষি এবং চা শিল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রপাতিও আমাদের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর হতে উৎপাদিত। এমন নয় যে শুধুমাত্র ধোলাইখালেই এসব যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। আপনি যেমনটি বলছিলেন যে ধোলাইখাল একটি ব্র্যান্ড অর্থাৎ ধোলাইখাল আমাদের সমগ্র লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরকে প্রতিনিধিত্ব করছে”।

এত সফলতা সত্ত্বেও এই খাত দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন- এর উত্তরে তিনি বলেন, “নামমাত্র সরকারী যেই পৃষ্ঠপোষকতা আমরা পাই। তা দিয়েই আমাদের ব্যবসায়ীবৃন্দ এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন। ভ্যাট-ট্যাক্সের খড়গ আমাদের উৎপাদনকে অনেকাংশেই ব্যহত করছে। তবুও দেশের অর্থনীতিতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের অবদান মোট জিডিপি’র ২ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছর এই খাতে মোট রফতানি আয় ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। তাই, দেশের অর্থনীতিতে আমাদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। কিন্তু তৈরি পোশাক খাতে সরকারের পক্ষ থেকে যে গুরুত্ব দেয়া হয় তার কিছুটা হলেও যদি এই খাতে দেয়া হত তাহলে তৈরি পোশাক খাতের চেয়েও বিকশিত খাত হত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত। এর জন্য আমরা সরকারকে আমাদের পাঁচ ‘প’ নীতির কথা অবগত করেছি। এগুলো হল- পুঁজি(সহজ শর্তে ঋণ), প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, পলিসি সাপোর্ট এবং পার্ক (ইপিজেডের মত বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল)। সরকার ইতোমধ্যে মুন্সিগঞ্জের বেতকায় ৫০ একর জায়গার উপর এমন একটি শিল্পাঞ্চল নির্মাণের কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছে। এর কাজ শেষ হয়ে গেলে আমাদের যে বর্তমান আয় তা প্রায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে”।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রকৌশল জ্ঞান না থাকায় আপনাদের উৎপাদনে কি কোন প্রভাব ফেলছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে জনাব রাজ্জাক বলেন, “তা তো কিছুটা প্রভাব ফেলছেই। যেমন আমাদের শ্রমিকেরা স্যাম্পল দেখে কাজ করায় অভ্যস্ত অর্থাৎ কেউ যদি একটি যন্ত্রাংশের স্যাম্পল নিয়ে যান সেটি যতটাই দুর্বোধ্য হোক তারা তৈরি করে ফেলতে পারেন কিন্তু মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারদের মত ডিজাইনের ড্রয়িং দেখে কাঙ্ক্ষিত যন্ত্র শ্রমিকেরা তৈরি করতে পারেন না। তাই, দেশের বাইরের বায়ারদের অনেক সময় আমাদের ফিরিয়ে দিতে হয়। অবশ্য এই সমস্যা সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে শ্রমিক-মালিক উভয়ের জন্যই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। এমনকি সরকার এবং বৈদেশিক বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও আমাদের এই প্রশিক্ষনে সহায়তা করছে। যেমন, SEIP – Skills for Employment Investment Program -এই প্রশিক্ষণ প্রদানে ‘বিইআইওএ’র পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(এডিবি) সার্বিক সহযোগিতা করছে। এছাড়াও বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং ইন্সটিটিউট হতে বিইআইওএ মালিক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে”।

দেশের এই সম্ভাবনাময় খাতটি তৈরি পোশাক খাতের মত হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি স্তম্ভ। কিন্তু এ জন্য চাই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি আইনপ্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের পূর্বে এ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের মতামত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাও এ খাতের উন্নতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই খাতের অভিভাবক জনাব আব্দুর রাজ্জাক।
(আবু সাঈদ)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিশেষ প্রতিবেদন এর অারো খবর