আইইবি’তে বস্ত্রশিল্পে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত
আইইবি’তে বস্ত্রশিল্পে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত
২০১৬-০৬-০২ ১২:১৩:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+


ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি)-র ৬৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী (ইঞ্জিনিয়ার্স ডে) উদযাপন উপলক্ষে আইইবি’র মাসব্যাপী অনুষ্ঠান কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ১ জুন, ২০১৬ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন আইইবি’র পুরাতন ভবনের সেমিনার কক্ষে “Sustainability of Textiles inBangladesh an Intelligent & Greener Approach” শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে।

আইইবি’র ৬৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক মাসব্যাপী আয়োজনের বুধবার ছিল শেষ দিন। তাই, এই সেমিনারে আইইবি’র নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পরার মত।

সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ ফ্যাশন এবং টেকনোলোজি বিশ্ববিদ্যালয়(বিইউএফটি)’র উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডঃ ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইইবি’র সম্মানী সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোঃ নুরুজ্জামান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র পরিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব মোঃ ইসমাইল।
সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইইবি’র টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের সম্মানী চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শফিকুর রহমান।
এবং সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপি।

প্রথমেই শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আইইবি’র সম্মানী সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, “এ মাসের গত ৭ তারিখ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ডঃ আব্দুল হামিদ ইঞ্জিনিয়ার্স ডে’র উদ্বোধনের পর আমাদের মাসব্যাপী যে অনুষ্ঠান কর্মসূচী আমরা শুরু করেছিলাম তার শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। এই সময়ে আমাদের অনুষ্ঠান কর্মসূচী শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। ৭ টি বিভাগে আমাদের অসংখ্য সেমিনার সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়েছে”।

সেমিনারের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ৮০’র দশকে ইইউ(ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। খুবই সীমিত আকারে এই খাতের পথচলা শুরু হলেও বর্তমানে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি এই বস্ত্র শিল্প খাত। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১৩ শতাংশ। পাশাপাশি এই খাত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এই খাতের আরও বিকাশের মধ্য দিয়ে”।

সেমিনারের মূল বক্তা অধ্যাপক ডঃ ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান সেমিনারের আলোচ্য বিষয়ের উপর তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বস্ত্র শিল্পে টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে আলোচনার আগে আসলে আমাদের জানা উচিত টেকসই উন্নয়ন কি। এককথায় টেকসই উন্নয়ন হল এমন উন্নয়ন যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতিসাধন না করে বর্তমানে কোন দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যে সময়সীমা বেধে দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ তার অনেক আগেই সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭ টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তা অর্জনেও বাংলাদেশ মুনশিয়ানা দেখাচ্ছে।

মাত্র তিন দশকেই বস্ত্র শিল্প খাতের যে বিকাশ ঘটেছে তা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। বস্ত্র শিল্প খাত হতে মোট আয়ের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশ। আর ২০২১ সালের মধ্যে এ খাত হতে আয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। শুধু যে রপ্তানির মাধ্যমে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীতকে শক্তিশালী করেছে তা নয়। ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দিয়েছে বস্ত্র শিল্প খাত। আর এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই হচ্ছে নারী শ্রমিক”।

তিনি আরও বলেন, “এই খাতে আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি ঠিকই কিন্তু এখন আমাদের ঝুঁকতে হবে টেকসই উন্নয়নের দিকে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পানির সংস্থান করা কারন বস্ত্র শিল্পে প্রচুর পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়। একটি টি-শার্ট তৈরি করতে আমাদের সর্বমোট ব্যয় হচ্ছে ১২০ টাকা। কিন্তু যদি আমরা এই টি-শার্টটি তৈরিতে ব্যবহৃত পানির মূল্য যোগ করি তবে এর দাম হবে ৮০০ টাকারও বেশি! এখন আমরা পানির সহজলভ্যতার কারনে এই ব্যয় হিসাব করছি না। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে গেলে আমরা আর এই পানি উত্তোলন করতে পারব না। তাই এখনি আমাদের বিকল্প খুজে বের করতে হবে।

এছাড়াও আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমানে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং জ্বালানীর অপ্রতুলতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের অদূর ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর দিকে ঝুঁকতে হবে”।

এরপর বক্তব্য রাখেন সেমিনারের বিশেষ অতিথি বস্ত্র পরিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব মোঃ ইসমাইল। তিনি বলেন, “বস্ত্র শিল্প খাতে আমাদের দেশে প্রায় ১৮ হাজার বিদেশী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার করছেন। অনেকের অভিযোগ বাইরের দেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের যেই বেতন ভাতা দেয়া হয় তা দেশীয় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার যারা কিনা দেশের বাইরে কাজ করছেন তাদের উপার্জিত টাকার পরিমাণ ঐ ১৮ হাজার বিদেশী ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়েও কম। অর্থাৎ আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কিন্তু কিছু কছু ক্ষেত্রে ে কথা সত্য নয়। আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে আমাদের দেশের অনেক টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার আছেন যাদের কর্মদক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। তাই, আমি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছি। এর মাধ্যমেই সম্ভব এই বৈষম্য দূর করা”।

এরপর বক্তব্য রাখেন সেমিনারের আরেক বিশেষ অতিথি আইইবি’র সম্মানী সহ-সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, “এদেশে বস্ত্র শিল্প খাতে যে বৈপ্লবিক উন্নয়ন তার কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার আমাদের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা। তাদের মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আমাদের পোশাকের চাহিদা সারা বিশ্বে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোতে তাদের কোন স্থান নেই। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন তিনি যাতে খুব দ্রুত টেক্সটাইল ক্যাডার চালু করেন।

আজ আমাদের মাসব্যাপী অনুষ্ঠান কর্মসূচীর শেষ দিন। এই এক মাস আমরা অসংখ্য সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করেছি। প্রতিটি সেমিনারে আমরা কিছু দিক নির্দেশনা এবং পরামর্শ রাখি। কিন্তু আমাদের সন্দেহ এই বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌছায় কি না। কারন আমরা এর বাস্তবায়ন দেখছি খুবই কম”।

সেমিনারের প্রধান অতিথি বস্ত্র ও পাঁট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, “প্রথমেই আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এই সেমিনারে আমন্ত্রন জানানোর জন্য। আপনারা হয়ত অনেকেই জেনে থাকবেন যে রানা প্লাজা ধসের আগে বস্ত্র খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এবং বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের বেশ দূরত্ব ছিল। কিন্তু রানা প্লাজা ধসের পর যখন এই খাতে আন্তর্জাতিক চাপ আসতে থাকে তখন আমার মন্ত্রণালয় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। ২০১৪ সালের মে মাসে একটি ক্যাবিনেট মিটিং এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক ভাবে এই বস্ত্র শিল্প খাত ও এর বিভিন্ন সংগঠনের অভিভাবক ঘোষণা করেন।

বস্ত্র শিল্প খাতকে আরও টেকসই করার জন্য সরকার সর্বদা তৎপর। এ লক্ষ্যেই আমরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপন করছি টেক্সটাইল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৭ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দেশের প্রথম টেক্সটাইল কলেজ স্থাপন করেন। আর ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রথম টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারও এই খাতের বিকাশে প্রশংসার দাবিদার”।

এ ছাড়াও সেমিনারে বক্তব্য রাখেন আইইবি’র টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “শুধু সুতা নয় পাঁটও কিন্তু বস্ত্র শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিত্যপন্য বহনে ব্যবহার্য ব্যাগ হিসেবে কীভাবে পলিথিনের বদলে চটের ব্যবহার বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে খুবই সচেষ্ট”।
(আবু সাঈদ)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

প্রকৌশল সংবাদ এর অারো খবর