ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দিকে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত
ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দিকে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত
২০১৬-০৫-২৫ ০২:৩৮:১৯
প্রিন্টঅ-অ+


সহজ শর্তে দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ঋণ না পাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের দিকে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। এই ঝুঁকি অচিরেই মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সরকারি সংস্থা পিডিবি। বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন এ ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, নিরুপায় হয়েই তারা এ কঠোর শর্তের ঋণ নিচ্ছে। এ খাতের দ্রুত উন্নয়ন চাইলে এই কঠোর শর্তের ঋণ ছাড়া বর্তমানে উপায় নেই।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পেঁৗছাতে চায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য পূরণে গত সাত বছরে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৮০০ কোটি ডলার (৬৪ হাজার কোটি টাকা)। ২০২১ সালের মধ্যে আরও দেড় হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ মিলছে না। তাই বিদ্যুৎ বিভাগ কঠিন শর্তের এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সির (ইসিএ) মাধ্যমে ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। এরই মধ্যে ইসিএ ঋণ নেওয়া হয়েছে দেড়শ কোটি ডলার। আরও প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি এসব ঋণ নিচ্ছে তাদের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা কম।

তাই বিদ্যুৎ খাতে এ ধরনের ঋণ অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি খাতের প্রধান সংস্থা পিডিবিও এই ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো এক প্রতিবেদনে পিডিবি ইসিএর মাধ্যমে অর্থায়নে ৫টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। ঝুঁকি মোকাবেলায় একটি সংকট ব্যবস্থাপনা তহবিল গঠনেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। মূলত সরকারি খাতে বিভিন্ন কোম্পানি এই ইসিএ ঋণ নিচ্ছে। এসব কোম্পানির উৎপাদিত বিদ্যুৎ পিডিবি কিনে নেয়।

ঝুঁকিপূর্ণ এই ইসিএ ঋণের কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগ সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, আগে দাতাদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন শর্তের কারণে দাতাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ জন্য বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে ইসিএ ঋণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলাম বলেন, উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিতে অর্থের প্রয়োজন। প্রচলিত উপায়ে ঋণ আর মিলছে না। তাই ইসিএ ফাইন্যান্সিংয়ের দিকে গিয়েছি। ঋণ পরিশোধে কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বিক্রি করবে, সে টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবে। কোনো সমস্যা হবে না।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ও কঠিন শর্তের এ ঋণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বলা হয়, এ ধরনের ঋণ পরিশোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা রয়েছে। ফলে এ ঋণের বোঝা একটা পর্যায়ে সরকারের ঘাড়েই চাপতে পারে। তখন এটা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, দুই কারণে বিদ্যুৎ খাতে এ ধরনের অর্থায়ন দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমত, যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ নিচ্ছে তাদের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব কোম্পানিকে আয় করেই অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এতে বিঘ্ন ঘটলে দায় মেটাতে হবে সরকারকে। দ্বিতীয়ত, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করে সে অনুসারে উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। বিদ্যুতের এ চাহিদার প্রাক্কলনে হেরফের হলে অনেক কেন্দ্র বসে থাকবে, বিদ্যুৎ বিক্রি হবে না। ফলে ঋণের বোঝা টানতে হবে সরকারকে, যা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

ইসিএ কী :বিভিন্ন দেশের উৎপাদিত পণ্য বহির্বিশ্বে বিক্রির জন্য মালপত্র ক্রেতার ঋণদাতাকে গ্যারান্টি দিয়ে থাকে এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি। গ্যারান্টি প্রদানের বিনিময়ে ক্রেতার কাছ থেকে এককালীন প্রিমিয়াম (৬ থেকে ১৫ শতাংশ) গ্রহণ করে ইসিএ। সব মিলিয়ে এ ধরনের ঋণে সুদের হার হতে পারে ৪ থেকে ৭ শতাংশ। সব ধরনের ইসিএ ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় (সভরেইন) গ্যারান্টি দিয়ে থাকে বা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা সরকারকে দিতে হবে।

পিডিবির চিহ্নিত ঝুঁকি: ইসিএ অর্থায়ন বিষয়ে পিডিবি নিজেই ৫টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, ঋণ গ্রহীতা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একমাত্র ক্রেতা পিডিবি। সুতরাং নগদ প্রবাহের (ক্যাশ ফ্লো) সব ঝুঁকির ক্রমপুঞ্জিত প্রভাব পিডিবির ওপরই পড়বে। এ ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা পিডিবির নেই। এতে পুরো দায় পরবর্তী সময়ে সরকারের ওপরই পড়বে। এরকম হলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।

পিডিবি বলছে, ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের আয় বিদ্যুৎ বিক্রির ওপর নির্ভর করে। চাহিদা কমে যাওয়ায় শীতে বিদ্যুৎ বিক্রি গ্রীষ্মের তুলনায় অর্ধেক কমে যায়। অর্থাৎ শীতকালে আয়ও কমে যায়। এতে একমাত্র ক্রেতা হিসেবে ঋণের দায় পড়বে পিডিবির ওপর।

পিডিবির মতে, উৎপাদন ব্যয় অনুসারে এখনও বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হয় না। সম্প্রতি কয়েকবার দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান অনেক। যার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর আয়ে। ঋণ পরিশোধে এটাও একটা বড় ঝুঁকি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয় টাকায়; কিন্তু ঋণ পরিশোধ করা হয় ডলারে। টাকার অবমূল্যায়ন হলে ঋণের দায়ভার বাড়বে।

ঝুঁকি প্রশমন তহবিল: সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে তা প্রশমনে পিডিবি একটি তহবিল গঠনের পরামর্শ দিয়েছে সরকারকে। পিডিবি জানিয়েছে, এ তহবিলের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ হিসাবে রাখা যেতে পারে। নির্দিষ্ট কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান ইসিএ ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকার প্রদত্ত সভরেইন গ্যারান্টি ব্যবহার না করে এ তহবিলের অর্থে সমস্যার সমাধান করা হবে। এ তহবিল পরিচালনায় অর্থ বিভাগের সচিবকে চেয়ারম্যান করে বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পিডিবি, বিনিয়োগ বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছে পিডিবি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব বলেন, আমরা একটি তহবিল গঠনের চিন্তা করছি। তবে সেটি এখনও ভাবনার পর্যায়ে।

ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান: ইসিএ অর্থায়নে ছয় হাজার ৪১৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার ঋণের ব্যবস্থা হচ্ছে। এর মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানের ফিন্যান্সিয়াল ক্লোজিং সম্পন্ন হয়েছে। আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কোম্পানির ৪৫০ মেগাওয়াট (দক্ষিণ) কেন্দ্র নির্মাণে ৪২ কোটি ডলার, পিডিবির শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণে ২৩.৮ কোটি ডলার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য ১১.৩ কোটি ডলার ঋণের বিপরীতে এইচএসবিসি ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়েছে সরকারকে। আশুগঞ্জে ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য ১৯.৩ কোটি ডলারের ঋণের বিপরীতে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংককে সভরেইন গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।

ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণে ২০.১ কোটি ডলার ও বড়পুকুরিয়ায় ২৭৫ মেগাওয়াটের তৃতীয় ইউনিট নির্মাণে ২২.৮ কোটি ডলার ঋণের বিপরীতে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নাকে (আইসিবিসি) গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। কড্ডায় ১৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণে ১৩.৯ কোটি ডলার ঋণের জন্য এক্সিম ব্যাংক অব চায়নাকে সভরেইন গ্যারান্টি দিয়েছে সরকার।

আরও যেসব বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ইসিএ ঋণ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো হলো সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াটের জন্য ২০.৯ কোটি ডলার (স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক), ঘোড়াশাল ৩ ইউনিট রিপাওয়ারিংয়ের জন্য ২৫.৯ কোটি ডলার (এইচএসবিসি), বিবিয়ানা (৩) ৪৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য ৩৪.৭ কোটি ডলার (জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল কোপারেশন), ঘোড়াশাল ৬নং ইউনিট রিপাওয়ারিংয়ের জন্য ২৮.৮ কোটি ডলার, রামপাল ১৩২০ কেন্দ্রের জন্য ১২০ কোটি ডলার, শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য ৭.৭ কোটি ডলার, হরিপুর ১০০ মেগাওয়াটের জন্য ১০ কোটি ডলার, খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র্রের জন্য ৩২.১ কোটি ডলার ও মহেশখালী ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য ১৯৫.৭ কোটি ডলার।
(হাসনাইন ইমতিয়াজ) সুত্র:সমকাল

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর