কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানিস্বল্পতায় উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানিস্বল্পতায় উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা
২০১৬-০৫-১৯ ১৩:৪২:৫৫
প্রিন্টঅ-অ+


কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে সাশ্রয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। পানিস্বল্পতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ (বর্ষা মৌসুম ব্যতীত) রাখা হয় কেন্দ্রের অধিকাংশ ইউনিট।

এবার গ্রীষ্ম মৌসুমে পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টি না হওয়ায় অস্বাভাবিক নেমে গেছে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর। এতে উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের।

জানা গেছে, বর্তমানে একটি কিংবা দুটি ইউনিট চালু রেখে (পিক আওয়ারে) উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। চলতি বছরের এপ্রিলজুড়ে পানিস্বল্পতায় পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে গড়ে একটি কিংবা দুটি ইউনিট চালু রাখা গেছে। তবে পানির পরিমাণ কমতে থাকায় মে মাসের শুরু থেকে অধিকাংশ সময় একটি ইউনিট দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলছে। এর মধ্যে মে মাসের প্রথম দুদিন প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবারও একটি মাত্র ইউনিট দিয়ে উৎপাদন চালু রেখেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বিগত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সারা দেশে দাবদাহ চলছে। বৃষ্টি না হওয়ায় নেমে গেছে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর। ফলে হ্রদের পানির ওপর নির্ভরশীল কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির অধিকাংশ ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত দুই মাসের মধ্যে অধিকাংশ সময় শুধু একটি ইউনিট চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে যে পরিমাণ পানি মজুদ আছে, তা দিয়ে একটি ইউনিট ১৫-২০ দিন নিয়মিত চালু রাখা যাবে। আর তিনটি ইউনিট একসঙ্গে উৎপাদনে গেলে ৭-১০ দিন চলবে ওই পানিতে। আর একসঙ্গে পাঁচটি ইউনিট চালানো হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রুলকার্ভ অনুযায়ী হ্রদের পানির স্তর ৬৮ ফুটের নিচে চলে আসবে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্য বিপজ্জনক। এ অবস্থায় কার্যত উৎপাদন বন্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহার করে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ ২০ টাকা। কিন্তু কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটপ্রতি গড় উৎপাদন খরচ মাত্র ৩০ পয়সা। মৌসুমে (বর্ষাকালীন সময়) মাসভিত্তিক এ উৎপাদন খরচ ১৩-১৪ পয়সায় নেমে আসে। ২০১৫ সালের আগস্টে এ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ১৪ পয়সা, সেপ্টেম্বরে ১২ পয়সা এবং অক্টোবরে খরচ হয়েছে মাত্র ১৩ পয়সা। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো গেলে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরো কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ম্যানেজার আবদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এখন পর্যন্ত কাপ্তাই কেন্দ্রের বিপত্সীমার ওপরে দুই ফুট পানি মজুদ রয়েছে, সর্বোচ্চ উৎপাদনের জন্য যা খুবই অপ্রতুল। হালদা নদীতে লবণাক্ততা এড়াতে কাপ্তাই কেন্দ্রের অন্তত একটি ইউনিট চালু রাখা জরুরি। ফলে প্রতিদিন অন্তত একটি ইউনিট চালু রাখা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলেই পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহ বৃষ্টি না হলে সবগুলো ইউনিট বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

১৯৬২ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় বাঁধ দিয়ে ৮০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। শুরুতে দুটি ইউনিট কেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয়েছিল মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এর পর ১৯৮৩ সালে ৩ নম্বর ইউনিট (৫০ মেগাওয়াট) নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৫০ কোটি এবং সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট (১০০ মেগাওয়াট) নির্মাণে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রথম তিনটি ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিতে বসানো হলেও ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট জাপানের টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার সার্ভিসেস কোম্পানি (টেপ্সকো) নির্মাণ করে। সর্বশেষ দুটি ইউনিট স্থাপনের সময় আরো দুটি ইউনিট স্থাপনে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো সুবিধা রাখা হয়। জাপানি এ প্রতিষ্ঠান ১৯৯৮ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বর্তমান অবকাঠামো ও পানির রিজার্ভ দিয়েই কাপ্তাই হ্রদে আরো ৫০ মেগাওয়াটের (মোট ১০০ ইউনিট) দুটি ইউনিট নির্মাণ সম্ভব বলে প্রতিবেদন দেয়। হ্রদের পানি দুটি বাঁধ স্থাপন করে পুনঃসঞ্চালনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হলে পিক আওয়ারে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এক্ষেত্রে উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় আরো কমিয়ে আনার সুযোগ থাকলেও সে বিষয়ে উদ্যোগ নেই বিদ্যুৎ বিভাগের।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ৪০ মেগাওয়াট করে হলেও সক্ষমতার চেয়ে প্রতিটি ইউনিট সর্বোচ্চ ৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারে। এছাড়া বাকি তিনটি ইউনিটের প্রতিটি ৫০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

পরিবেশ এর অারো খবর