পাঁচ বছরে অকার্যকর রেলের মাস্টারপ্ল্যান
পাঁচ বছরে অকার্যকর রেলের মাস্টারপ্ল্যান
২০১৬-০৫-১৪ ১৪:০৪:৩০
প্রিন্টঅ-অ+


বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ২০১১ সালে। এতে চার পর্বে ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি প্রথম পর্বের বেশির ভাগ প্রকল্পই। দ্বিতীয় পর্বের প্রকল্পগুলোর অবস্থাও একই রকম। এ অবস্থায় সময় পিছিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্প। ফলে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অনুসরণ করা যাচ্ছে না মাস্টারপ্ল্যান। তাতে পাঁচ বছরের মধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে মহাপরিকল্পনাটি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই এ মহাপরিকল্পনা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।

জানা গেছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কারিগরি সহায়তায় এরই মধ্যে শুরু করা হয়েছে মহাপরিকল্পনাটির সংশোধন কার্যক্রম, যা আগামী বছর শেষ হতে পারে। এ সংশোধন কার্যক্রম শেষ হলে নতুন মাস্টারপ্ল্যান পাবে রেলওয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ের সহায়তা নিয়ে প্রথম মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণয়ন করেছিল পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। তখন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প পেছনে পড়ে যায় এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু প্রকল্প স্থান পায়। আবার বর্তমানে রেলওয়ের কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ফলে কতটুকু অগ্রগতি হবে, তার স্পষ্ট বর্ণনাও নেই ওই মহাপরিকল্পনায়। ২০ বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রেলওয়ের সম্ভাব্য যাত্রী ও পণ্য পরিবহন চাহিদা বৃদ্ধির কোনো প্রক্ষেপণও দেয়া হয়নি এতে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি রেলওয়ে যাত্রী ও পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আয় বৃদ্ধির কোনো সম্ভাব্য চিত্রও তুলে আনা হয়নি। ফলে অসম্পূর্ণ ওই মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে।

তথ্যমতে, মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম পর্বের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে আগে থেকে চলমান ৪৮টি ছাড়াও নতুন ৬৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। তবে চলমান ৪৮টি প্রকল্পের বেশির ভাগই এখনো শেষ হয়নি। আবার নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৬০টি শুরুই হয়নি।

মাস্টারপ্ল্যানের দ্বিতীয় পর্বে ৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের এক বছর শেষ হতে চললেও একটি প্রকল্পও শুরু করা হয়নি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির ট্রেন সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রাখা হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানের চতুর্থ পর্বে। ২০২৫-৩০ সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকায় দ্রুত এর কাজ শুরু করতে চায় রেলওয়ে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। এছাড়া দ্রুতগতির ট্রেন চালু করতে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে। আবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার রেলপথের দূরত্ব কমাতে ঢাকা-লাকসাম কর্ডলাইন চতুর্থ পর্বে নির্মাণের জন্য রাখা হয়েছে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির ট্রেন চালু হলে কর্ডলাইন প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তাই থাকবে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, মাস্টারপ্ল্যান একটি চলমান প্রক্রিয়া। চাহিদা অনুযায়ী এর আওতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাছাই করা হবে। তাই বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্প আগে পরে হতেই পারে। এজন্য মাস্টারপ্ল্যান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করা যায়, নতুন মাস্টারপ্ল্যান আরো বিস্তৃত ও বাস্তবিক হবে।

তবে অপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান কাগুজে দলিল ছাড়া কিছুই নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এএমএম সফিউল্লাহ। তিনি বলেন, রেলওয়ের চাহিদা কি, অগ্রাধিকার কি— তা আগে ঠিক করতে হবে। সেগুলো কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নির্ধারণ করতে হবে। এর ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। একপ্রস্থ কাগজে কিছু প্রকল্পের সারণি আর সম্ভাব্য ব্যয় তুলে ধরা কখনই মাস্টারপ্ল্যান হতে পারে না। এ ধরনের কাগুজে দলিল সুন্দর বই আকারে প্রকাশ করা যায়, কিন্তু তা দিয়ে পরিকল্পিত কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। নতুন মাস্টারপ্ল্যানের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার সুপারিশ করেন তিনি।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম অংশটি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে চলমান ৪৮টি প্রকল্প ছাড়াও সরকারি অর্থায়নে ৩১টি ও বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য ৩৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এগুলোর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এর অর্ধেকও বিনিয়োগ হয়নি রেলওয়েতে। ফলে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নও হয়নি।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৪৮টি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়নে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ৯ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর বৈদেশিক অর্থায়নে ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।

তৃতীয় পর্যায়ে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৩৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত চতুর্থ পর্যায়ে ৩৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়াও ভারতীয় ঋণ, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), কোরিয়ার অর্থনৈতিক ঋণ মওকুফ তহবিল (ইডিসিএফ), বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্যান্য উন্নত দেশের সহায়তা নেয়া হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টাও করা হবে।

তবে দাতা সংস্থা নির্ভরতার পরিবর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু প্রকল্প বাছাইয়ের সুপারিশ করেন এএমএম সফিউল্লাহ। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বর্তমানে রেল উন্নয়নে কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায় আগামীতে অন্যান্য সংস্থা থেকেও কতটা ঋণ পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। তাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে রেলওয়ের দক্ষতারও প্রয়োজন রয়েছে। ২০ বছরে দুইশর বেশি প্রকল্প বাস্তবায়নে রেলওয়ের দক্ষতা নেই। তাই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে মাস্টারপ্ল্যানকে বাস্তবসম্মত রূপ দেয়া। এতে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণসহায়তা পাওয়াও সহজ হবে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর