স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তব হবার পথে
স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তব হবার পথে
২০১৬-০৫-১৪ ০১:৫০:৪৫
প্রিন্টঅ-অ+


প্রায় ৩০ বছর ধরে স্বামী-সন্তান নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় থাকলেও মনে ধারণ করেন নিজ জন্মস্থান মাদারীপুর। এই প্রতিবেদক তাকে জিজ্ঞেস করেন, “শেষ কবে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে?” সেলিনা বেগম বলেন, “এইতো দুমাস আগে হাজবেন্ডকে নিয়ে ঘুরে এসেছিলাম। ছেলেমেয়েরা তো সবাই চাকরি-বাকরি আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। তাই ও আর আমি সময় পেলেই আমাদের গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসি”।

জানতে চাই তার কাছে, “পদ্মা সেতুর কাজ তো শুরু হয়ে গেছে। কাজ শেষ হলে তো খুব দ্রুতই পৌঁছে যেতে পারবেন। কেমন লাগছে?” সেলিনা বেগম সহাস্য উত্তর দেন, “বাবা, তোমরা যদি জানতে যে কত কষ্ট করে আগে আমাদের গ্রামে যেতে হত। প্রায় ২০ বছর আগেও কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা সময় লাগতো সদরঘাট থেকে আমাদের বাড়ি পৌঁছতে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে এখন সময় লাগে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন ঘণ্টা। আর পদ্মা সেতু হয়ে গেলে তো এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছনো যাবে বলে মনে হয়! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ এমন একটি উদ্যোগ নেয়ার জন্য”।

সেলিনা বেগমের মত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব মানুষের কাছেই পদ্মা সেতু একটি বাস্তব রূপকথা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের এই অঞ্চলটি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক দিয়ে ছিল অনেকটাই পিছিয়ে। তাই, এই দীর্ঘ সময় জনগণের দুর্ভোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রও অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলো। নদী পারাপারের জন্য পণ্য পরিবহণকারী ট্রাকগুলো সারি ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ফেরীর অপেক্ষায়-মাওয়া এবং কাওড়াকান্দির নিত্যদিনের চিত্র ছিল এটি। আর ঈদসহ অন্যান্য উৎসবের সময় এই অপেক্ষার প্রহর হতো আরও দীর্ঘ। তাই পলিসমৃদ্ধ অত্যন্ত উর্বর এই অঞ্চলটিতে প্রতি বছর ফসলের বাম্পার ফলন হবার পরও কৃষকের মুখে হাসি ফুঁটত না পণ্যপরিবহন খরচ অনেক বেশি হওয়ায়। তাই, পদ্মা সেতু নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম নদী পদ্মা। কবি-সাহিত্যিকের ভাষায় কখনো ‘উন্মত্ত পদ্মা’ কখনো ‘সর্বনাশা পদ্মা’। এর খরস্রোতা স্বভাবই হয়ত এর কারণ। তাই, এর অববাহিকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’। এর দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা হবে সারা বিশ্বের ২৫ তম দীর্ঘতম সেতু। এটি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং হতে শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পদ্মা বহুমুখী সেতুতে সড়ক চলাচলের পাশাপাশি থাকছে রেল চলাচলের ব্যবস্থা যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করবে। পাশাপাশি এই রেল সেতু বদলে দেবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার মানুষের জীবন প্রণালী।

যমুনা সেতুর পর পদ্মা সেতুই হচ্ছে দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছে যাবে গ্যাস সংযোগ, ফাইবার অপটিক কেবল এবং পাওয়ার ট্রান্সমিশন সংযোগ। পদ্মা বহুমুখী সেতু হবে দ্বিতল এবং ইস্পাত-ট্রাস সেতু। উপর তলায় থাকবে চার লেন বিশিষ্ট মহাসড়ক এবং নিচ তলায় থাকবে রেললাইন। পাশাপাশি টোল সংগ্রহের জন্য থাকবে দুটি টোল প্লাজা।

ইতোমধ্যে এই বৃহৎ প্রকল্পের প্রায় ২১ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে China Major Bridge Engineering Corporation (MBEC)। নদী শাসনের জন্য গত চার মাস ধরে মাটি পরীক্ষা এবং খননের কাজ চলছে। পদ্মা বহুমুখী সেতুতে মোট ৪২ টি পিলার থাকছে। প্রতিটি পিলারের নিচে ছয়টি করে পাইলিং করা হচ্ছে। ইস্পাতের তৈরি স্প্যানগুলো এই পিলারের উপর স্থাপন করা হবে। এভাবে মোট ৪১ টি ইস্পাতের স্প্যান স্থাপন করা হবে।

অর্থায়ন
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর পুরো প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব নেয় World Bank, Japan International Cooperation Agency (JICA), Asian Development Bank (ADB) এবং Islamic Development Bank (IDB)। কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের এই প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত হতে সরে আসে। বিশ্বব্যাংককে অনুসরণ করে অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই, এই প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয় সারা দেশের মানুষের মাঝে। তবে কি স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে?
সকলের সংশয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণা দেন নিজস্ব অর্থায়নেই হচ্ছে পদ্মা সেতু। তবুও মানুষের মনে সূক্ষ্ম অবিশ্বাস!
কিন্তু গত ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে মানুষের মনে আবারও আশার সঞ্চার করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তাই, দেশবাসীর স্বপ্ন এখন বাস্তব হবার পথে।
(পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মোঃ মাসুদ-এর প্রবন্ধ অবলম্বনে লিখেছেন ‘দি ইঞ্জিনিয়ারস’-এর প্রতিবেদক আবু সাঈদ)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফিচার এর অারো খবর