বাংলাদেশে ক্রিকেট উত্থান
বাংলাদেশে ক্রিকেট উত্থান
২০১৫-১১-১৪ ১৪:৪৫:১৫
প্রিন্টঅ-অ+


স্বাধীন বাংলাদেশে এই ক্রিকেট ছাড়া আর কোনো কিছুই গত সাড়ে চার দশকে আমাদের এমন একাট্টা করতে পারেনি। আমরা নিজেরা নিজেরা ভাগ হয়ে যাই; কিছুতেই আমাদের মিল হয় না। এই মিল করানোর সুতো হিসেবেই দায়িত্ব পালন করার দায়টা নিয়েছে যেন ক্রিকেট

তখন খেলা সাঙ্গ হয়ে গেছে।

পাখির মতো নীড়ে ফিরে গেছেন দর্শকেরা। ধীরে ধীরে নিভে আসছে বিশাল ফ্লাড লাইটের আলো। কেবল ড্রেসিংরুমের সামনে এক দুজন খেলোয়াড় পরিচিতদের সাথে গল্প করছেন। তখনও ছেলেটা এক নাগারে চিত্কার করে যাচ্ছে—মাশরাফি ভাই, মাশরাফি ভাই।

একজন নিরাপত্তাকর্মী এসে তাকেও গ্যালারি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। কোনো উপায় না পেয়ে খড়কুটো ধরার মতো করে এক সাংবাদিককে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলো ছেলেটি, ‘একটু মাশরাফি ভাইয়ের সাথে কথা বলবো।’

‘কেন! এখন মাশরাফির সাথে কী কথা?’

ছেলেটা উত্তেজনায়, ভয়ে, রোমাঞ্চে থরোথরো করতে গিয়ে বাক্যটাই গুলিয়ে ফেললো। এদিক ওদিক করে বললো, ‘মাশরাফি ভাই তো বাংলাদেশ...’।

হয়তো বলতে চেয়েছিল মাশরাফি বাংলাদেশের অধিনায়ক। কিংবা বলতে চেয়েছিল, মাশরাফি বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ফাস্ট বোলার। যাই বলতে চেয়ে থাকুক, তার মুখ থেকে সত্যিটাই বের হলো—মাশরাফি এখন বাংলাদেশ। কেবল মাশরাফি নয়, জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতিটা খেলোয়াড় এখন বাংলাদেশ। এই এগোরো জন সৈনিকের মুখ চেয়েও এখন যেনো বেঁচে আছে এই দেশের কোটি কোটি স্বপ্নবাজ কিংবা হতাশ মানুষ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলই যেনো শেষ ভরসা!

খেলাধুলা তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশে এই ক্রিকেট ছাড়া আর কোনো কিছুই গত সাড়ে চার দশকে আমাদের এমন একাট্টা করতে পারেনি। আমরা নিজেরা নিজেরা ভাগ হয়ে যাই; আমরা নিজেরা নিজেরা প্রতিটি বিষয়ে শত শত টুকরোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কিছুতেই আমাদের মিল হয় না। এই মিল করানোর সুতো হিসেবেই দায়িত্ব পালন করার দায়টা নিয়েছে যেনো ক্রিকেট।

খুব ভালো করে বলতে গেলে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর প্রথমবারের মতো পুরো বাংলাদেশ কোনো একটা অরাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে একত্রিত হয়ে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। তারপর এই ক্রিকেটের ওপর দিয়েই অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা গেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট আন্তর্জাতিক মহলে আদৌ টিকবে কি না, টেকা উচিত কি না, এমন সব প্রশ্ন উঠেছে। জাতি হিসেবে আমরা হতাশ হয়েছি, দলের পরাজয়ে কেঁদেছি। কিন্তু হাল কখনো ছেড়ে দেইনি। হাল ছাড়েনি আমাদের ক্রিকেট দল। আর তারই ফল হিসেবে এই ২০১৫ সালে এসে আমরা দেখছি বিশ্বের অন্যতম সেরা, কার্যত দ্বিতীয় সেরা ওয়ানডে দল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা শুরু ১৯৮৬ সালে। পাকিস্তানের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কায় এশিয়া কাপে প্রথম ম্যাচ খেলেছিল গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। তখন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছিল চার বছর বাদে বাদে এশিয়া কাপ, মাঝে মাঝে কোনো একটা আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ। দেশেও তখন ফুটবলের দারুণ রমরমায় ক্রিকেটের খোঁজ নেই তেমন।

১৯৯৪ সালে স্বপ্ন দেখলেও ১৯৯৭ সালে এসে আইসিসি ট্রফি সত্যিই জেতার ভেতর দিয়ে আসলে এই দেশে ক্রিকেটের জোয়ার তৈরি হলো। এই টুর্নামেন্ট জেতার ফলে বাংলাদেশ সুযোগ পেলো ১৯৯৯ বিশ্বকাপে খেলার। সেখানে পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়ার পাশাপাশি টেস্ট স্ট্যাটাসের দাবিও তুললো তারা। ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্টও খেলা শুরু করলো। কিন্তু অন্তত ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একেবারেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক অনাহূত, দুর্বল শক্তি হয়ে রইলো।

২০০৫ সালে তখনকার শক্তিশালী জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে একটা জোয়ার শুরু করেছিল বাংলাদেশ দল। ২০০৭ অবদি সে জোয়ারটা টিকেও ছিল; সে বছর বিশ্বকাপে সুপার এইটে খেলেছিল হাবিবুল বাশারের দল। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে ২০০৮, ২০১০ সালে ভালো কিছু সময় কাটিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালেও কিছু সাফল্য ছিল। কিন্তু কিছুতেই দলটা ধারাবাহিক হয়ে উঠছিল না। উপরন্তু ২০১৪ সালে এসে এক অতলে তলিয়ে যেতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ হেরে বছরটা শুরু হয়েছিল। এরপর এশিয়া কাপে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পুচকে আফগানিস্তানের বিপক্ষেও পরাজয়। ক’দিন পর ভারতের তৃতীয় সারির এক দলের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হওয়া। আর আড়াই মাস আগেই ওয়েস্টইন্ডিজ থেকে আরো একটা হোয়াইটওয়াশের যন্ত্রণা নিয়ে দেশে ফেরা।

বাংলাদেশ তখন হারতে হারতে ক্লান্ত, পরাজয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে করতে নিঃস্ব।

এই বাংলাদেশ দল মেরুদণ্ড সোজা করে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে কী করে? ভালো খেলা দরকার নেই, তখন মান বাঁচানো নিয়ে সবার ভ্রূ কুঁচকে গেছে। ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আপাত বিস্ময়কর এক সিদ্ধান্ত নিলো। দফায় দফায় ইনজুরিতে প্রায় ফুরোতে বসা, ইনজুরির কাছেই অধিনায়কত্ব হারানো বাংলাদেশের ‘হলেও হতে পারতেন সেরা অধিনায়ক’ মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ফিরিয়ে আনা হলো নেতৃত্বে।

ভাবনাটা কী ম্যাজিকের মতো ছিল!

ম্যাজিক বললেও যেন কম হয়ে যায়। সিদ্ধান্তটা কার্যকর হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ চলা শুরু করলো এক স্বপ্নের যাত্রা। হারতে থাকা সেই বাংলাদেশ হঠাত্ করে হারতেই ভুলে গেলো। হয়ে উঠলো এক অপরাজেয় দল।

গত নভেম্বরের ২১ তারিখেই জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে শুরু হয়েছিল এই জয়যাত্রা। সে দফা পাঁচ ম্যাচ সিরিজে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ। এরপর বিশ্বকাপে তো একরকম ইতিহাস গড়ে ফিরলো মাশরাফির দল। দেশে ফিরে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ এবং ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারালো তারা।

এক বছরের এই পথ চলায় বাংলাদেশ ২৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে; এর মধ্যে ১৮টিই জয়। জয়ের হারে এই সময়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে একমাত্র অস্ট্রেলিয়া। পাশাপাশি টানা পাঁচটা সিরিজ জয়।

মানে, বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় সফল ওয়ানডে দল!

আমরা জানি, এই সোনালী সময়টা হয়তো চিরদিন থাকবে না। ব্যক্তি খেলোয়াড়ের মতোই দলেরও খারাপ সময় আসে। এই ভালো সময়ে বসে আমরা সেই খারাপ সময়কে ঘৃণা করবো না। সেই সময় আসলেও এমন করেই ভালোবাসায় বরণ করে নেবো এবং কৃতজ্ঞতা জানাবো ক্রিকেট দলকে।

কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উপায় নেই। কোটি মানুষের হরেক রকম না পাওয়ার যন্ত্রণা দূর করে দিতে পেরেছে এই ক্রিকেট দল। ধন্যবাদ তো তাদের প্রাপ্যই।
(দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ক্রীড়া এর অারো খবর