এপ্রিলে ৩০ বছরে দীর্ঘতম দাবদাহ
এপ্রিলে ৩০ বছরে দীর্ঘতম দাবদাহ
২০১৬-০৪-২৭ ০২:২০:১৭
প্রিন্টঅ-অ+


৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২৬ এপ্রিল। টানা তিন সপ্তাহের দাবদাহ। আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে এত দীর্ঘ দাবদাহ গত ৩০ বছরের মধ্যে দেখা যায়নি। আগামী পাঁচদিন কিছু এলাকায় তাপমাত্রা আরো বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে। দাবদাহের তীব্রতায় শুকিয়ে যাচ্ছে জলাভূমি। ফল-ফসলে দেখা দিচ্ছে ক্ষতিকর উপসর্গ, যা নিয়ে শঙ্কিত কৃষক।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গরমের তীব্রতায় খুব দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানের মাঠ। ফসল রক্ষায় ঘন ঘন সেচ দিতে হচ্ছে কৃষককে। এতে বেড়ে যাচ্ছে ফসলের উত্পাদন খরচ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৬ তারিখ থেকে শুরু হওয়া দাবদাহটি গতকাল ২০ দিনে অতিক্রম করেছে। গত ৩০ বছরের (১৯৮৬ সাল—২০১৫ সাল পর্যন্ত) মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল ২০১০ ও ২০১৪ সালে। ওই দুই বছরই এপ্রিলের গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাকি বছরগুলোর কোনোটিতেই এপ্রিলে গড় তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেনি। কিন্তু চলতি মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশের গড় তাপমাত্রা হিসাব করা হয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

গত সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড যশোরে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে দেশের ছয়টি জেলায়। ২৮টি জেলায় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। এ হিসাবে গত ৩০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমে গেছে বৃষ্টিপাতও। দেশে ৭৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।

তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর এখনো আশাজাগানিয়া খবর দিতে পারেনি। বরং তাদের পূর্বাভাস শঙ্কা আরো বাড়িয়ে তুলছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও মংলা অঞ্চলগুলোয় তীব্র তাপপ্রবাহ চলবে। এছাড়া চাঁদপুর, মাইজদীকোর্ট, শ্রীমঙ্গল অঞ্চলসহ রংপুর ও বরিশাল বিভাগ এবং খুলনা, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অবশিষ্টাংশের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আরো দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

প্রকৃতির এমন আচরণের বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তাসলিমা ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, এ সময় সাধারণত বঙ্গোপসাগর থেকে দখিনা বাতাস দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে বজ্র বৃষ্টি সৃষ্টি করে। কিন্তু এবার তা দেখা যচ্ছে না। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা পশ্চিমা বায়ু এ সময় বাংলাদেশে প্রবেশ করে দখিনা বাতাসকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার উত্তর গোলার্ধের ওপর খাড়াভাবে সূর্য কিরণ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিশাল এলাকাজুড়ে এল নিনোর প্রভাবে এ সময় স্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে না।

চলমান এ দাবদাহের প্রভাব পড়ছে কৃষি উত্পাদনে। যশোরের শার্শা উপজেলার সাহেব আলী এবার তিন বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। তিনি জানান, চলমান দাবদাহের কারণে জমিতে এখন প্রতিদিন সেচ দিতে হচ্ছে। অন্যান্য বছর মাসের শুরুতে আটদিনে ১৫ ঘণ্টা সেচ দিলেই চলত। এখন দিতে হচ্ছে প্রায় ২৫ ঘণ্টা। এ অবস্থায় প্রতিদিন এক বিঘার জন্য ২০০ টাকা গুনতে হচ্ছে তাকে। যদিও আগে এ খরচ ছিল ৫৫ টাকা।

একই অবস্থা উত্তরাঞ্চলের কৃষকদেরও। গরম যতই দীর্ঘ হচ্ছে, ততই গাছের ফলে দেখা দিচ্ছে নানা রকম ক্ষতিকর উপসর্গ। কয়েকটি লিচু বাগানের মালিক রাজশাহী শহরের রায়পাড়া এলাকার আবু হানিফ। এবারই প্রথম তার বাগানের লিচুগাছে ব্যতিক্রমী উপসর্গ দেখা দিয়েছে। লিচু ফুল থেকে ফলে রূপ নেয়ার পর কয়েক দিনের ব্যবধানে তামাটে রঙ ধারণ করে গাছের পাতা। এখন ছোট ছোট লিচুর গায়ে কালো কালো দাগ দেখা যাচ্ছে। এতে অনেক লিচু রসালো হওয়ার পরিবর্তে চুপসে যাচ্ছে। তার পর ঝরে পড়ছে। একই অবস্থা এ এলাকার আম বাগানেরও।

রাজশাহী, নাটোর ও দিনাজপুর প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যমতে, এসব জেলার আম ও লিচু অপরিপক্ব অবস্থায় ঝরে পড়ছে ফল। এদিকে রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া; নওগাঁর সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর; চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও নাটোরের কোথাও কোথাও পানির স্তর অস্বাভাবিক নেমে যাওয়ায় গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি উঠছে না বলে জানিয়েছে উত্তরাঞ্চলের সেচের উন্নয়নে নিয়োজিত বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে যশোর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় কয়েক দিনের মধ্যে ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। এ সময় সেচের প্রয়োজন না হলেও ভালো ফলনের আশায় সেচ দিতে হচ্ছে। এতে কৃষকের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

সেচ মৌসুমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় দেশের পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বের ৩১ জেলায় পানির স্তর ৪ ইঞ্চি থেকে দেড় ফুট নিচে নেমে গেছে। তাপমাত্রার এ ধরনের পরিবর্তনের কারণে বাড়তি সেচ দিতে গিয়ে উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। মৌসুম শেষে ভালো ফলন পাওয়া দুষ্কর হয়ে যেতে পারে কৃষকের। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এ বিষয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার আন্ডার ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কৃষির এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। কয়েক বছরের ব্যবধানে সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা যেমন বেড়েছে, তেমনি সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রাও বেড়েছে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফল, শস্য ক্ষেতে দাবদাহের প্রভাব দেখা দিয়েছে। ফলের মুকুল ঝরে যাচ্ছে, শস্যের উত্পাদনশীলতা কমে যাচ্ছে; যার প্রভাব সামনের দিনে ফল ও শস্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে এখনই নজর দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, খরা ও বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত এলেও এখনো পর্যন্ত হিট বা তাপমাত্রাসহিষ্ণু জাত আসেনি। আবার উদ্ভাবনের পর তা সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নীতিগতভাবে পানির সুষ্ঠু ব্যবহারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এদিকে হাসপাতালগুলোতেও শিশুরোগী ভর্তির হার বেড়ে গেছে। বেসরকারি অনেক হাসপাতালে বেড়ে গেছে ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু ভর্তি। আগের মাসে যেখানে দু-পাঁচজন রোগী ভর্তি হয়েছিল, সেখানে গত চারদিনে ২০-২৫ জন করে ভর্তি হচ্ছে।
সূত্র: বণিক বার্তা

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

পরিবেশ এর অারো খবর